সিলেটটুডে ডেস্ক

০৮ মে, ২০২৬ ২৩:১৪

কারাবন্দি সাংবাদিকদের মুক্তির দাবিতে রাজধানীতে নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্টের মানববন্ধন

কারাবন্দি সাংবাদিকদের মুক্তি এবং মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন করেছে নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্ট।

শুক্রবার (৮ মে) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক সরকার সাংবাদিকদের চরমভাবে নির্যাতন করেছে। দেশের ইতিহাসে এত সংখ্যক সাংবাদিকের নামে মিথ্যা মামলা ও আটকের খারাপ নজির স্থাপন করা হয়েছে। এসব মিথ্যা মামলা দ্রুত প্রত্যাহারের দাবি জানান নেতারা।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরা বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি। সাংবাদিকদের ভয়ভীতি, মামলা ও হয়রানির মাধ্যমে চুপ করিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র, সমাজ ও গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।

তারা দাবি করেন, স্বাধীন সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হলে জনগণের তথ্য জানার অধিকারও ক্ষুণ্ন হয়। মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন বহন করেন, যেখানে সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিবাদ এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার দাবি জানানো হয়।

সংগঠনের আহ্বায়ক আকতার হোসেন বলেন, ইউনূস সরকার আমলে সাংবাদিকদের নামে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া হয়েছে, চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। কারাবন্দি সাংবাদিকদের মুক্তি দেওয়া এবং সাংবাদিকদের নির্যাতন বন্ধ করার দায়িত্ব বর্তমান সরকারের। তারা যদি সেই দায়িত্ব না নেয়, তাহলে ধরে নিতে হবে তারা সাংবাদিকদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। রাজনৈতিক সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। আপনারা সাংবাদিকদের মুক্ত করে দিন। তাহলে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।

তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ভূমিকা থাকা জরুরি। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হবে এবং দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকদের ওপর প্রশাসনিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করে পেশাগত পরিবেশ নষ্ট করা হয়েছে।

মানববন্ধনে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে সংগঠনের সদস্য সচিব শেখ জামাল বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে ড. ইউনূস ক্ষমতা দখল করেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মুক্তমনাদের ওপর আঘাত হানে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন, মাজার, পির-ফকির-আউলিয়াদের সমাধি থেকে শুরু করে গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ করে নেয় ইউনূসগোষ্ঠী।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সাংবাদিকদের ওপর চাপ, হয়রানি ও সহিংসতার অংশ হিসেবে শত শত সাংবাদিককে আইনি হয়রানি, শারীরিক হামলা ও মামলার মুখোমুখি করা হয়েছে। শুধু অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিলই নয়, হাজারেরও বেশি সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এছাড়াও সাংবাদিক হত্যায়ও মদদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

শেখ জামাল বলেন, স্বাধীন গণমাধ্যমকে দুর্বল করার মাধ্যমে একটি গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় বয়ান নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। তিনি দাবি করেন, বিরোধী মত ও সমালোচনামূলক সাংবাদিকতাকে পরিকল্পিতভাবে দমন করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

বিভিন্ন সময় এ দেশের সাংবাদিকরা নির্যাতনের শিকার হলেও অধ্যাপক ইউনূসের আমলে নির্যাতনের ধরন পরিবর্তনের পাশাপাশি মব সহিংসতাকেও উস্কে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন বক্তারা। টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্র অফিসে আগুন দিয়ে সাংবাদিকদের হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে—এ ধরনের ঘটনায় দায়মুক্তি দিয়ে ন্যক্কারজনক উদাহরণ সৃষ্টি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলা হয়।

বক্তারা বলেন, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে নয়, সামগ্রিকভাবে দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে সংকুচিত করে। তারা বলেন, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না এবং এ ধরনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

ইউনূস সরকারের সাংবাদিক নির্যাতনের খণ্ডচিত্র তুলে ধরে শেখ জামাল জানান, শাহরিয়ার কবির, মোজাম্মেল বাবু, শ্যামল দত্ত, শাকিল আহমেদ, ফারজানা রূপা, শেখ জামাল, মঞ্জুরুল আলম পান্না, আনিস আলমগীরসহ সারাদেশে ৪৭ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়। বেশ কয়েকজন এখনো কারাগারে রয়েছেন। এছাড়া মেহেদী হাসান, শাকিল হোসেন, তাহির জামান, এটিএম তুরাব, প্রদীপ কুমার ভৌমিক, সোহেল আখঞ্জিসহ ১৩ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।

তিনি বলেন, এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। বক্তারা আরও বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সাংবাদিকতা পেশায় আসতে নিরুৎসাহিত হবে।

তিনি জানান, জাতীয় দৈনিক ও টিভি চ্যানেলের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকসহ সারাদেশে ৪৪৯ জন সাংবাদিকের নামে হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে, যা এখনো বহাল রয়েছে। এছাড়া জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক ও টেলিভিশনের বার্তা প্রধানসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের ১২০০ সংবাদদাতাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় পদ দখল করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন বক্তারা। বিটিভি, একাত্তর টিভি, সময় টিভি, ডিবিসি, গান বাংলা, এটিএন নিউজ, এটিএন বাংলা, মাই টিভি, বিজয় টিভি, নিউজ২৪ এবং আমাদের অর্থনীতি, আমাদের নতুন সময়, দৈনিক মুখপাত্র, কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ডেইলি সান, বাংলা নিউজ, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার অফিসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগ করা হয়।

তারা বলেন, নজিরবিহীনভাবে ১৬৮ সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে। জাতীয় প্রেসক্লাবসহ দেশের বিভিন্ন প্রেসক্লাবের ৭০০ সদস্যের পদ স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে। অর্ধশতাধিক সাংবাদিকের বিদেশযাত্রায় বেআইনি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ৪৭ জন সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাব বেআইনিভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।

বক্তারা বলেন, এসব ঘটনার ফলে গণমাধ্যম খাতে ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তারা মনে করেন, সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

শেখ জামাল বলেন, ইউনূসের আমলে যে নিপীড়ন চলেছে এবং ভবিষ্যতে যেন আর কেউ এমন নির্যাতন-নিপীড়ন করতে না পারে, সেই লক্ষ্যেই দেশের সাংবাদিক সমাজ ‘নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্ট’ গড়ে তুলেছে।

মানববন্ধন থেকে কয়েকটি দাবি জানানো হয়েছে। দেশের সকল সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। কারাবন্দি সাংবাদিকদের মুক্তি দিতে হবে। সাংবাদিক হত্যার বিচার করতে হবে। চাকরিচ্যুত সাংবাদিকদের চাকরি ফেরত দিতে হবে। ডিইউজে ও বিএফইউজে অফিস খুলে দিতে হবে। তিনি বলেন, অফিসের টাকাসহ মালামাল লুট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার বিচার করতে হবে। জাতীয় প্রেসক্লাবসহ সারাদেশের প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের সদস্যপদ ফিরিয়ে দিতে হবে। সাংবাদিকদের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিলের আদেশ প্রত্যাহার করতে হবে। সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব জব্দের আদেশ প্রত্যাহার করতে হবে। বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।

বক্তারা আরও বলেন, সাংবাদিক সমাজ ঐক্যবদ্ধ থাকলে ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তারা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় সব সাংবাদিক সংগঠনকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।

নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্টের আহ্বায়ক আকতার হোসেনের সভাপতিত্বে এবং সদস্য সচিব শেখ জামালের সঞ্চালনায় কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য রাখেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আলী, বগুড়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি জে এম রউফ, সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক জাকির হোসেন ইমন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) কোষাধ্যক্ষ সোহেলী চৌধুরী, আইনবিষয়ক সম্পাদক আসাদুর রহমান, দপ্তর সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস সোহেল, নির্বাহী সদস্য সাজেদা হক এবং একেএম ওবায়দুর রহমান।

এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাবেক অর্থ সম্পাদক রেজাউল করিম, ডিইউজের নির্বাহী সদস্য রারজানা সুলতানা, রহিমা খানম, রমজান আলী, শফিকুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম রফিক, শফিউর রহমান, ওয়ারেসুন্নবী খন্দকার, মাজেদুল ইসলাম পাবেল, এস এম কামরুজ্জামান সাগর, শেখ ইমন আহমেদ, নাইমুর রহমান স্বপন, গাজী তুষার আহমেদ, বিউটি রানী ও জয়নাল আবেদীন বাপ্পিসহ আরও অনেকে।

মানববন্ধন শেষে অংশগ্রহণকারীরা সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষা এবং পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত