আজ সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

নুরেমবার্গ থেকে ঢাকা: দেশে দেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার

রাজেশ পাল  

যুদ্ধ মানবজাতির ক্রমবিকাশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।সৃষ্টির আদিকাল থেকে আধিপত্য বিস্তারের নেশায় মানুষ জড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধে। যুদ্ধ আনে হিংসা,তৈরি করে বিভেদ,জন্ম দেয় কান্না আর জিঘাংসার।তারপরেও মানুষ যুদ্ধকে বিবেচনা করে গৌরবের অংশ হিসেবেই।ফলে যুগে যুগে বীর যোদ্ধাদের নিয়ে রচিত হয়েছে অসংখ্য গৌরবগাঁথা।আর সেই গৌরবগাঁথার আড়ালে চাপা পড়ে গেছে অসংখ্য সাধারণ মানুষের বুকফাটা কান্না আর আহাজারি।

সভ্যতা যতই এগিয়ে যেতে লাগলো ক্রমে ক্রমে এই রণোন্মদনার বিপক্ষে সোচ্চার হতে থাকেন শান্তিপ্রিয় মানুষেরা।যুদ্ধ হলে যুদ্ধাপরাধ ঘটবেই।হবে অগণিত বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি।সুযোগসন্ধানীরা নেমে পড়বে গণহত্যা,ধর্ষণ,লুটপাট আর অগ্নিসংযোগে।প্রচলিত ভাষায় শান্তিকালীন সময়ে এগুলোর প্রত্যেকটিকে বলা হয়ে অপরাধ।আর যুদ্ধকালীন সময়ে সংগঠিত হয় বলে এই অপরাধগুলোর নাম হয়ে পড়ে যুদ্ধাপরাধ।এ সব অপরাধের বিচার ও শাস্তির বিধান ভারত, চীন, মেসোপটেমিয়া, গ্রীস ও মিসরের প্রাচীন ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে।

প্রাচীনকাল:
যুদ্ধের সময় বিবদমান উভয় পক্ষকে কিছু নিয়ম বা রীতি মান্য করার বিধান মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম গৃহীত হয়েছে প্রাচীন ভারতবর্ষে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময়। এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল পাঁচ হাজার বছরের আগে। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য ‘মহাভারত’-এ এই যুদ্ধের কারণ, বিবরণ, যুদ্ধের অস্ত্র, কলাকৌশল, কূটনীতি প্রভৃতির পাশাপাশি যুদ্ধের আইনের উল্লেখ রয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিবদমান পাণ্ডব ও কৌরবরা কতগুলো নিয়ম বা আইন মান্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে যুদ্ধের সময় উভয় পক্ষই এসব আইন ভঙ্গ করে যুদ্ধাপরাধ করেছিল। সেই সময় যুদ্ধাপরাধের জন্য জাগতিক শাস্তির বিধান ছিল না। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আইন লঙ্ঘনকারীরা যুদ্ধাপরাধের জন্য ঐশ্বরিক শাস্তি ভোগ করেছিলেন, যে শাস্তি থেকে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরও রেহাই পাননি। তাঁর অপরাধ ছিল প্রতিপক্ষকে অর্ধসত্য বলে প্রতারণার।কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর চীন, মেসোপটেমিয়া, মিসর ও গ্রীসে যুদ্ধের নিয়ম বা আইনের উল্লেখ সামরিক ইতিহাসে পাওয়া যাবে। আইন ও বিচারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়েছিল প্রাচীন গ্রীসে। এথেন্সের ক্ষমতাবান শাসক ও সমরনায়ক এ্যালিবিয়াদিস (খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০-৪০৪)-এর বিচার হয়েছিল সিসিলির বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান পরিচালনাকালে যুদ্ধের আইন ভঙ্গের জন্য। এথেন্সের আদালতে তার অনুপস্থিতিতে বিচার হয় এবং তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। পরে সিসিলি জয় করে ফিরে আসার পর এথেন্সবাসী তাকে বীর হিসেবে বরণ করে এবং আদালত শাস্তি প্রত্যাহার করে নেয়।ইলিয়াড, ওডেসী, শাহনামা ইত্যাদি প্রাচীন এপিকগুলোতেও দেখা যায়, যুদ্ধকালীন বিভিন্ন অপরাধ সংগঠনের জন্য অনেক বীর সেনাপতির শাস্তি হতে।

মধ্যযুগ:
বিশ শতকের আগে যুদ্ধকালে সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুণ্ঠন প্রভৃতি অপরাধের জন্য বিচারের কয়েকটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা সম্পর্কে জানতে পেরেছি ইতিহাসের বিভিন্ন কালপর্বে। ঐতিহাসিক বাসিয়োনির মতে যুদ্ধাপরাধের জন্য প্রথম বিচারের তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে ইতালি থেকে। ১২৬৮ সালে নেপলস-এর কনরাডিন ভন হোহেনস্টেফানের বিচার হয়েছিল যুদ্ধের আইন ভঙ্গের জন্য এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছিল। এর এগারো বছর পর ১২৭৯ সালে ইংল্যান্ডে ‘ওয়েস্টমিনিস্টার আইন’ (স্ট্যাটিউট অব ওয়েস্টমিনিস্টার) পাস হয়, যেখানে আইন ভঙ্গের জন্য সেনাবাহিনীর বিচারের ক্ষমতা রাজাকে দেয়া হয়েছে। এই আইনের অধীনে ১৩০৫ সালে স্কটল্যান্ডের স্যার উইলিয়াম ওয়ালেসের (১২৭২-১৩০৫) বিচার হয়। তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধের। এ ছাড়াও ওয়ালেসের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল যুদ্ধের সময় বয়স ও নারীপুরুষ নির্বিশেষে গণহত্যার জন্য। ইংল্যান্ডের আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করলেও স্কটল্যান্ডে স্যার উইলিয়াম ওয়ালেস স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক ও জাতীয় বীর হিসেবে আজও সম্মানিত।

ইতালিতে হোহেনস্টেফান এবং ইংল্যান্ডে উইলিয়াম ওয়ালেসের বিচার হয়েছিল সেই সব দেশের রাজার আইনে, যা ছিল নির্দিষ্ট দেশের জন্য প্রযোজ্য। তবে যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক আদালত স্থাপনের প্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে অস্ট্রিয়া ১৪৭৪ সালে স্যার পিটার ভন হাগেনবাখের (১৪২০-১৪৭৪) বিচারের ক্ষেত্রে। বার্গান্ডির ডিউক চার্লস (যিনি ‘চার্লস দি টেরিবল’ নামে বেশি পরিচিত) ব্রেইসাখের শাসক নিযুক্ত করেছিলেন হাগেনবাখকে। অস্ট্রিয়া তখন রোমান সাম্রাজ্যের অধীন ছিল। ব্রেইসাখের শাসক হিসেবে হাগেনবাখ হত্যা ও নির্যাতনের বিভীষিকাময় রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। হাগেনবাখের দখল থেকে ব্রেইসাখকে মুক্ত করে অস্ট্রিয়া ও তার মিত্ররা। হাগেনবাখকে বিচারের নির্দেশ দেন রোম সম্রাট। এই বিচারের জন্য রোমান সাম্রাজ্যের ২৮টি দেশ থেকে বাছাই করা ২৮ জন বিচারকের সমন্বয়ে একটি বিশেষ আদালত গঠন করা হয়েছিল। এই আদালতে হাগেনবাখের বিচার হয়েছিল ঈশ্বর ও প্রকৃতির আইন লঙ্ঘনের জন্য। তার বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ, অবৈধ কর আদায়, সম্পত্তি দখল ইত্যাদি অভিযোগ আনা হয়েছিল। হাগেনবাখ অবশ্য আদালতে বলেছেন, তিনি সবই করেছেন তার নিয়োগদাতা বার্গান্ডির ডিউকের নির্দেশে। এই বিচারকার্য শুরুর এক বছর আগে ডিউক চার্লস মারা গিয়েছিলেন। আদালত হাগেনবাখের যুক্তি খারিজ করে তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করে। রায়ে তার নাইট উপাধি বাতিল করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ৯ মে ১৪৭৪ তারিখে শিরশ্ছেদের মাধ্যমে হাগেনবাখের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। হাগেনবাখের এই বিচারের মাধ্যমে যুদ্ধ-আইনে ‘অধিনায়কের দায়বদ্ধতা’র (কমান্ড রেসপনসিবিলিটি) ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে এ ধরনের বিচারের সূত্র হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। একই সঙ্গে এই বিচার ‘আন্তর্জাতিক আদালত’-এর ধারণাও প্রতিষ্ঠা করেছে।

বিশ শতকের আগে যুদ্ধাপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে একটি বহুল আলোচিত মামলা হচ্ছে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় ক্যাপ্টেন হেনরি রীযের বিচার। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় (১৮৬১-১৮৬৫) হেনরি একটি কারাগারের দায়িত্বে ছিলেন। এই গৃহযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ছিল ৩,৫৯,৫২৮। কারাগারে আটক যুদ্ধবন্দী মৃত্যুর সংখ্যা ২৪,৮৬৬। ক্যাপ্টেন হেনরির বিরুদ্ধে ১৩টি অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছিল, যার ভেতর হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও আঘাত অন্যতম। ক্যাপ্টেন হেনরির বিচার হয়েছিল সামরিক আদালতে, যার প্রধান বিচারক ছিলেন মেজর জেনারেল লিউ ওয়ালেস (‘বেনহুর’ উপন্যাসের রচয়িতা)। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটা ছিল প্রথম যুদ্ধাপরাধের বিচার। বিচারে ক্যাপ্টেন হেনরিকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।

আধুনিক যুগ:
যুদ্ধের ব্যাপক নিষ্ঠুরতা, হত্যা ও নির্যাতনের বিভীষিকা গত শতাব্দীতে আমরা প্রথম প্রত্যক্ষ করি প্রথম মহাযুদ্ধে (১৯১৪-১৯১৮)। চার বছরের এই মহাযুদ্ধ মানব জাতির বিবেককে প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত করেছিল। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য জার্মানিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই।

ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স যুদ্ধ চলাকালে পৃথকভাবে দাবি করেছে- যারা স্থলে ও সমুদ্রে যুদ্ধ ও মানবতার আইন লঙ্ঘন করে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে তাদের অবশ্যই বিচার করতে হবে। ১৯১৮ সালে ৫ অক্টোবর ফরাসী সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল- আন্তর্জাতিক আইন ও মানব সভ্যতার মূলনীতি অগ্রাহ্য করে যারা যুদ্ধ করেছে তারা শাস্তি থেকে অব্যাহতি পেতে পারে না। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী লুই বারথু ১৯১৭ সালের ৩ নবেম্বর বলেছেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি পেতেই হবে এবং এটা দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে।১৯১৮ সালের ১১ নবেম্বর যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইংল্যান্ডের লর্ড হাই চ্যান্সেলর ভাইকাউন্ট বিরকেনহেড দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করেন। এই কমিটির দায়িত্ব ছিল ১ম বিশ্বযুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের ঘটনা সম্পর্কে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা প্রণয়ন করা। এরপর ভার্সাইতে মিত্রশক্তির সঙ্গে জার্মানির বৈঠকে ঐতিহাসিক ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯১৯ সালের ২৮ জুন। এই চুক্তি সম্পর্কে জার্মানি পরে বলেছে তাদের এতে স্বাক্ষর প্রদানে বাধ্য করা হয়েছিল।ভার্সাই চুক্তির ৪৪০টি অনুচ্ছেদের ভেতর জার্মানির প্রতি শাস্তিমূলক বহু ধারা রয়েছে। এই চুক্তির সপ্তম পর্বে ২২৭, ২২৮ ও ২২৯ অনুচ্ছেদে জার্মানির সম্রাট দ্বিতীয় উইলিয়াম হোহেনযোলেনসহ তদন্তে অভিযুক্ত সকল জার্মান যুদ্ধাপরাধীকে সামরিক আদালতে বিচারের কথা বলা হয়েছে।ভার্সাই চুক্তি অনুযায়ী মিত্রশক্তি প্রথমে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ১৯ হাজার ব্যক্তির তালিকা তৈরি করেছিল। এই তালিকা বলা বাহুল্য জার্মানির কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। জার্মান প্রতিনিধিরা বলেছেন এত বেশি ব্যক্তির বিচারের যেমন সমস্যা রয়েছে- এই বিচার শুরু হলে জার্মানিতে গৃহযুদ্ধ বাধতে পারে। মিত্রশক্তি এই যুক্তি মেনে নিয়ে যাচাই বাছাই করে দ্বিতীয় পর্যায়ে ৮৯৫ জন এবং শেষে চূড়ান্তভাবে ৪৫ জন যুদ্ধাপরাধীর একটি তালিকা জার্মানিকে প্রদান করে।জার্মানির কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম যুদ্ধে পরাজয়ের পর নেদারল্যান্ডে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নেদারল্যান্ডস নিরপেক্ষ ছিল। এ ছাড়া কাইজার উইলিয়াম আত্মীয়তার সূত্রে নেদারল্যান্ডস ও ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। সেই সময় ইউরোপের অধিকাংশ রাজ পরিবার একটি অপরটির সঙ্গে আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ ছিল।মিত্রশক্তি আশা করেছিল কাইজারের বিচার সম্ভব না হলেও ৪৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার জার্মানি করবে। কিন্তু সমস্যা ছিল বিচারের আইন ও পদ্ধতির ক্ষেত্রে এবং জার্মান সরকারের সদিচ্ছার। জার্মানির আইন এবং ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও আমেরিকার আইন এক নয়। এ ছাড়া বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে জার্মান ভাষায়, মিত্রশক্তির সাক্ষীদের জন্য যা ছিল অস্বস্তিকর ও বিরক্তিকর। বিচারে জার্মান সরকারের আগ্রহ ও আন্তরিকতার অভাব লক্ষ্য করে কিছু ব্রিটিশ সাক্ষী শেষ পর্যন্ত লাইপযিগের আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।জার্মান সুপ্রিমকোর্ট শেষ পর্যন্ত মাত্র ২২ জন যুদ্ধবন্দীর বিচার করেছিল যাদের ভেতর সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল তিন বছর কারাদণ্ড যার এই শাস্তি হয়েছে তার অপরাধ ছিল সে মিত্রশক্তির একটি সমুদ্রগামী হাসপাতাল জাহাজ টর্পেডোর আঘাতে ডুবিয়ে দিয়েছিল- যে জাহাজে দুই শতাধিক আহত ও অসুস্থ সৈন্য এবং সাধারণ রোগী ছিল। ঠাণ্ডা মাথায় দুই শতাধিক নিরস্ত্র, আহত ও অসুস্থ মানুষকে হত্যার জন্য ওবেরলেফট্যানেন্ট সি প্যাটজিগকে মাত্র তিন বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে ‘লাইপজিগ ট্রায়াল’ ন্যায়বিচারের ইতিহাসে কলঙ্কজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও নুরেমবার্গ ট্রায়াল:
মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বেশী ধ্বংসাত্মক-যুদ্ধের নাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। হিটলারের জার্মানি ঝাঁপিয়ে পড়ে সারা পৃথিবী দখলের নেশায়।মুসোলোনীর ফ্যাসিস্ট ইতালি আর এশিয়াতে তোজোর জাপান যোগ দেয় হিটলারের সাথে।কয়েক কোটি মানুষ প্রাণ হারায় এই যুদ্ধে। রচিত হয় এক অবর্ণনীয় ধ্বংসলীলার।প্রায় ৫ বছরের বেশী স্থায়ী এই যুদ্ধে পুরো ইউরোপ পরিণত হয় ধংসস্তুপে।হিটলারের নাৎসি বাহিনী এবং তাদের সহযোগী গেস্টাপো ও অন্যান্য বাহিনী যেভাবে ইহুদি, কমিউনিস্ট ও অজার্মানদের হত্যা করেছে সভ্যতার ইতিহাসে তার কোনও নজির নেই। যুদ্ধের ইতিহাসবিদরা নাৎসিদের এই নৃশংসতাকে আখ্যায়িত করেছেন ‘হলোকস্ট’ বা ‘শোয়াহ্’ নামে। যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে আত্মহত্যা করেন হিটলার আর গোয়েবলেস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪২ সালের ১৮ ডিসেম্বর মিত্রশক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ঘোষণা প্রদান করে। ১৯৪৩ সালে ৩০ অক্টোবর ঐতিহাসিক ‘মস্কো ঘোষণা’ স্বাক্ষরিত হয়। এতে বলা হয়েছে, অক্ষশক্তির যে সব রাজনৈতিক নেতা ও সমর অধিনায়কদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ পাওয়া যাবে তাদের গ্রেফতার করে বিচার করা হবে। মস্কো ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৪৫ সালের ৪-১১ ফেব্রুয়ারি ইয়াল্টা কনফারেন্সে মিলিত হয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী চার্চিল এবং সোভিয়েত রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্টালিন। এই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয় বিজয়ের পর মিত্রশক্তি সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার করবে। শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে তিন দেশের পররাষ্ট্র সচিবরা সম্মিলিতভাবে একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করবে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে ইয়াল্টা সম্মেলনে চার্চিল বলেছিলেন, যুদ্ধজয়ের পর দেরি না করে পরাজিত সব নাৎসি নেতাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরে ফেলতে হবে। স্টালিন বলেছিলেন আমাদের দেশে আমরা কাউকে বিচার না করে শাস্তি দিই না। বিরক্ত চার্চিল বলেছিলেন, আমরা বিচার করেই তাদের ফাঁসিতে ঝোলাব।ইয়াল্টা সম্মেলনের পর মিত্রশক্তি যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা ও প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। তাদের সামনে ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা- প্রয়োজনীয় আইন এবং আন্তরিকতার অভাব ঘটলে কিভাবে যুদ্ধাপরাধীরা বিচার ও শাস্তি থেকে অব্যাহতি লাভ করে। ১৯৪৫ সালের ৮ আগস্ট মিত্রশক্তি ‘লন্ডন চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। এতে বলা হয়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে ‘ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল’-এ। ট্রাইব্যুনালের নীতি ও কার্যবিধি এই চুক্তির ভেতর অনুমোদন করা হয়। এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের পক্ষে স্বাক্ষর করেন জাস্টিস এইচ জ্যাকসন, ফ্রান্সের অস্থায়ী সরকারের পক্ষে রবার্ট ফ্যালকো, যুক্তরাজ্য ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের সরকারের পক্ষে জোউইট সি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকারের পক্ষে আই নিকিশেঙ্কো ও এ ট্রাইনিন।এই চুক্তি অনুযায়ী মিত্রশক্তির চারটি দেশ ট্রাইব্যুনালের জন্য নিজ নিজ দেশের আইনজীবী ও বিচারক নিয়োগ চূড়ান্ত করে। যুক্তরাষ্ট্র ‘আন্তর্জাতিক সামরিক আদালত’ (আইএমটি)-এর প্রধান প্রসিকিউটর হিসেবে সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি রবার্ট এইচ জ্যাকসনকে নিয়োগ করে।

নুরেমবার্গ ট্রায়াল:
নুরেমবার্গ ট্রায়ালের মতো বড় আয়োজনে বিশ্বের কোথাও আজ পর্যন্ত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির বাভারিয়া প্রদেশের নুরেমবার্গ শহরে ইতিহাসের নির্মম যুদ্ধাপরাধের বিচার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত মিত্রবাহিনী জার্মানির নাৎসি বাহিনীর নাটেরগুরুদের বিচার করে। নুরেমবার্গের ‘প্যালেস অব জাস্টিস’-এ স্থাপিত ওই আদালতের বিচারকার্য শুরু হয় ১৯৪৫ সালের ২০ নভেম্বর।

ট্রায়ালে যা ছিল
আইন শাস্ত্রের ইতিহাসে নুরেমবার্গ ট্রায়ালের মতো এত ব্যাপক আয়োজনে পৃথিবীর কোথাও গণহত্যার বিচার হয়নি। নুরেমবার্গ ট্রায়ালের রায়ে ১৭ হাজার পৃষ্ঠার ধারাবিবরণী ছাপা হয়েছিল। যা পরবর্তীকে ৪২ খণ্ডে প্রকাশিত হয়। জার্মানির নাৎসি বর্বরদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হয় ৬৫ পৃষ্ঠার। ১০ মাস ১০ দিন ধরে চলা এই আদালতে শুনানির অধিবেশন বসেছিল ৪শ' ৩টি। ১শ' ২৫ জন সাৰ্য দিয়েছে ২শ' ১৬ দিন ধরে। নুরেমবার্গ ট্রায়ালের রায়ে ধারাবিবরণী ছাপাতে লেগেছিল ১৭ হাজার পৃষ্ঠা, যা পরে ৪২ খণ্ডে প্রকাশ করা হয়। অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বাধীন নাৎসি বাহিনীর হোতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয় ৬৫ পৃষ্ঠার। ১০ মাস ১০ দিন ধরে চলা এই আদালতে শুনানির অধিবেশন বসে ৪০৩টি। সাক্ষী ছিল ১২৫ জন; সাক্ষ্য নেওয়া হয় ২১৬ দিন ধরে। ১৪৩টি লিখিত জবানবন্দি আদালতে জমা দেওয়া হয়। এ ছাড়া চার হাজার দালিলিক প্রমাণ এবং ৩৮ হাজার অ্যাফিডেভিট জমা দেওয়া হয় আদালতে। বিচারকার্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিকিউটর প্যানেলের সদস্যসংখ্যা ছিল ৬৪০। তাঁদের মধ্যে ১৫০ জন ছিলেন আইনজীবী। ওই সময় নুরেমবার্গ আদালতের সার্বিক নিরাপত্তায় কয়েক শ সেনাসদস্য মোতায়েন ছিলেন। সার্বক্ষণিক পাঁচটি ট্যাংক আদালতের আশপাশে টহল দেয়। রায় ঘোষণার দিন মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য। ‘প্যালেস অব জাস্টিস’-এ বিচারক, প্রসিকিউটর ও তাঁদের সহযোগীদের কাজের জন্য ছিল পাঁচ শতাধিক কক্ষ। এটি এখন নুরেমবার্গ ট্রায়াল আর্কাইভ হিসেবে সংরক্ষিত।

বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত হত্যাযজ্ঞ
যুদ্ধাপরাধ কিংবা গণহত্যার সঙ্গে জড়িতরা একসময় ভাবতেই পারত না, তাদেরও বিচার হবে কোনও দিন। আদালতে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিশ্বস্বীকৃত গণহত্যার বিষয়টিও অস্বীকার করে নাৎসি বাহিনীর হোতারা। জার্মানির ‘প্যালেস অব জাস্টিসে’ দাঁড়িয়ে হিটলারের নাৎসি বাহিনী মিত্রশক্তি গঠিত নুরেমবার্গ ট্রায়ালকেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল। কিন্তু তাদের চ্যালেঞ্জ আদালতে টেকেনি।

নাৎসি বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত হত্যাযজ্ঞ। নাৎসিরা ছোট-বড় ৭১টি ক্যাম্পে গণহত্যা ও নির্যাতন চালিয়েছিল। এক অশউইজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পেই খুন হয় ১০ লাখের বেশি মানুষ। এর নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফ্রানৎজ ফার্ডিনাল্ড অথচ আদালতে বিষয়টি প্রথমে তিনি অস্বীকার করেন।

নুরেমবার্গ ট্রায়ালে রায় ঘোষণার দিন প্রধান প্রসিকিউটর জাস্টিস জ্যাকশন নাৎসি বর্বরদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, 'নাৎসি পরিকল্পিত হত্যা নির্যাতন ও ষড়যন্ত্র কিছুই করেনি।' তাহলে কি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়নি। তখন জ্যাকসন শেকস্পিয়য়ের এক গল্প অবলম্বনে বলেন, 'খুনিরা আদালতে রানীকে বলছেন যে তাঁরা রাজাকে হত্যা করেননি। রানী খুনিদের বলছেন, তোমরা রাজাকে খুন না করলে তাঁকে জীবিত ফিরিয়ে দাও-রানীর এই বক্তব্যের পর খুনিরা নিশ্চুপ হয়ে যায়।' এই বক্তব্য তুলে ধরে জ্যাকসন বলেন, নাৎসিদের বক্তব্য সত্য বলে মানতে হলে স্বীকার করতে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বলে কিছুই হয়নি।

প্রসঙ্গত, নুরেমবার্গ ট্রায়ালে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও মিত্রশক্তির বাকি তিন দেশেরও আলাদা চিফ প্রসিকিউটর ও বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়। নুরেমবার্গ ট্রায়ালে প্রথম আদালতের রায় দিতে এই চার দেশের ৫৬ জন প্রসিকিউটর ছিলেন। প্রত্যেক প্রসিকিউটরের দুজন করে সহযোগী ছিলেন। প্রত্যেক সহযোগীর আলাদা আলাদা কক্ষ ও তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং সেসবের বিশ্লেষণের জন্য প্রয়োজনীয় আয়োজন ছিল। সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নুরেমবার্গ ট্রায়ালে নাৎসি বর্বরদের বিচার হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গণহত্যাকারী নাৎসিদের বিচার এখনো চলছে।

কার্যক্রম যেভাবে চলে
নুরেমবার্গ ট্রায়ালে আট মাস ধরে চলে তথ্য সংগ্রহ ও শুনানি এবং অপরাধীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের কাজ। এরপর অভিযোগ গঠন, অভিযুক্তদের বক্তব্য, তথ্য, স্থিরচিত্র, অভিযোগকারীদের বক্তব্যসহ সামগ্রিকভাবে সব বিষয় বিবেচনা করে রায় প্রস্তুত করা হয়। অভিযুক্তের তালিকায় ছিল নাৎসির শীর্ষ ২২ ব্যক্তি ও নাৎসি সরকারের গোপন পুলিশ বাহিনী গেস্টাপো ও শুৎজটাফে বা এসএসের (হিটলারের প্রধান আধা সামরিক বাহিনী) মতো আটটি সংস্থা। তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, যুদ্ধাপরাধ, শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। ১৯৪৬ সালের ১ অক্টোবর আদালত প্রথম রায় ঘোষণা করেন। এতে ১২ অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ড ও সাতজনকে কারাবাসের সাজা দেওয়া হয়।

নুরেমবার্গ ট্রায়ালে সর্বমোট ২৪ জন নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠিত হয়েছিল।বিচার করা হয়েছিল ২২ জনের (১ জন পলাতক সহ) তাদের বিরুদ্ধে সর্বমোট ৪ টি অভিযোগ আনয়ন করা হয়। অভিযোগগুলো হলো :
১/ চক্রান্ত
২/ আক্রমণাত্মক যুদ্ধ
৩/ যুদ্ধাপরাধ
৪/ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ

নীচে তাদের বিচারের রায় ক্রমানুসারে দেয়া হলো :
১/ হেরমান গোয়েরিং -- ফাঁসি
২/ রুডলফ হেসে -- যাবজ্জীবন
৩/ জোসিম ভন রিবেনট্রপ -- ফাঁসি
৪/ উইলহেম কেইটেল -- ফাঁসি
৫/ আর্নস্ট কালটেন ব্রুলার -- ফাঁসি
৬/ আলফ্রেড রোজেনবার্গ -- ফাঁসি
৭/ হ্যান্স ফ্রাংঙ্ক -- ফাঁসি
৮/ উইলবেলম ফ্রিক -- ফাঁসি
৯/ জুলিয়াস স্ট্রেচার -- ফাঁসি
১০/ ওয়াল্টার ফ্রাংঙ্ক -- যাবজ্জীবন
১১/ ইয়ালমার্ট স্যাচেট -- খালাস
১২/ কার্ল ডোয়েনিটজ -- ১০ বছর
১৩/ এরিক রেডার -- যাবজ্জীবন
১৪/ বলডর ভন সিরাক -- ২০ বছর
১৫/ ফ্রিনটস সকেল -- ফাঁসি
১৬/ আলফ্রেড জোড়া -- ফাঁসি
১৭/ ফ্রানজ ভন পেপেন -- খালাস
১৮/ আর্টুর হেস ইনকুয়ার্ট -- ফাঁসি
১৯/ আলবার্ট স্পির আরমাম -- ২০ বছর
২০/ কনস্টানটিন ভন নিউরাথ -- ১৫ বছর
২১/ হ্যানস ফ্রিটজ -- খালাস
২২/ মার্টিন ব্যোরম্যান -- ফাঁসি (পলাতক )

বিচারে এদের বেশীরভাগের অন্যতম ডিফেন্স ছিল যে তারা শুধুমাত্র আদেশ পালন করছিলেন। যত দোষ সব হিটলারের। কিন্তু আদালত গ্রহণ করেননি এই যুক্তি। চীফ প্রসিকিউটর জাস্টিস জ্যাকসন জার্মান আর্মির কোড থেকে পড়ে শোনান যে ,ন্যায়সঙ্গত আদেশ ব্যতীত অন্য যেকোনো আদেশ মানতে কেউ বাধ্য নন। ফলে টেকেনি সেই যুক্তি।

যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে প্রথম আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন মৈত্রী ও সামরিক চুক্তি অনুযায়ী বিশ্বের দুই পরাশক্তিসহ চার শক্তি (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর হাতে আক্রান্তদের পক্ষে মিত্র হিসেবে কাজ করে। এই চার শক্তি নুরেমবার্গ ট্রায়ালের জন্য একটি নীতি নির্ধারণ করে। যেখানে প্রথমবারের মতো গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ সংজ্ঞায়িত হয়।

নুরেমবার্গ ট্রায়ালে দুই পরাশক্তিসহ চার দেশেরই বিচারক এবং প্রসিকিউটর নিয়োগ দেয়া হয়। গ্রেট ব্রিটেনের ষাটোর্ধ বিচারপতি গাফারি লরেন্স আদালতের প্রধান বিচারক হিসাবে কাজ করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রেরিত জাস্টিস জ্যাকসন নুরেমবার্গ ট্রায়ালের চীফ প্রসিকিউটর হিসাবে কাজ করেন। এতে আমেরিকান এটর্নি বিদল, ফ্রান্সের বিচারক জার্মান ভাষায় পারদর্শী হেনরি ডোনিডিউই ডি ভাবরেস এবং ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী রবার্ট ফ্যালকোকে বিচারক হিসাবে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নিকিচেনকো প্রথমে প্রসিকিউটর এবং পরে বিচারক ও নিকিচেনকো বিচারক হওয়ার পর আলেকজান্ডার ভলকোভকে প্রসিকিউটর হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ উত্তর বিভিন্ন মৈত্রী ও সামরিক চুক্তি অনুযায়ী বিশ্বের দু'পরাশক্তিসহ চার শক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর হাতে আক্রান্তদের মিত্র হিসাবে কাজ করে। এই চার শক্তি আমেরিকা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স নুরেমবার্গ ট্রায়ালের জন্য একটি নীতি নির্ধারণ করে। যেখানে প্রথমবারের মতো গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ সংজ্ঞায়িত হয়। অথচ এরপূর্বে এই ধরনের অপরাধের কোন সংজ্ঞা-ধারণা ও স্বীকৃতিই ছিল না। এই ঘটনার পরই বিশ্ববিবেক ও মানবতা উচ্চকিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা দেয়। নুরেমবার্গ ট্রায়ালের পরই বিশ্বে প্রথম যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালত (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট) গঠন করা হয়।

এর আগে এ ধরনের অপরাধের কোনও সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা বা স্বীকৃতি কোনটিই ছিল না। এ ঘটনার জেরে বিশ্ববিবেক ও মানবতা উচ্চকিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘে সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ গৃহীত হয়। নুরেমবার্গ ট্রায়ালই পথ দেখায় বিশ্বে প্রথম যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট বা আইসিসি) গঠনের। এর পরই বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাপরাধ ও মানব হত্যার জন্য বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অনেক দেশে এরই মধ্যে বিচারকার্য শেষ হয়েছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখনো চলছে যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার।

ব্যক্তির বিচারের পাশাপাশি নুরেমবার্গে ৭টি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তদন্ত ও বিচার হয়েছিল। এগুলো হচ্ছে- ১) নাৎসি পার্টির নেতৃত্ব, ২) রাইখ সরকারের মন্ত্রীসভা, ৩) এসএস, ৪) গেস্টাপো ৫) এসডি, ৬) এসএ এবং ৭) জার্মান হাই কমান্ড। বিচারে ৪টি সংগঠন দোষী প্রমাণিত হয়েছে এবং রায়ে এদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য ৭টি নীতি বা ধারা প্রণয়ন করা হয়েছিল। ৬ নং ধারায় বলা হয়েছে আন্তর্জাতিক আইনে যে সব অপরাধ শাস্তিযোগ্য বলে নির্ধারণ করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে- ক) শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ, খ) যুদ্ধাপরাধ ও গ) মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এরপর এই তিনটি অপরাধের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এর আগে এত নির্দিষ্টভাবে এই সব অপরাধ আইনশাস্ত্রে বিধিবদ্ধ হয়নি।

গণহত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনাই মূল অপরাধ
নাৎসিরা ১৩টি ক্যাম্প থেকে গেস্টাপো বাহিনীর মতো সাতটি বাহিনী তৈরি করে গণহত্যা চালিয়েছে। অচউইজ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে লেফটেন্যান্ট কর্নেল রম্নডলফ এস এ্যান্ড ট্রান্স ফার্ডিনাল্ড ওয়েস কমপক্ষে সাড়ে তিন লাখ লোক হত্যা করে। যদিও আদালতে প্রথমে তারা গণহত্যার বিষয় অস্বীকার করে। শেষ পর্যায়ে তারা আড়াই লাখ লোক হত্যা করেছিল বলে স্বীকার করে।গণহত্যার কোনও চাক্ষুষ প্রমাণ নেই বলে আÍরক্ষার চেষ্টা করেছিল নাৎসি বাহিনী। কিন্তু আইনজীবীদের যুক্তিতর্কে উঠে আসে আÍরক্ষার চিন্তা, যা মানুষকে স্বাভাবিকভাবেই তাড়িত করবে। তাই কারো পক্ষেই গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়া সম্ভব নয়। তাই নুরেমবার্গ ট্রায়ালে গণহত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনাকেই মূল অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে চাক্ষুষ সাক্ষ্য-প্রমাণের চেয়ে সংবাদ, আলোকচিত্র, দালিলিক তথ্যচিত্র, ডকুমেন্টারি ও চলচ্চিত্রকে মুখ্য প্রমাণপত্র হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ কারণে হিটলারের মন্ত্রীসভার শীর্ষ মন্ত্রী, সামরিক বাহিনীপ্রধানসহ সরকার পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের কেউই রেহাই পাননি।হিটলারের নাৎসি বাহিনীর গণহত্যা সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ ছিল না। তাই বিশেষ আইনে এই গণহত্যার বিচার হলেও এখানে অপরাধীদের আÍপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছিল। তবে দণ্ডাদেশ পুনর্বিবেচনার জন্য আপিলের সুযোগ ছিল না।পৃথিবীর কোথাও যুদ্ধাপরাধী কিংবা গণহত্যার সঙ্গে জড়িতরা তাদের বিচার হবে ভাবতে পারে না। আদালতে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিশ্বস্বীকৃত গণহত্যার বিষয়টিও তারা অস্বীকার করে। জার্মানির 'প্যালেস অব জাস্টিসে' দাঁড়িয়ে হিটলারের নাৎসি বাহিনী মিত্র শক্তি গঠিত 'নুরেমবার্গ ট্রায়ালের' আদালতকেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল। কিন্তু তাদের চ্যালেঞ্জ আদালতে টেকেনি। নাৎসি বাহিনী একই সঙ্গে অস্বীকার করেছিল গণহত্যার বিষয়টিও। স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পর বাংলাদেশে যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে তখন তারা বিশেষ ট্রাইব্যুনালকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। কিন্তু ধোপে টিকেনি। একই সঙ্গে ঘাতকচক্র একাত্তরে নির্বিচারে অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, লুটপাট এবং গণহত্যার বিষয়টিও অস্বীকার করছে।

মূল্যায়ন:
নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের নীতি ও আইন প্রণয়নের সময় মিত্রশক্তির আইন প্রণয়নকারীদের এ বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হয়েছে। তারা নতুন কোন আইন তৈরি করতে যাচ্ছেন না যা আইনশাস্ত্রে ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়নি। নুরেমবার্গে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ ও ‘শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধে’র বৈশিষ্ট্যসমূহ প্রথমবারের মতো সূত্রবদ্ধ করা হলেও হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, বাধ্যতামূলক শ্রম, যৌনদাসত্ব, বলপূর্বক বাস্তুচ্যুতি প্রভৃতি বহু আগে থেকেই অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত। জাস্টিস জ্যাকসন লন্ডন বৈঠকের শুরুতেই মিত্রশক্তির সহযোগীদের বলেছিলেন, আমরা এমন সব কর্মকাণ্ডের বিচার করতে যাচ্ছি যা আদিকাল থেকে অপরাধ হিসেবে পরিগণিত এবং প্রতিটি সভ্য দেশে যার বিচার করা হয়।

নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের নীতি ও কার্যবিধি প্রণয়নের সময় মিত্রপক্ষের আইনজীবীরা সম্ভাব্য সকল চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। জাস্টিস জ্যাকসন তার উদ্বোধনী ও সমাপনী ভাষণে প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য সমালোচনা ও বিরুদ্ধ যুক্তি অত্যন্ত মেধা ও দক্ষতার সঙ্গে খণ্ডন করেছেন। একটি সমালোচনা নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল গঠনের সময় থেকে এখন পর্যন্ত করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে এটি ছিল ‘বিজয়ীর বিচার’।

নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের উদ্বোধনী ভাষণে জাস্টিস জ্যাকসন এ বিষয়ে বলেছেন, ‘দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, আদালত গঠন সহ আইনজীবী ও বিচারক সবই নিয়োগ করতে হয়েছে যুদ্ধে বিজয়ী মিত্রশক্তিকে পরাজিত অক্ষশক্তির অপরাধের বিচারের জন্য। অভিযুক্তদের বিশ্বব্যাপী আগ্রাসনের কারণে সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষ কেউ নেই বললেই চলে, যারা এই বিচারে আগ্রহী হতে পারে। এ ক্ষেত্রে হয় পরাজিতদের বিচার করতে হবে বিজয়ীদের, নয় তো পরাজিতদের অপরাধের বিচারের ভার তাদের হাতেই ছেড়ে দিতে হবে। দ্বিতীয়টির অকার্যকারিতা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অপরাধীদের বিচার কার্যক্রম থেকে।

অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছিল ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে অভিযুক্তদের আপিলের সুযোগ নেই, এমনকি বিচারকদের সম্পর্কে আপত্তি উত্থাপনেরও কোন সুযোগ কার্যবিধিতে রাখা হয়নি। এ বিষয়ে অক্সফোর্ডের অধ্যাপক এ এল গুডহার্ট লিখেছেন, ‘তত্ত্বগতভাবে এই যুক্তি আকর্ষণীয় মনে হতে পারে, তবে তা যে কোন দেশের বিচারব্যবস্থার পরিপন্থী। এই যুক্তি মানতে হলে কোন দেশ গুপ্তচরদের বিচার করতে পারবে না। কারণ যে দেশের আদালতে সেই গুপ্তচরের বিচার হবে সেখানকার বিচারক তার শত্রুদেশের। এ ক্ষেত্রে কেউ নিরপেক্ষতার কথা বলতে পারে না। বন্দি গুপ্তচর বিচারকদের কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করতে পারে কিন্তু কোন অবস্থায় তাদের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে না। (ক্রমশ.)

লর্ড রিট যেমন বলেছেন একই নীতি সাধারণ ফৌজদারি আইনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। একজন চোর নিশ্চয়ই অভিযোগ করতে পারে না তার বিচার কেন সৎ লোকেরা করছে।

নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে জাস্টিস জ্যাকসনের উদ্বোধনী ভাষণের মতোই আকর্ষণীয় ছিল তাঁর সমাপনী ভাষণ। ১৯৪৫-এর ২৬ জুলাই-এ প্রদত্ত এই ভাষণের উপসংহারে শেক্সপিয়ারের ‘রিচার্ড দি থার্ড’ নাটকের একটি উদ্ধৃতি দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ... অভিযুক্তরা বলছেন তারা হত্যা, হত্যার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রের এই দীর্ঘ তালিকায় বর্ণিত অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তারা এই বিচারের সামনে এমনভাবে নিজেদের দাঁড় করিয়েছেন যেভাবে রক্তরঞ্জিত গ্লচেস্টার দাঁড়িয়েছিলেন তার নিহত রাজার লাশের সামনে। এদের মতো গ্লচেস্টারও বিধবা রানীকে বলেছিলেন, আমি হত্যা করিনি। রানী জবাবে বলেছিলেন, ‘তাহলে বল তারা নিহত হয়নি, কিন্তু তারা মৃত।’ যদি এদের (অভিযুক্তদের) সম্পর্কে বলা হয় এরা নিরপরাধ, তাহলে তা এমনই সত্য হবে যুদ্ধ বলে কিছু হয়নি, কেউ নিহত হয়নি, কোন অপরাধের ঘটনাও ঘটেনি।’

অভিযুক্তরা আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় সকল অপরাধের দায় হিটলার, হিটলার ও গোয়েবলস-এর উপর চাপিয়েছিলেন, যারা জার্মানির আত্মসমর্পণের আগেই বার্লিনে ২৫ ফুট মাটির নিচে বাঙ্কারে সপরিবারে আত্মহত্যা করেছিলেন। এ বিষয়ে ব্রিটেনের প্রধান কৌঁসুলি স্যার হার্টলি শকরস তাঁর সমাপনী বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘কেউ হয়ত অন্যদের চেয়ে বেশি অপরাধ করতে পারে, হতে পারে কেউ অপরাধ সংঘটনে অন্যদের চেয়ে বেশি সক্রিয় ভূমিকায় ছিল । কিন্তু অপরাধ যদি গণহত্যা, দাসত্ব, বিশ্বযুদ্ধদুই কোটি মানুষের প্রাণহানির মতো গুরুতর হয়, যদি একটি মহাদেশ ধ্বংসের মতো এবং বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত দুঃখক্লেশ ও বেদনার কারণ হয় তখন কে কম অপরাধ করেছে আর কে বেশি করেছে তাতে এই ক্ষত মিটবে না। কেউ কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী, কেউ দায়ী কয়েক লক্ষের মৃত্যুর জন্য, এতে অপরাধের কোন তারতম্য ঘটছে না।’

নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের গঠন প্রক্রিয়া এবং এর মান সম্পর্কে অনেকে তখন অনেক কথা বলেছেন। নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের উকিলরা বলেছিলেন এই ট্রাইব্যুনালে তারা ন্যায় বিচার পাবেন না। তারপরও বিচার চলাকালে কয়েকজন শীর্ষ নাৎসি নেতা এই ট্রাইব্যুনালকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। নাৎসি নেতা হ্যান্স ফ্র্যাঙ্ক ছিলেন অধিকৃত পোল্যান্ডের গবর্নর জেনারেল। তিনি বলেছেন, ‘আমার বিবেচনায় এই বিচার হচ্ছে ঈশ্বরের ইচ্ছাধীন আদালতে, যেখানে এডলফ হিটলারের আমলের দুঃসহ যাতনার পর্যালোচনা ও সমাপ্তি ঘটবে।’ হিটলারের যুদ্ধসামগ্রী নির্মাণ মন্ত্রী এ্যালবার্ট স্পিয়ার বলেছেন, ‘এই বিচার জরুরী। এমনকি একটি একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও এসব ভয়াবহ অপরাধের সম্মিলিত দায় থাকে।’ অভিযুক্তদের একজন আইনজীবী ড. থিয়োডর ক্লেফিশ লিখেছেন, ‘এই ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া ও রায় সর্বোচ্চ পক্ষপাতহীনতা, বিশ্বস্ততা ও ন্যায়বোধ দাবি করে। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল এই সব দাবি মর্যাদার সঙ্গে পূরণ করেছে। এই বিশাল বিচারযজ্ঞের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সত্য ও ন্যায় অনুসন্ধান ও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যাতে কারও ভেতর কোন সন্দেহ না থাকে।

