আজ মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ইং

একজন উপাচার্য মহোদয়ের কাজ কী?

জফির সেতু  

একদিন সকালে ক্যাম্পাসে আমার কক্ষে বসে আছি, এমন সময় উচ্চতর ক্লাসের আমার দুই ছাত্রী কেঁদেকেটে উপস্থিত হলো। তাদের জিজ্ঞেস করলাম, ঘটনা কী? তারা চোখ মুছতে মুছতে জানাল, তাদের এম. এ. ফাইনাল পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু আশানুরূপ ফল পায়নি! আমি বললাম এটা তো হতেই পারে। এতে কান্নার কী আছে? পরীক্ষা যেমন দিয়েছ, ফল তেমনই পাবে? কিন্তু তারা যে-তথ্য দিলো তা শুনে চক্ষু চড়কগাছ! আমি রীতিমত অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেলাম। পাঁচটি কোর্সের তিনটিতে তারা A/A- গ্রেড পেয়েছে বাকি দুটির একটিতে B+ ও অন্যটিতে ই পেয়েছে। এখানে আমার একটু খটকা লাগল; যারা বেশিরভাগ কোর্সে A/A- পায়, তারা একটি কোর্সে B+ পেতে পারে, কিন্তু B পায় কীভাবে? তবু মুখে বললাম, তাও তো হতেই পারে! একটা কোর্সে তোমরা তো কম নম্বর পেতেও পারো? ওরা বলল, না স্যার, আমরা পেতে পারি না। আপনি যদি খাতা দেখেন, যে-কেউ যদি খাতা মূল্যায়ন করেন, এই নম্বর কোনেভাবেই পেতে পারি না। আমি বললাম, খাতা তো আর একজন শিক্ষক দেখেন না। দেখেন, দুইজন। তারপর গড় করে নম্বর দেওয়া হয়। সো, তোমাদের কথা আমি মেনে নিতে পারছি না। তারা বলল, স্যার বিষয়টা এমন নয়। আসলে কোর্স শিক্ষকরাই আমাদের কম নম্বর দিয়েছেন। এবং কোর্স পড়ানোর সময় ওই স্যারদের সঙ্গে একটা বিষয়ে আমাদের মনোমালিন্যও হয়েছে, এবং তা রাজনৈতিক আদর্শকেন্দ্রিক। আসলে স্যার, আমরা গণজাগরণমঞ্চের সঙ্গে জড়িত ছিলাম! আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য মিছিলে গিয়েছিলাম; চৌহাট্টায় প্রতি সন্ধ্যায় আমরা প্রতিবাদ করতাম। এই হচ্ছে আমাদের অপরাধ। আমরা কোর্সের সবগুলো ক্লাসই করেছি, কিন্তু ওইখানেও কম উপস্থিতি দেখানো হয়েছে। এছাড়া আমরা মনে করি কোর্সশিক্ষক কম নম্বর দিয়ে আমাদের ‘সায়েস্তা’ করতে চেয়েছেন। তারপর তারা হড়হড় করে অনেক কথাই বলে ফেলল। বলল, স্যার, বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়েই পরীক্ষার খাতার বহির্পরীক্ষক থাকেন, আমাদের এখানে নাই কেন? আমাদের খাতা যদি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পরীক্ষক দেখতেন, আমরা নিশ্চিত অন্তত ই আমরা পেতাম না। এছাড়া, আমাদের উত্তরপত্রে পরীক্ষার্থীর রেজিস্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ থাকে, ফলে কোনো শিক্ষক যদি ‘আক্রোশবশত’ কাউকে কম নম্বর দিতে চান, তাহলে তিনি অনায়াসেই দিতে পারবেন। আপনারা উত্তরপত্র ডিকোড করেন না-কেন?

প্রকাশ্য রাখার দরকার কী? আমি একটু সময় নিলাম; বললাম, একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর প্রতি এমন অবিচার কিছু করতে পারেন না। কারণ তিনি শিক্ষক। নৈতিকতাই শিক্ষকের মূল ভিত্তি। আমি মনে করি তোমাদের কথায় যুক্তি আছে, কিন্তু কোনো শিক্ষক এমনটা করতে পারেন না! তখন তাদের একজন মুখের ওপর বলে বসল, স্যার সবাই তো আর এমন ভালো মানুষ হতে পারে না! স্যার, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা পাঁচ বছর পড়েছি; অনেককিছু শেখার জন্য এসেছিলাম, শিখেছিও সত্য। তবে ভার্সিটির অনেক শিক্ষক নৈতিক দিক থেকে খুবই নিম্নমানের। যদিও এদের সংখ্যা কম, কিন্তু তাদের দ্বারাই ছাত্ররা ক্ষতিগ্রস্ত হয় সবচেয়ে বেশি।

এসব কথা শোনার পর আমার সত্যি শরীর খারাপ করতে লাগল। মনে হলো সেই অপমানটা আমার গায়েও এসে লাগল। ওরা আরও বলল, স্যার, ভাইভাতে যে কম নম্বার পেয়েছি, এবং আমাদের গ্রেড কমেছে, তার পেছনেও কারণ আছে। আমি বললাম, আমি আর কিছু শুনতে চাই না। এর সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতাও নেই। আমি এ-ব্যাপারে তোমাদের কোনো সাহায্যও করতে পারব না। তোমাদের যদি কিছু বলার থাকে, তোমরা সংশ্লিষ্ট কোর্স শিক্ষককে জানাতে পারো। বা, পরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যানকে। ওরা তখন আরো উত্তেজিত হলো। বলল, স্যার, পরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান এটা কী ঠিক করেছেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী? ওরা বলল, এম. এ. ফইনাল-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ডিগ্রির পরীক্ষায় উনি এক্সপার্ট করেছেন, বাংলা বিষয়ের কোনো অধ্যাপককে নয়, অন্য এক বিষয়ের অধ্যাপককে। এটা কেন করা হলো? বাংলাদেশে কি বাংলা বিষয়ের অধ্যাপকের আকাল পড়েছে? আমরা স্যার, সব বুঝি। আসলে আমরা গ্রাম থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছি, গরিব মানুষের সন্তান। বাবারা কৃষক, একটা সার্টিফিকেট দরকার। তাই অনেক জিনিস সহ্য করি, প্রকাশ করি না। কোনোদিন যদি দাঁড়াতে পারি, তবে বলব। সব খোলাসা করব! আমি বললাম, তাহলে তোমরা ডিন বা ভিসি স্যারকে তোমাদের দুঃখের কথা জানাতে পারো। তারাও তো শিক্ষক। এরপর আমি বিষণ্ণ ও অপমানিত মনে ওদের বিদায় করে ক্লাসের দিকে পা বাড়ালাম। মনে হলো আমিই আমাকে অপমান করেছি।

এই ঘটনার দু-সপ্তাহ বাদে একদিন রাতে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেখি। দেখে আমি হতভম্ব হয়ে যাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের সকলের পরিচিত ও অত্যন্ত জনপ্রিয় এক সংস্কৃতিকর্মী ছাত্রের এম.এ. পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয় ঘটেছে। এবং সে অভিযোগ করছে তার বিভাগের এক শিক্ষকের প্রতি। তার কথার মর্ম হচ্ছে, ওই শিক্ষক তার প্রতি অবিচার করেছেন। সে যে শুধু অকৃতকার্য হয়েছে তা নয়, শিক্ষক এমন ফন্দি করেছেন যে, তার একবছর লসও হয়ে গেছে। এখন সে প্রতিকার চায়। অতীতের সকল পরীক্ষায় তার ফলাফল ভালো, কিন্তু একটা কোর্সে তাকে ফেল করানো হয়েছে ইচ্ছা করেই। ছেলেটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত এবং সংগঠকও। বিভিন্ন সংগঠনের সভাপতি ও সেক্রেটারিও ছিল। গণজাগরণমঞ্চের সঙ্গে তার যুক্ততা ছিল ওতপ্রোত। ছেলেটি এমনই নিরীহ যে, তার সঙ্গে যতবার কথা বলেছি আমার খুব মায়া হতো। এখন সে আফসোস করছে, কেন সে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে জীবনটাকে নষ্ট করল। স্ট্যাটাসটা দেখে আমি খুব কষ্ট পেলাম, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে মনে হলো এটা যদি ঠিক হয়, তাহলে আমাদের মরে যাওয়াই উচিত!

কিন্তু এইরকম ঘটনা যে আমার জন্য নতুন, তা কিন্তু নয়। আমি নিজেও এইসব দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার ভেতর দিয়ে এসেছি। হয়ত এজন্যই দুটো ঘটনা আমাকে খুব স্পর্শ করেছে। ছাত্রছাত্রীদের ফলাফল কেলেঙ্কারি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকটা ঐতিহ্যেই(!) যেন পরিণত হয়েছে। এসব বিষয়ে অনেকে জানেন বা বুঝেন কিন্তু মুখ খুলেন না। ভাবেন, এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম নষ্ট হবে। আর এ-ধরনের ভাবনা ও ধারণা সত্যি কত হাস্যকর ব্যাপার!


