সিলেটটুডে ডেস্ক

০২ আগস্ট, ২০২৬ ১৪:১৮

কৃতজ্ঞতার বিনিময়ে আমি আমার স্বাধীন চিন্তাকে বন্ধক দিই না: কলকাতায় তসলিমা নাসরিন

দীর্ঘ ১৯ বছর পর আবারও কলকাতায় গেলেন বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিন। সেখানে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘ইতিহাস মনে রাখে কারা দরজা বন্ধ করেছিল। ইতিহাস মনে রাখবে কারা দরজা খুলেছিল।’

শনিবার (১ আগস্ট) কলকাতার রবীন্দ্র সদনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা এবং নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ধন্যবাদ জানান তিনি। তবে একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেন, একজন লেখককে নিজের ভাষার শহরে পুলিশের নিরাপত্তা নিয়ে চলতে হওয়াটাই আসলে বেদনাদায়ক বাস্তবতা।

তসলিমা নাসরিন বলেন, ‘নির্বাসিত মানুষের ক্যালেন্ডারে বছর শুধু সময় নয়, প্রতিটি বছর একটি বন্ধ দরজা। প্রতিটি মাস অপেক্ষার। প্রতিটি দিন নিজের ঠিকানা হারানোর দুঃখের। সেই দীর্ঘ অপেক্ষার পর কলকাতার মাটিতে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে আমি শুধু একটি শহরে ফিরে আসিনি। ফিরে এসেছি একটি অধ্যায়ের কাছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি এমন একটা দিনের স্বপ্ন দেখি, যেদিন কোনো লেখককে পুলিশের পাহারায় চলতে হবে না। ভিন্ন মত পোষণের জন্য কাউকে দেশ ছাড়তে হবে না।’

অনুষ্ঠানে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মধ্যেও নিজের স্বাধীন অবস্থান স্পষ্ট করতে গিয়ে তিনি আরও বলেছেন, ‘কৃতজ্ঞতা আনুগত্যের চুক্তি নয়। কৃতজ্ঞতার বিনিময়ে আমি আমার স্বাধীন চিন্তাকে বন্ধক দিই না।’ তিনি বলেন, কোনো ভালো কাজের স্বীকৃতি দিতে দলীয় আনুগত্যের প্রয়োজন নেই, আবার দ্বিমত প্রকাশ করতেও বিদ্বেষের দরকার হয় না।

নিজের জীবনের দীর্ঘ নির্বাসনের ইতিহাসও তুলে ধরেন লেখক। বলেন, ১৯৯৪ সালের ৮ আগস্ট তাকে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিল। এরপর একের পর এক সরকার এলেও তার জন্য সেই দরজা আর খোলেনি। পরে কলকাতাও ছাড়তে হয় তাকে।

আগস্ট মাসের সঙ্গে নিজের জীবনের সম্পর্ক টেনে তিনি বলেন, ‘আগস্ট আমার জন্মের মাস, আগস্ট আমার নির্বাসনের মাস। আজ থেকে আগস্ট আমার প্রত্যাবর্তনের মাসও।’

কলকাতার সঙ্গে তার সম্পর্কের কথাও বলেছেন তিনি। জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকে সাহিত্য, গান আর ভাষার মধ্য দিয়ে শহরটিকে চিনেছেন তিনি। পরে বাংলাদেশ ছাড়ার পর এই শহরেই আশ্রয় পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই আশ্রয়ও স্থায়ী হয়নি। সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এক বাংলায় আমার জন্ম, আর এক বাংলায় হারিয়ে যাওয়া ঘর খুঁজে পেয়েছিলাম। শেষপর্যন্ত একজন বাঙালি লেখকের জন্য দুই বাংলার কোথাও একটা ঘরও রইল না।’

তিনি বলেন, ইউরোপ তাকে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু সেই আশ্রয় কখনো তার কাছে ‘ঘর’ হয়ে ওঠেনি।

তসলিমা নাসরিন আরও বলেন, কোনো ধর্ম বা কোনো মতাদর্শই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তিনি সব ধরনের মৌলবাদের বিরোধী এবং ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় দেশেই সংবিধান, মানবাধিকার ও সমানাধিকারের ভিত্তিতে নাগরিক আইন প্রতিষ্ঠার পক্ষে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত