Advertise

দেবকল্যাণ ধর বাপন

০৬ এপ্রিল, ২০২০ ২২:০৮

স্বেচ্ছায় লকডাউনে নগরীর বিভিন্ন এলাকা

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ

মানুষজনকে ঘরে আটকে রাখতে যখন সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশদের হিমশিম খেতে হচ্ছে তখন স্বেচ্ছায় ‌‘লকডাউনে’ চলে গেছেন সিলেট নগরীর কয়েকটি এলাকার বাসিন্দারা। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে তারা পাড়ার ভেতরে বহিরাগতদের প্রবেশ ও ভেতরে অপ্রয়োজনে কারো বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। বন্ধ করে দিয়েছেন পাড়ায় ঢোকার প্রবেশ পথ।

সোমবার (৬ এপ্রিল) নগরীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ঘুরে সরেজমিনে দেখা গেছে এমন চিত্র। দুপুরে সিলেট নগরীর লামাবাজারের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের বিলপার এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা দুইটি প্রবেশ মুখে বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে স্বেচ্ছায় লকডাউনে যান। বহিরাগতদের প্রবেশ নিষেধ উল্লেখ করে সেখানে ঝোলানো হয়েছে সতর্কবার্তা। সাথে রয়েছে একটি সতর্কীকরণ পোস্টার।

একই চিত্র দেখা যায় নগরীর লামামাবাজার এলাকায় অবস্থিত ১৩ নং ওয়ার্ডের মণিপুরি পাড়ায়। এ পাড়াতেও তাদের এলাকায় প্রবেশের দুইটি ফটকে টাঙানো হয়েছে হাতে লিখা সাইনবোর্ড এবং বন্ধ করে রাখা হয়েছে মুল প্রবেশমুখ। সেখানে গেটের এক পাশে লাল কালিতে লেখা রয়েছে- ‘বহিরাগত প্রবেশ নিষেধ, ঘরে থাকুন সুস্থ থাকুন, লকডাউন’। গেটের অন্য পাশে লিখা রয়েছে ‘প্রবেশ নিষেধ, লকডাউন’।

এই পাড়ার একাধিক বাসিন্দা জানান, দিনদিন দেশে করোনা আক্রান্তদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারের একার পক্ষে এই করোনা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় যদি না দেশের মানুষ সচেতন হন। সরকার থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মানুষকে প্রতিদিনই সচেতন করার চেষ্টা করছে। তাদের এই সচেতনতা কেউ মানছেন, কেউ আবার মানছেন না। তাই নিজের সুরক্ষায় ও এ পাড়ার বাসিন্দাদের করোনার হাত থেকে বাঁচাতে নিজেরাই সচেতন হয়ে এই উদ্যোগ নিয়েছি আমরা।

এদিকে কোন কোন এলাকায় বাঁশ দিয়ে অস্থায়ী গেট নির্মাণ করে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে পাড়া বা মহল্লায় প্রবেশের পথ এবং সেখানেও টাঙিয়ে দেয়া হয়েছে ‘লকডাউন’ নামের সতর্কবার্তা। এমনই চিত্র দেখা গেছে নগরীর ১১ নং ওয়ার্ডে লালদিঘীর পাড় মণিপুরি পাড়ায়।

সেখানে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় অস্থায়ীভাবে বাঁশ ও বাঁশের শুকনো পাতা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটি অস্থায়ী গেট। সেই গেটে কালো কালি দিয়ে লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা রয়েছে। সেখানে বড় করে লেখা রয়েছে ‘লকডাউন’। একই সাইনবোর্ডে আরও লেখা রয়েছে- 'প্রয়োজন ব্যতীত আসা যাওয়া নিষেধ’। একইসাথে এলাকায় রিকশা ও সিএনজি চালিত অটো রিকশা প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তারপরও যদি জরুরী প্রয়োজনে কেউ আসেন তাকে পাড়ার ভিতরে প্রবেশ করতে হয় সাবান পানি দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে অথবা হ্যান্ড স্যানিটাইজারের মাধ্যমে হাতকে ভালো করে পরিষ্কার করে। পরে আগন্তুকের পুরো শরীরে জীবাণুনাশক স্প্রে করার মাধ্যমে অনুমতি মেলে ভিতরে প্রবেশে।

এ ব্যাপারে কথা এলাকার বাসিন্দা বিমল সিংয়ের সাথে। তিনি জানান, প্রতিদিন কারণে-অকারণে এলাকায় অনেক বহিরাগতরা আসেন। তাদের যাতায়াতের কারণে এখানে করোনার সংক্রমণ হতে পারে। তাই ঝুঁকি এড়াতে সচেতন এলাকাবাসী এ উদ্যোগ নিয়েছেন।

একইভাবে পাড়ার লোকজনের বাইরে বের হওয়ায় ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে নগরীর ৪ নং ওয়ার্ডের আম্বরখানা এলাকার মণিপুরি পাড়ায়। ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাসহ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ পাড়ার বাইরে যেতে বা জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত বহিরাগতরা পাড়ার ভিতর প্রবেশ করতে পারেন না। তবু কাউকে যদি পাড়া থেকে বেরোতে হয় তবে আবার পাড়ায় প্রবেশের সময় রাস্তায় রাখা পানি ও সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করে নিতে হয়। পরে সেখানে ঢুকার অনুমতি মেলে। এখানে ২৪ ঘণ্টাই পাড়ায় প্রবেশের মূল ফটকটি বন্ধ রাখা হয় এবং ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে সতর্কবার্তা।

এই পাড়ার একাধিক বাসিন্দার সাথে কথা বলে জানা যায়, গত ২৬ মার্চ থেকে সরকার দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। এর আগে থেকেই পাড়ার যুবকরা সতর্কতামূলক উদ্যোগ নেয়। এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠদের সাথে আলোচনা সাপেক্ষেই পাড়ায় প্রবেশ ও বাইরে যাওয়া সীমিত করা হয়েছে। এখানে একটি মণিপুরি মন্দির আছে উল্লেখ করে তারা জানান, মন্দিরে পূজা-অর্চনায়ও সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। সাধারণত সন্ধ্যায় আরতির সময় মণিপুরি সম্প্রদায়ের লোকজন সমবেত হলেও বর্তমানে শুধু ‘ঠাকুর’ (যিনি মন্দিরে পূজা দেন) ধর্মীয় নিয়মগুলো পালন করেন।

তারা আরও জানান, এই পাড়ায় ৩০-৩৫টি মণিপুরি পরিবারের পাশাপাশি সবমিলিয়ে ৫০-৬০ পরিবার বসবাস করে; যাদের সবাইকে এই নিয়ম মেনে চলতে হয়। এসব নিয়ম মানতে কিছু মানুষের অনীহা থাকলেও স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য তারাও মানতে বাধ্য হচ্ছেন।

একই উদ্যোগ নিয়েছে নগরীর শিবগঞ্জ মণিপুরি পাড়া, সুবিদ বাজারের লন্ডনি রোড, আম্বরখানা বড় বাজার মণিপুরি পাড়া, করেরপাড়া, নয়াসড়কের মিশন গল্লি বাগবাড়িসহ নগরীর বেশ কয়েকটি এলাকার পাড়া-মহল্লার বাসিন্দারা। এদিকে এমন উদ্যোগের প্রশংসা করেছে সিলেটের সচেতন নাগরিকরা।

এ ব্যাপারে সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক, সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সিলেটে বিভিন্ন পাড়া বা মহল্লার বাসিন্দাদের এই উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার।

এটি দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগ উল্লেখ করে তিনি বলেন, নগরীর প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় যদি সবাই স্বেচ্ছায় এমন উদ্যোগ নেন; তাহলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ সহজ হবে। এজন্য সবাইকে এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।

এ ব্যাপারে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) মো. জেদান আল মুসা বলেন, নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের এমন উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তারা স্বেচ্ছায় লকডাউন নিয়ে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে নিজেকে ও অন্যকে রক্ষা করছেন।

এছাড়া নিজের স্বার্থে এবং পরিবার, সমাজ এবং দেশের জন্য সকলকে ঘরে থাকা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিটি পাড়া-মহল্লার বাসিন্দারা যদি নিজেদের এলাকার জনসাধারণদের এমনভাবে সচেতন হতে বাধ্য করেন, তাহলে সেটা দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত