আজ মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

রূপার কাছে চিঠি

মুনীর উদ্দীন শামীম  

রূপা, রাত পোহালেই ঈদ। জেনেছি, আপনি চমকে দিতে চেয়েছিলেন, মাকে। ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসে। মাকে নিশ্চয়ই খুব ভালোবাসতেন, আর মাও আপনাকে। ঈদের সকালে অন্য অনেকের মতো আপনিও নিশ্চয়ই খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতেন। অথবা উঠতেন না। হয়তো অনেক বেলা করে একটা আহ্লাদী ঘুম দিতেন। অথবা দিতেন না। আপনি আছেন, বাড়িতে, ঈদের দিন- সেটা ভেবেই আপনার ভাইবোন, মা, বন্ধু-স্বজনরা অনুপ্রাণিত থাকতেন। হাসিখুশি আনন্দে মেতে থাকতো আপনার, আপনাদের ঘর।
রূপা, আজ রাত, কাল সকালে, সারাদিন, পরের দিন, তারও পরের দিন নিশ্চয়ই আপনি ঈদের শুভেচ্ছা পেতেন। ক্ষুদেবার্তা পেতেন। বন্ধুদের কাছ থেকে, সহকর্মীদের কাছ থেকে, প্রিয়জনের কাছ থেকে। প্রিয়জন, সহকর্মী, বন্ধু-স্বজনরাও নিশ্চয় অপেক্ষা করতো। আপনার শুভেচ্ছাবার্তার। আজ রাত অথবা কাল সকালে, সারাদিন, পরেরদিন, তারও পরেরদিন থেকে থেকে বেজে উঠতো আপনার মুঠোফোন। শুভেচ্ছা-আনন্দে মেতে উঠতো আপনার, আপনাদের মুঠোফোনগুলি।  

রূপা, আপনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়েছেন। জানি না, পুরুষতন্ত্র, নারীবাদ, নারীর ক্ষমতায়ন-এসব ভারী ভারী শব্দগুচ্ছের সাথে আপনার বিদ্যা জাগতিক পরিচয় ছিল কিনা। হয়তো ছিল অথবা ছিল না। কিন্তু জীবনের প্রয়োজনেই আপনি বের হয়ে এসেছিলেন, ঐতিহ্যিক (ট্র্যাডিশনাল) বাঙালি পুরুষতন্ত্রের ঘেরাটোপ থেকে। ব্যক্তিগতভাবে লড়াইটা জারি রেখেছিলেন। কাঠামোর কাছে হেরে না গিয়ে, কাঠামোবদ্ধ জীবনের ব্যাকরণটাকে ভেঙে ছিলেন। বেরিয়ে এসেছিলেন ঘর থেকে।
তৈরি করেছিলেন আপনার সামাজিক-অর্থনৈতিক গতিশীলতা। রাতদিন, দিন রাতের যে পুরুষতান্ত্রিক মেরুকরণ, তাতেও নিশ্চয় আপনার আস্থা ছিল না। কাঠামোবিরুদ্ধ কোন মানুষের সে রকম আস্থা থাকার কথা না। আপনারও ছিল না। ছিল না বলেই আপনি সেদিন বগুড়া থেকে ময়মনসিংহের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন, রাতের বেলা। রাতদিনের পার্থক্য নয়; সময়টাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ, আপনার কাছে।

রূপা, আপনার নিশ্চয়ই মানুষের প্রতি আস্থা ছিল। আপনি নিশ্চয়ই ছোঁয়া পরিবহনের চালক, চালকের দু’সহযোগীকে মানুষ ভেবেছিলেন। অথবা মানবিক পুরুষ। একে একে সব যাত্রী যখন বাস থেকে নেমে পড়েছিল, তখনও নিশ্চয়ই আপনার নিজকে একা মনে হয় নি। কারণ আপনার আস্থা ছিল মানুষে। তিনজন মানুষের উপস্থিতি আপনার মনে কোনও ভয় তৈরি করে নি। তারপর আপাত মানুষ চেহারার তিনজন ব্যক্তি যখন হঠাৎ পুরুষ হয়ে উঠলো, কামাতুর পুরুষ, যৌন সন্ত্রাসী পুরুষ, তখন কি আপনি মানুষের প্রতি আস্থা হারিয়েছিলেন? পৃথিবীর তাবৎ পুরুষকে ঘৃণা করেছিলেন?

