আজ সোমবার, ২০ মে, ২০১৯ ইং

মাশরাফির কৈফিয়ত চাওয়া কি অন্যায়?

এস এম নাদিম মাহমুদ  

বউ সবে হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ শুরু করেছে। দিনের বেলায় বিভিন্ন শিফটে টিউটি ছাড়াও মাঝেমধ্যে তাকে টানা ১২ ঘণ্টার নাইট ডিউটি করতে হচ্ছে। এই থেকে কিছুটা হলে উপলব্ধি করতে শিখছি, ডাক্তারি পেশা আসলে ‘অমানবিক’ পরিশ্রমের পেশা। মেডিকেলে ভর্তির পর থেকে শুরু হয় সেই ‘অমানুষিক নির্যাতন’। তাই ডাক্তারদের কর্মলয়ে থাকে না কোন টাইমটেবিল কিংবা একঘেয়েমি। তাই সম্মানের জায়গায় ডাক্তাররা এখনো উপরের সারিতে।

এইবার আসি সাম্প্রতিক প্রসঙ্গে। নড়াইলের সাংসদ মাশরাফি বিন মুর্তজা হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসক না পাওয়ার পর ওই হাসপাতালের চার চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে গতকাল যে সংবাদ বের হয়েছিল, তার প্রসঙ্গে ক্ষুব্ধ ডাক্তাররা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন, তা সত্যি হতাশার জন্ম দিয়েছে।

নড়াইল সদর হাসপাতালে চিকিৎসকদের ৩৯টি পদের মধ্যে আরএমও এবং পাঁচজন সংযুক্তিতেসহ ১৭ জন কর্মরত থাকার পরও হাসপাতালে যেমন ডাক্তার না থাকার যুক্তিকে বৈধতা দেয়ার কোন সুযোগ নেই, তেমনি জনপ্রতিনিধিকে হেয় করার কোন সুযোগ নেই।

মাশরাফি সাংসদ বলেই তার কর্মক্ষেত্রে কৈফিয়ত চাওয়ার অধিকার রয়েছে এমন নয়, প্রজাতন্ত্রের প্রতিটি কর্মচারীর কাজের কৈফিয়ত চাওয়ার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে।

আজ বিষয়টি হয়তো, ম্যাশ করেছে বলে আপনারা এতোটা আলোচনা করার সুযোগ পাচ্ছেন, কিন্তু বাংলাদেশে বিভিন্ন হাসপাতালের চিত্র খুঁজলে আপনি নড়াইলের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাবেন।

এই দীর্ঘদিনের সমস্যার কথা কতজন নাগরিক যে অভিযোগ করেছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। কারণ, তারা কোন সমস্যার সমাধান পায়নি।

আজ ডাক্তাররা সত্যি করে বলুন তো, নড়াইল সদর হাসপাতালে চিকিৎসকদের অনুপস্থিত থাকা আপনি সমর্থন করেন কিনা? চিকিৎসার মতো একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হাসপাতালের দায়িত্ব ফেলে ডাক্তারদের অন্যত্র চিকিৎসা দেয়াকে সমর্থন করেন কিনা?

যদি তিনজন ডাক্তার দিয়ে দুইশ রোগী দেখা অসম্ভব বলে দাবি করেন, তখন কি জানেন বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কি পরিমাণ শিক্ষক সংকট আছে? আপনি কি জানেন, দুই জন শিক্ষক দিয়ে দেড়শ শিক্ষার্থীর ক্লাস নেয়া হয়?

হাসপাতালে যন্ত্রপাতির সংকটের কথা যখন বলছেন, তখন আপনি কি জানেন, কতজন শিক্ষার্থী এখনো খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করে?

স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শ্রেণি কক্ষ, পরীক্ষাগারের সামগ্রী, লাইব্রেরীর বই সংকটের পাশাপাশি এখনো শ্রেণি শিক্ষকদের সংকটে নুয়ে পড়ছে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

গরীব একটি রাষ্ট্র এখনো স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেনি। এই দেশের এক শ্রেণির শোষণের কারণে আজ আপনার হাসপাতালে সহকর্মী সংকট পড়েছে কিংবা শিক্ষালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট রয়েছে। আর এই সময় মেনে নিয়ে আমরা চলছি। আপনাদের দিকে চেয়ে আছি।

কিন্তু দায়িত্ব পালনের সময় যদি আপনি অনুপস্থিত থেকে সেটাকে বৈধ বলে মনে করছেন, তা মেনে না কষ্টকর।

শুধু বাংলাদেশের চিকিৎসক বলে নয়, সারা বিশ্বের চিকিৎসকদের পরিশ্রমের পাল্লাটা অন্যান্য পেশার চেয়ে বেশি। আর এটা মেনে নিয়ে আপনি যেমন মেডিকেল কলেজে পড়াশুনা করে ডাক্তারি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তেমনি ত্রিশ বেডের হাসপাতালে দুইশজন রোগী কেন আসবে তা বলে ঘরে বসে থাকবেন তা কখনোই শোভনীয় নয়।

আমরা এমন এক জাতি, যারা কয়েক সেকেন্ডে আবেগের জ্বরে কাউকে মাথায় তুলি, আবার স্বার্থের আঘাত পড়লে তাকে মাথায় থেকে নামাতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিই না। এটা আমাদের দরিদ্রতম মানসিকতারই ফসল।

ক্রিকেটের সাথে যারা চিকিৎসকদের তুলনা করতে গেছেন, তারা জানে না চিকিৎসার কাছে ক্রিকেট নস্যি। ১ জন ক্রিকেটার কখনো ১১ জনের হয়ে খেলতে পারে না তেমনি ১ জন ডাক্তার হয়ে ১৭ জনের কাজ করতে পারবে না এটাই স্বাভাবিক। তবে ১ জন ডাক্তার যেমন ১০জন রোগীর মধ্যে হাসি ফুটাতে পারে সেখানে স্টাম্প-বল-ব্যাট নিয়ে একজন ক্রিকেটার দাঁড়িয়ে থাকবে এটাই স্বাভাবিক নয় কি?

তাই ক্রিকেট আর চিকিৎসাকে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না।

আপনি যখন বলবেন, সপ্তাহের পাঁচদিনের ছুটি ছয়দিন করবেন কেন? আপনি কি জানেন বাংলাদেশের এখনো অনেক পেশা আছে যাদেরকে সাত দিনই করতে হয়? সাংবাদিকদের সপ্তাহে একদিন যদি ডে-অফ থাকে মাঝ মধ্যে মাঝ রাতে উঠে সংবাদ সংগ্রহে যেতে হয়?

সব পেশাই সম্মানীয়। আপনাদের পেশাকে সবচেয়ে বেশি সম্মান দেয়া হয় সেটা যেমন সবাই জানে, তেমনি আপনাদের পরিশ্রমের পাল্লা সবার চেয়ে একটু আলাদা। আর এটা জানেন বলেই আপনি ডাক্তার। তাই প্লিজ, নিজের অনুপস্থিত থাকাকে কখনো যৌক্তিক প্রমাণ করতে আসবেন না।

এস এম নাদিম মাহমুদ, জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৮ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৪৮ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৪ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৪ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১১ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৬৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৪ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৩৯ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৪ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ৯৫ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১০৪ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ৮২ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১১ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৫ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