ওপরের দুই ঘটনার বাস্তবতা কতটুকু আমি জানি না। তবে, আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অভিজ্ঞতা আরও করুণ। দু-একজন ‘বদ’ শিক্ষকের জালিয়াতির জন্য আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিতে ঢুকতে অপেক্ষা করতে হয়েছে বারো বছর। এরা আমার জীবন থেকে বারোটা বছর কেড়ে নিয়েছে। আর আমি তাদের বরাবরই অভিসম্পাত করে আসছি, আমাকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্য। এদের ব্যাপারে আমার মনের ভেতরে এখনো তীব্র ঘৃণা জমা আছে। কিন্তু যারা এটা করেছে, তাদের আমি আমার শিক্ষক বলতে লজ্জাবোধ করি আজও।

আমি জানতাম, এম. এ. পরীক্ষায় আমি প্রথম হবো। কারণ পরীক্ষাটাকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছিলাম। অনার্সেও আমি মেধা তালিকার ওপরের দিকেই ছিলাম। কিন্তু ভাইভাতে কম নম্বর পাওয়ার কারণে আমার ফলাফল ভালো হয়নি, কারণ আমি স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেছিলাম বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত ও প্রাচীন কলেজ থেকে। আর যারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাইভা নিতে আসতেন তাদের ধারণাই ছিল কলেজের সকল ছাত্রই গোমুর্খ। ফলে গোমুর্খদের ভালো নম্বর দেন কী প্রকারে? আমি কম নম্বর পেয়েছিলাম। যা-ই হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পেতে আমার দরকার ছিল, একটা প্রথম শ্রেণি। আর প্রথম শ্রেণি পেলে আমি তো প্রথম হবোই, এটা ছিল যুক্তি। আর আমার প্রতিদ্বন্দ্বী যারা ছিল, তাদের আমি গতিবিধি লক্ষ্য করতাম। দেখতাম আমি যে-রকম পড়ছি তারা সে-রকম পড়ছে না। তাই আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিশেষ একটা কারণে আমার মনে হয়েছিল, আমি সুবিচার না-ও পেতে পারি। কেননা, সেবছর বাতাসে রটনা ছিল, এবার যে যত ভালো পরীক্ষাই দিক না-কেন, ফার্স্ট হবে ‘ওমুক’ অর্থাৎ, একজন প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানটাই।

লিখিত পরীক্ষা আমি আশানুরূপই দিয়েছিলাম। যেহেতু বহির্পরীক্ষক আছেন, সুতরাং ভয় নাই। কিন্তু ভয় হলো টার্ম পেপার ও মৌখিক পরীক্ষায়। সেখানে ‘যাচ্ছেতাই’ নম্বর দেওয়া যায়। কিন্তু আমার টার্ম পেপার ভালো হয়েছে। আর সাধারণত টার্ম পেপারে মোটামুটি মানের ছাত্রকেও ভালো নম্বর দেওয়া হয়। আর আমাকে তো শিক্ষকরা ভালোই জানেন। অতীতের ফলাফলও ভালো। এমন সময় আশার সংবাদ পেলাম, মৌখিক পরীক্ষা নিতে আসছেন দেশের সবচেয়ে পরিচিত ও পণ্ডিত অধ্যাপক মহাশয়। আমার খুশিতে আর ধরে না। কিন্তু আমি মৌখিক পরীক্ষার জন্য যখন বোর্ড-কক্ষে প্রবেশ করব, তখন চালাকি করে বোর্ডের দুজন শিক্ষক অধ্যাপক মহাশয়কে ওয়াশরুমে পাঠিয়ে দেন! মহাশয় কিছুক্ষণ ধরে ওয়াশরুমে যেতে চাচ্ছিলেন। তারা মোক্ষম সুযোগটা হাতে নিলেন, যখন আমার পালা আসল। এবং আমাকে এমন সব প্রশ্ন করলেন দুজন মিলে, আমি হাসব না-কাঁদব বুঝতে পারছিলাম না। আমি যা বলি, তারা বলেন, হলো না। ভেবে বলো। আমি বললাম, ভেবে বলেছি। একসময়, আমাকে বলা হলো, তুমি এবার আসো। আমি যখন বের হচ্ছিলাম, পণ্ডিত মহাশয় দরোজায় হেসে জিজ্ঞেস করলেন, ভাইভা হলো ঠিকমতো? আমি কাষ্ঠ হাসি দিয়ে বললাম, জ্বি, স্যার! ততক্ষণে আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে।

পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলে দেখা গেল, আমি দ্বিতীয় হয়েছি, আর আমার সহপাঠী/সহপাঠিনীটি হয়েছে প্রথম। আর দুজনের নম্বরের পার্থক্য হচ্ছে মাত্র ‘এক’(!)। এই ফলাফলে আমার অপরসব সহপাঠী/সহপাঠিনীটি খুব কষ্ট পেয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল, বাতাসে অনেক কথা উঠেছিল সত্য, তবে আমিই প্রথম হবো। পরে যেটা জানলাম, মৌখিক পরীক্ষাতে আমাকে তৃতীয় শ্রেণির নম্বর দেওয়া হয়েছে, আর আমার সহপাঠী/সহপাঠিনীটি দেওয়া হয়েছে আশি পার্সেন্টের ওপরে নম্বর। শুধু তাই নয়, আমার টার্মটেস্টের নম্বরে ফ্লুইট মেরে নম্বর কমানো হয়েছে। একজন শুভাকাঙ্ক্ষী আমাকে এই তথ্য দিয়ে বলেছিলেন আমি যেন কাউকে না-বলি, তাহলে তার চাকরি যাবে! আমি মুখ খুলিনি।

আমি তখন বিভাগের দুজন শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করলাম, কিছু করা যায় কি না, এই আশায়। এদের একজন বিশিষ্ট লেখক অধ্যাপক ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ, আরেকজন বিশিষ্ট ভাষাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান। সব শুনে আজাদ স্যার আমাকে আলিঙ্গন করলেন। তারপর বললেন, ‘ওরা তোমাকে ফার্স্ট ক্লাশ দেয়নি, আমি দিলাম। যাও আমি তোমাকে ফার্স্ট ক্লাশ দিলাম।’ কিন্তু আমি চাইছিলাম অন্যকিছু। স্যার বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে এরকম চ্যালেঞ্জ করলে ফল তেমন একটা আসবে না। অর্থাৎ আইন তোমার পক্ষে নয়। আমি বোকার মতো স্যারের দিকে তাকিয়েছিলাম। তখন তিনি নিজেও তার জীবনে ঘটে-যাওয়া অবিচারের কাহিনি বললেন। সবশেষে বললেন স্মরণকালের সেরা ফলাফল করেও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারেন নি, তারই ‘দুরাচার’ কয়েকজন শিক্ষকের কারণে! শেষে বললেন, ‘যারা তোমাকে ঠকিয়েছে, দেখবে, মানুষ ওদের নয়, তোমার কথাই একদিন স্মরণ করবে। কিন্তু তোমাকে পড়াশোনা ও লেখালেখি চালিয়ে যেতে হবে!’ সবশুনে মনিরুজ্জামান স্যার বললেন, তোমার তো ফার্স্টক্লাস না-পাওয়ার কথা নয়, তোমার খাতা আমি দেখেছি। আমি তো একটা খাতায় সত্তরের ওপরে নম্বর দিয়েছি। ধারণা করেছি, ওঠা তোমারই হবে। আমি বললাম, আমি ওই পেপারে হাইয়েস্ট নম্বর পেয়েছি!’ স্যার বললেন, কী বলব জফির, এইসব যখন শুনি তখন নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগাতে ইচ্ছে করে! আমি বললাম, স্যার আমি এখন কী করব? স্যার বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে তোমার কোনো লাভ হবে না। শিক্ষকরা যে-নম্বর দিয়েছেন, তার ভিত্তিতেই তো ফলাফল হয়! তুমি বরং এক কাজ করো, এম. ফিল.-এ ভর্তি হও। আমি ডিন আছি, তোমার জন্য একটা স্কলারশিপ ব্যবস্থা করতে পারি কিনা দেখব। আমার তখন চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল।

