২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ০১:১১
ঈদ মৌসুমে সিলেটে ঢল নেমেছ পর্যটকদের। সিলেটের পর্যটন কেন্দ্রগুলো এখন পর্যটকদের পদভারে মুখরিত। দেশের অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রীক শহরগুলোতে যখন এবার ঈদে পর্যটক সংকট দেখা দিয়েছে, সিলেটে তখন উল্টো চিত্র। পর্যটকদের ঢল নামায় কক্ষ খালি নেই সিলেটের বেশিরভাগ হোটেল ও রিসোর্টগুলোতে।
বিছানাকান্দি, জাফলং, রাতারগুল, লালাখাল, পাংথুমাই, শ্রীপুরসহ সিলেটের প্রায় সকল পর্যটনকেন্দ্রেই ভিড় করেছেন হাজার হাজার পর্যটক। ঈদের ছুটি শেষ হয়ে গেলেও পর্যটকদের এই আনোগানা আরো দু’একদিন থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত তিন দিন ধরে সিলেটের সব হোটেল মোটেল রিসোর্ট অতিথিতে পরিপূর্ণ। আগামী দুইদিন পর্যন্ত সবগুলো কক্ষ বরাদ্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
সিলেটের রুপে মুগ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেটকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘সুন্দরী শ্রীভূমি’ নামে। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যুগে যুগে মুগ্ধ করেছে দেশ বিদেশের পর্যটকদের। দেশের বৃহৎ দুই হাওর টাঙ্গুয়া ও হাকালুকি, দেশের একমাত্র জলারবন রাতারগুল, জাফলং, বিছনাকান্দি, পাংথুমাই, ভোলাগঞ্জ, লালাখাল, লোভাছড়া, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর হ্রদ, সাতছড়ি ও রেমা কালেঙ্গা উদ্যান এবং বিভিন্ন চা বাগানসহ এখানকার পর্যটনকেন্দ্রগুলো দেখতে সবসময় ভিড় করেন পর্যটকরা। ঈদের ছুটিতে বাড়ে পর্যটকদের সংখ্যা।
সিলেট হোটেল ও গেস্ট হাউস ওনার্স এসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, এই সংগঠনের অর্ন্তভূক্ত ২১ টি হোটেল রয়েছে। এছাড়া সংগঠনের বাইরে রয়েছে আরো প্রায় আড়াইশ’ হোটেল। রিসোর্ট ও মোটেল রয়েছে আরো অন্তত ৫টি। গত কয়েকদিন ধরে এসব হোটেল রিসোর্টে কোনো কক্ষ খালি নেই। অতিথিতে পরিপূর্ণ হয়ে আছে।
পাথর, বালি, নদী আর আর দুই পাহাড়কে জোড়া লাগানো ঝুলন্ত ব্রীজের জন্য বিখ্যাত জাফলং। পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে হেঁটে চলে সাদা সাদা মেঘ। অসংখ্য ঝর্ণা দিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে রাশি রাশি জল। এমন দৃশ্য চোখ জুড়াবে সকল মানুষেরই। তাই এই ঈদের ছুটিতে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংয়েই পর্যটকদের ভিড় সবচেয়ে বেশি।
ঈদের দিন থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক আসছেন প্রকৃতিকন্যা জাফলংয়ে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত তিনদিন ধরে পর্যটকদের গাড়ি চাপে সিলেট-জাফলং সড়কে দেখা দিয়েছে দীর্ঘ যানজট। জাফলংয়ে পিয়াইন নদী উপর ঝুলন্ত ব্রিজ, পাহাড় টিলা, পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে ভেসে ভেড়ানো মেঘ, আদিবাসি খাসিয়াপুঞ্জি, সমতল চা বাগান দেখতেই সবচেয়ে বেশি আগ্রহ পর্যটকদের।