সবপুরুষের চেহারায় দেখেছিলেন ধর্ষকের মুখাবয়ব? সুযোগ পেলেই যে পুরুষ ধর্ষক হয়ে ওঠে- তখন তো এ সত্যটাই ছিল আপনার সামনে। আপনি কি কখনও ভেবেছিলেন, বিত্তের বিচারে মেহনতি মানুষ হলেও, শ্রমজীবী মানুষ হলেও, যৌনতার পুরুষতান্ত্রিক সামাজিকায়ন, পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামো, সেইসব মেহনতি-শ্রমজীবী প্রান্তিক পুরুষকেও ক্ষমতার কেন্দ্রে বসায়, বল প্রয়োগের পুরুষতান্ত্রিক বৈধতা দেয়? যৌন সন্ত্রাসের প্ররোচনা দেয়, নারীর শরীরকে দখলে নেয়ার বৈধতা দেয়? সম্ভবত ভাবেন নি। কারণ পুরুষতন্ত্রের  বিভৎসতায় নয়; আপনার সম্ভবত মানবিকতার সম্ভাবনায় আস্থা ছিল।  

রূপা, পিতৃহীন সংগ্রামী জীবনের নানা বাঁকগুলিকে একটু একটু সোজা করেই আপনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন। আপনি শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন। শিক্ষার আলো ছড়াতে চেয়েছিলেন। সে জন্যই ছুটে গিয়েছিলেন বগুড়ায়। শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় অংশ নিতে। আপনি আইনজীবী হতে চলেছিলেন। রাষ্টবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শেষ করে পড়ছিলেন আইন বিষয়ে। এ রকম অনেক স্বপ্নই হয়তো সুপ্ত ছিল, আপনার মনে।

জানি না, স্বপ্ন নিয়ে আপনি আকাশটাকে ছুঁতে ছেয়েছিলেন কিনা? কিন্তু জীবনটাকে যে ছুঁতে ছেয়েছিলেন, আপনার মতো করে- সেটা তো  নিশ্চিত। কিন্তু ছুঁতে চাওয়া জীবনটাই আপনাকে ছেড়ে চলে গেল। বড় বেশি আগে। পুরুষতান্ত্রিক নির্মমতায়। মানুষের চেহারায়, পুরুষের চেহারায় তিন ধর্ষকের নির্মমতায়।  

রূপা, আপনার কি সেদিন খুব রাগ হয়েছিল? এ রাষ্ট্রের প্রতি? রাজনীতির প্রতি? সমাজব্যবস্থার প্রতি? রাষ্ট্র-রাজনীতি ও সমাজের ব্যর্থতায় আপনার ভেতরে কি জেগে উঠেছিল রাশি রাশি ঘৃণা-ক্ষোভ? এই সব প্রশ্নের উত্তর আর কোনোদিনই জানা হবে না। কারণ আপনি নেই রূপা। ধর্ষক তিন পুরুষ আপনাকে খুন করেছে। অনায়াসে। চলন্তবাসে। যে বাসটিকে আপনি নিরাপদ ভেবেছিলেন। এ তিন পুরুষের মধ্যে একজনও যদি মানুষ থাকতেন, একজনও যদি মানবিক পুরুষ হতেন, তাহলে নিশ্চিত রূপা, আপনার বাড়িতে আজ অন্যরকম ঈদ হতো। আপনার বেতন বেড়েছে- এ খবর দিয়ে আপনি চমকে দিতে পারতেন, আপনার মাকে। যেমনটি আপনি চেয়েছিলেন।  

ক্ষমা করবেন রূপা, আমাদের। এ রাষ্ট্রকে, এ সমাজকে বাসযোগ্য করে তুলতে না পারার সম্মিলিত ব্যর্থতার বিপরীতে আমরা কেবল নির্বোধ ক্ষমা প্রার্থনাই করতে পারি। জানি না, আমাদের নির্বোধ-ব্যর্থতার জীবন রেখা আর কত দীর্ঘতর হবে?

মুনীর উদ্দীন শামীম, গবেষক ও উন্নয়ন কর্মী; সুশাসন বিষয়ক একটি কারিগরি প্রকল্পে কর্মরত।

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫০ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৮ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১১ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৩ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬০ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০১ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১২ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১০৭ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৬ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