আমার তাহলে কিচ্ছুটি হচ্ছে না! আর, এটা কেমন দেশ, একজন ছাত্রের প্রতি ‘দুষ্ট’ শিক্ষকরা অবিচার করবে, আর সে নিরীহ ছাত্রটি বিচারও চাইতে পারবে না? বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন তবে ছাত্রের পক্ষে নয়? তখন অতো কিছু বুঝতাম না। আমি আমার জীবনের এই বঞ্চনার ঘটনা একদিনের জন্যও ভুলিনি। পরে যদিও এমফিলে ভর্তি হয়েছিলাম ড. মনিরুজ্জামান স্যারের তত্ত্বাবধানেই, আমার বিভাগ ও শিক্ষকদের প্রতি এতই ঘৃণা জন্মেছিল যে, আমি আর কোর্স-ওয়ার্ক করতেও যাইনি, ওই শিক্ষকদের মুখ দেখব না বলে। এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অনুষ্ঠানে যোগদান করিনি আমি, না রি-ইউনিয়নে, না-কনভোকেশনে। চাকরিতে দরখাস্ত তো অনেক দূরের ব্যাপার! কারণ ওই বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে অপমান করেছে শিক্ষক ও তার আইন দ্বারা!


আমার সাহস কম ছিল, তখন আমি লিখিত কোনো অভিযোগ করতে পারিনি। বা ভিসি মহোদয়ের সঙ্গে দেখা করে নিজে বিচারপ্রার্থীও হতে পারিনি। কিন্তু সময় পাল্টেছে, এখনকার ছেলেমেয়েরা খুব তেজি, সাহসী। আমি আমার ছাত্রছাত্রীদের ঘটনায় কয়েকদিন স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলাম, আমার বারবার নিজের জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনার সঙ্গে ওদের ভেতরকার ওলট-পালটকে মিলিয়ে নিচ্ছিলাম। কিন্তু সে রকম কিছু বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছিল। ভাবছিলাম, উল্লিখিত তিনজন ছাত্রের অনুমান, সন্দেহ ও অবিশ্বাস মিথ্যে হোক। এটা হোক তাদের একটা অভিমানমাত্র!

একদিন বিকেলে ওই দুই ছাত্রী আবার হাজির হলো গম্ভীর ও ব্যর্থ চেহারায়। জানতে পারলাম, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক কর্তাব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছে, দরখাস্ত করেছে ভিসি মহোদয়ের বরাবরে। দেখাও করেছে। ভিসি মহোদয় জানিয়েছেন, তার করার কিছু নাই! ওরা কাতর হয়ে বলেছে, স্যার আপনি অন্তত আমাদের খাতাগুলো দেখুন, আমরা কী লিখেছি, অথবা মূল্যায়নের জন্য অন্য বিশ্বদ্যিালয়ে পাঠান, কিংবা বিভাগের অন্য শিক্ষকদের দিয়ে মূল্যায়ন করান। স্যার, আমরা জানি এত কম নম্বর পেতে পারি না, আমরা পরীক্ষা দিয়েছি। ওরা স্যারকে আরো অনুনয় করে বলেছে, স্যার আপনি আমাদের বাবার মতো। প্লিজ স্যার, আমাদের প্রতি যে-অন্যায় করা হয়েছে, তার প্রতিকার করুন। ভিসি মহোদয় বারবার বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী আমি কিছুই করতে পারি না। তোমাদের কথা যদি সত্যও হয়, আমি কিছু করতে পারব না!

তারপর ওরা বলেছে, স্যার, আপনি নির্বাহী আদেশেও তো খাতাগুলো বাইরে পুনর্পরীক্ষণে পাঠাতে পারেন? তখন স্যার যে-জবাব দিয়েছিলেন, তাতে ওরা সবচেয়ে আশ্চর্য হয়েছে, বেশি কষ্ট পেয়েছে। ভিসি মহোদয় বলেছেন, তোমাদের পড়াশোনা শেষ হয়েছে, তোমরা ক্যাম্পাসে কেন? তোমাদের বয়েস হয়েছে, তোমরা বিয়েশাদি করবে, সংসার করবে, তোমাদের বাচ্চাকাচ্চা হবে। এসব পাগলামি করো না। যাও, তোমরা। তারপর ওরা কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে এসেছে। তাদের এই কান্না ছিল একজন ভিসি মহোদয়ের দৃষ্টিভঙ্গি দেখে, তিনি এম.এ. পাশ একজন স্নাতককে, একজন নারীই মনে করেন, মানুষ নয়! তারা তাহলে এতদিন কোথায় পড়াশোনা করেছে? বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কী শিখিয়েছে? ওরা আরো জানায়, অন্য বিভাগের সেই হতভাগা ছাত্রটির কথা, ভিসি মহোদয় তাকেও বলে দিয়েছেন, তার কিছু করার নাই। আর অফিসে মৌখিক আদেশ জারি করেছেন, এসব নিয়ে যেন কোনো শিক্ষার্থী তার অফিসে না-আসতে পারে। এবং এরকম কোনো দরখাস্তও যেন কেউ গ্রহণ না-করে!