একই অবস্থা সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার লালাখালেও। সারি নদীর পান্না সবুজ জল, সবুজ পাহাড় আর চা বাগান দেখতে এখানে গত কয়েকদিন ধরে বিপুল সংখ্যক পর্যট ভিড় করেছেন। প্রতিদিনই বাড়ছে পর্যটকদের সমাগম।
জল আর বনের মিশেলে জলার বন- এই হলো রাতারগুল। অনেকে একে বাংলাদেশে আমাজানও বলে থাকেন। হাজারো পর্যটকদের কোলাহল গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত দেশের একমাত্র এই সোয়াম্প ফরেস্টের নিস্তব্দতা এখন কেড়ে নিয়েছে। নাগরিক কোলাহল ফেলে কিছুক্ষণের জন্য নৌকায় চড়ে গহীন জঙ্গলের অজানায় হারিয়ে যাচ্ছেন পর্যটকরা। পাংথুমাইয়ের ঝর্ণা দেখতেও প্রতিদিন প্রচুর সংখ্যক পর্যটকদের ভিড় জমছে।
একই অবস্থা সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরেও। হিজল-করচময় জনশূণ্যহীন হাওরও এখন পরিণত হয়েছে মিনি বাজারে।
গোয়ানইঘাটের বিছনাকান্দিতেও পর্যটকদের ঢল নেমেছে। বিছানাকান্দির পাথুরে বিছনানায় শুয়ে ঝর্ণার জলে স্থান করতে ঈদের পর থেকেই এ স্থানে ছুটছেন দলে দলে দলে পর্যটক।
আর সন্ধ্যা হলেই সিলেটে আসা পর্যটকরা ঢু মারছেন দৃষ্টিনন্দন ভাসমান রেস্তোরা সুরমা রিভার ক্রজে। নদীতে ভাসতে ভাসতে সুরের তালে রাতের খাবার এই ভাসমান রেস্তোরায়ই সেরে নিচ্ছেন তারা। এইকই রাতের সুরমা দর্শন আর রাতের খাবার- এ যেনো রথ দেখা কলাও বেছা!
সোমবার দুপুরে জাফলংয়ে ঝুলন্ত ব্রিজের কাছে কথা হয় নোয়াখালীর হাতিয়া থেকে স্ব পরিবারে ঘুরতে আসা আবদুর রশিদ মোল্লার সাথে। তিনি বলেন, মনে হচ্ছে যেনো জাফলং নয়, শিলং বা দার্জিলিংয়ে এসেছি। তিনি বলেন, এখানে পর্যটকদের গাইড করার মতো কিছু না থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। অনেকে এই সুযোগে পয়সাও বেশি হাতিয়ে নিচ্ছে।
রাতাগুলে বেড়াতে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, এতো সুন্দর একটি জায়গা আমাদের দেশে আছে বেশিরভাগ মানুষই তা জানে না। তিনি বলেন, কাল টাঙ্গুয়া গিয়েছিলাম। কেবল যোগাযোগ ব্যবস্থাটা উন্নত করে এই টাঙ্গয়ার ছবি যদি দেশের বাইরে প্রচার করা যায় তাহলে হাজার হাজার বিদেশি পর্যটক টাঙ্গুয়ায় ছুটে আসবে। কিন্তু আমাদের দূর্ভাগ্য, আমরা আমাদের যা কিছু সুন্দর তা বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারছি না। আমরা নিজেরাও এসবের খোঁজ করছি না।
সিলেটের পর্যটন শিল্পের সাথে সংশ্লিস্টরা জানান, এবার সিলেটে পর্যটর সমাগম বেশি হয়েছে। কারন বর্ষার রুপ দেখার জন্য বাংলাদেশের সবচেয়ে শ্রেষ্ট স্থান হচ্ছে সিলেট।
সিলেট হোটেল এন্ড গেস্ট হাউস ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি তাহমিন আহমদ বলেন, সিলেটের সকল হোটেল- রিসোর্টের সবগুলো কক্ষই এখন পর্যটকে পরিপূর্ণ। আগামী আরো দুই তিন দিন পর্যটকরা থাকবেন।
তবে তিনি বলেন, এখন পর্যটকরা দেশে থাকছে কম। অনেকেই সিলেট হয়ে শিলং চলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের সদস্য ও জাকারিয়া রিসোর্টের সত্ত্বাধিকারী ডা. জাকারিয়া হোসাইন বলেন, দেশের অনান্য পর্যটন কেন্দ্রগুলোর তুলনায় সিলেটের আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় এবার সিলেটে সর্বাধিক পর্যটক সমাগম ঘটেছে।
আপনার মন্তব্য