এই দুটি ঘটনা আমাকে অনেক ভাবিয়েছে, কিন্তু ঘটনাগুলো কতটা সত্য আমি জানি না। তবে আমার জীবনে ঘটে-যাওয়া ঘটনার সত্যতা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নৈতিকতাকে বিচার করি। বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশিরভাগ শিক্ষকই উন্নত নৈতিকতার এটা সত্য, তবে অনৈতিক চরিত্রের অধিকারী শিক্ষক নেই এমনটা আমি মানি না। আমি নিজে আমার পরীক্ষার ফলাফলে দেখেছি। আমি বিচার চাইনি, বা বিচার চাওয়ার প্রক্রিয়া জানতাম না, কিংবা আমার অতোটা সাহস ছিল না তখন। কিন্তু এটা ঠিক, এরকমটা ঘটে। এবং আমরা সকলেই এটা জানি, কিন্তু প্রকাশ করি না, করতে চাই না। ফলে দিনদিন এটা বেড়েই চলেছে, থামছে না। এবং এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একদিন ভগ্নস্তূপে পরিণত হবে, আমি তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।

এখন কথা হলো, যদি কোনো শিক্ষক কর্তৃক কোনো শিক্ষার্থী এরকম অবিচার ও অন্যায্যতার শিকার হয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আইনে কি তার প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা থাকবে না? যদি না-থাকে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় বানানো হয়েছে কীসের জন্য? আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের নৈতিকতার কথা বলব, সুবিচারের কথা বলব, সৎসাহসী হওয়ার উপদেশ দেবো, আদর্শ চরিত্র ও রাষ্ট্রগঠনের কথা বলব আর বাস্তব ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই তা পালন করবে না! তা তো হয় না।

তাহলে তো বিশ্ববিদ্যালয় যথোপযুক্ত মানুষও গড়তে পারবে না। কারণ শিক্ষাদান ও বাস্তবতার মধ্যে সংঘাত দেখলে শিক্ষার্থীরা ভালো ও সমর্থ মানুষ হওয়া দূর থাকুক, বিভ্রান্ত মানুষেই পরিণত হবে, আর হচ্ছেও আকসার। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন যদি এরকম সংবেদনশীল ঘটনায় সুবিচারের পরিপন্থী হয়, তাহলে উপাচার্য মহোদয়রা তাদের প্রজ্ঞা ও সদিচ্ছা দিয়ে তার সমাধান করতে পারেন বলে আমার বিশ্বাস। প্রয়োজন হলে আইন সংশোধনও করা যেতে পারে, আইন তো মানুষের স্বার্থেই করা হয়। নিশ্চয়ই আইনের জন্য মানুষ নয়! আর এই জন্য দরকার তেমন উপাচার্যের, যিনি নিজের বিবেক ও প্রজ্ঞার কাছেই একমাত্র দায়ী থাকবেন, চাকরি বাঁচানো বা নিজের টার্ম ভালোয় ভালোয় পার করে দেওয়া নয়, কিংবা নয় কোনো ‘বিশেষ গোষ্ঠী’র কাছে মুখরক্ষা করে চলা। কেননা, তার হাতে ন্যায়ের দণ্ড তুলে দেওয়া হয়েছে। এবং এই দণ্ড বিধাতার। তিনি যদি ভয় পান, অন্যায়ের কাছে মাথা নিচু করেন, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন, তাহলে এই ধরনের অন্যায় বাড়বে বই কমবে না। এই ন্যায়ের দণ্ড তিনি যদি শিক্ষার্থীর প্রতি, প্রজন্মের প্রতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি তথা দেশের মানুষের প্রতি প্রতিষ্ঠিত না-করতে পারেন, তাহলে প্রাজ্ঞ মানুষ হিসেবে একজন উপাচার্য মহোদয়ের কাজ কী?

জফির সেতু, কবি, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক। সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৩ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৪০ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫৩ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ২১ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩৩ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৬ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০৮ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১৭ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১২৫ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৭ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