এনএমটি:
১৯৪৫-এর ৩০ আগস্ট পরাজিত জার্মানির রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য যখন মিত্রশক্তির কন্ট্রোল কাউন্সিল (এসিসি) গঠিত হয় তখনও বিচারের পদ্ধতি সম্পর্কে শরিকদের ভেতর মতপার্থক্য যথেষ্ট পরিমাণে ছিল। এসিসির নীতিমালায় বলা হয়েছে শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্মিলিতভাবে করা হলেও যারা পরে যার নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ধরা পড়বে সেই দেশ তাদের বিচার করবে। ‘ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনালে’ (আইএমটি) ২৪ জন শীর্ষ নাৎসি নেতার বিচার শেষ হওয়ার পর ‘আইএমটি’র বিলুপ্তি ঘটে। একই ভবনে আমেরিকা গঠন করে ‘নুরেমবার্গ মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল (এনএমটি)।

এই ট্রাইব্যুনালে নিম্নোক্ত ১২টি মামলা হয়েছিল
১। ডক্টরস ট্রায়াল (৯ ডিসেম্বর ১৯৪৬২০ আগস্ট ১৯৪৭) : বিচার হয়েছিল ২৪ জনের, ২। মিল্চ্ ট্রায়াল (২ জানুয়ারি১৬ এপ্রিল ১৯৪৭) : বিচার হয়েছিল ১ জনের, ৩। জাজেস ট্রায়াল (৫ মার্চ৪ ডিসেম্বর ১৯৪৭) : বিচার হয়েছিল ১৬ জনের, ৪। পল ট্রায়াল (৮ এপ্রিল ৩ নবেম্বর ১৯৪৭) : বিচার হয়েছিল ১৮ জনের, ৫। ফ্লিক ট্রায়াল (১৯ এপ্রিল ২২ ডিসেম্বর ১৯৪৭) : বিচার হয়েছিল ৬ জনের, ৬। আই জি ফারবেন ট্রায়াল (২৭ আগস্ট ১৯৪৭ ৩০ জুলাই ১৯৪৮) : বিচার হয়েছিল ২৪ জনের, ৭। হস্টেজেস ট্রায়াল (৮ জুলাই ১৯৪৭ ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮) : বিচার হয়েছিল ১২ জনের, ৮। রুশা বা রাশিয়া ট্রায়াল (২০ অক্টোবর ১৯৪৭ ১০ মার্চ ১৯৪৮) : বিচার হয়েছিল ১৫ জনের, ৯। আইনসাজ গ্রুপেন ট্রায়াল (২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ ১০ এপ্রিল ১৯৪৮) : বিচার হয়েছিল ২৭ জনের, ১০। ক্রুপ ট্রায়াল (৮ ডিসেম্বর ১৯৪৭ ৩১ জুলাই ১৯৪৮) : বিচার হয়েছিল ১২ জনের, ১১। মিনিস্ট্রিজ ট্রায়াল (৬ জানুয়ারি ১৯৪৮ ১৩ এপ্রিল ১৯৪৯) : বিচার হয়েছিল ২১ জনের, ১২। হাই কমান্ড ট্রায়াল (৩০ ডিসেম্বর ১৯৪৭ ২৮ অক্টোবর ১৯৪৮) : বিচার হয়েছিল ১৪ জনের।

উপরোক্ত ১২টি মামলাসহ আমেরিকান মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল ১৯৪৫ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ইউরোপ, জাপান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ৮০৯টি মামলা পরিচালনা করেছে যেখানে বিচার হয়েছে ১৬০০ জন আসামির। যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ৯৩৭ জনের বিচার করেছে ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স করেছে ২১০৭ জনের বিচার ।

নুরেমবার্গ ট্রায়ালের সমালোচনা:
নুরেমবার্গ ট্রায়ালও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়! সমালোচকের দৃষ্টিতে যে 'অপরাধের' জন্য দোষীদের সাজা দেয়া হয়েছে ঐ সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ওই 'অপরাধগুলো' আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ (ক্রাইম)- ই ছিল না। তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হারলান ফিস্কে স্টোন (Harlan Fiske Stone) নুরেমবার্গ ট্রায়ালকে বলেছিলেন 'ফ্রড' (Fraud) ট্রায়াল। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের সহযোগী বিচারপতি উইলিয়াম ডগলাস (William O. Douglas) নুরেমবার্গ ট্রায়াল সম্পর্কে সমালোচনা করে বলেছিলেন, "I thought at the time and still think that the Nuremberg trials were unprincipled. Law was created ex-post facto to suit the passion and clamor of the time.” দুর্বল বিচারপতি নিয়ে ট্রায়াল গঠনের প্রতিবাদে তো যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি চিফ কাউন্সেল আব্রাহাম পমেরান্তজ (Abraham Pomerantz) তার চাকরিই ছেড়ে দিলেন! প্রসঙ্গত: বলে রাখা ভালো যে আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, পোল্যান্ড এবং রাশিয়া থেকে বিচারপতিদের নিয়ে নুরেমবার্গ ট্রায়াল গঠন করা হয়েছিল।

নুরেমবার্গ ট্রায়াল এর বিচারকগণ কি 'নিরপেক্ষ' ছিল? উত্তর: 'না'। এ প্রসঙ্গে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং আইনজ্ঞ আর্থার লেহমান গুধার্ট (Arthur Lehman Goodhart) বলেছিলেন, “The judges were appointed by the victors, the Tribunal was not impartial and could not be regarded as a court in the true sense.”

বিবাদীদের আপিল করার সুযোগ ছিল না। তা ছাড়া বিচারক নিয়োগে তাদের আপত্তি করাও সম্ভব ছিল না। এসব ত্রুটি ও অসঙ্গতি থাকায় বিভিন্ন গ্রুপ ও ব্যক্তি এ ট্রাইব্যুনাল গঠনে বৈধতার প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ বলছেন, বিজয়ী শক্তি বিচারক নিয়োগ করায় এ ট্রাইব্যুনাল নিরপেক্ষ ছিল না এবং প্রকৃত বিবেচনায় তাকে আদালত হিসেবে গণ্য করা যায় না। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের নিরপেক্ষতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছিল তা একেবারে অমূলক ছিল না। ১৯৩৬-৩৮ সালে নুরেমবার্গ ট্রায়ালে নিয়োজিত প্রধান সোভিয়েত বিচারক নিকিৎচেনকো স্টালিনের শো ট্রায়ালে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ফলে নুরেমবার্গ ট্রায়ালের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়। আগে কৃত অপরাধের ভিত্তিতে বিবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। কোনও নির্দিষ্ট দেশের নিজস্ব আইনে এসব অভিযোগ আনা হয়নি। বিবাদী পক্ষের কোনও আইনজীবী ছিল না। আদালতে একচেটিয়া ছিল বিজয়ী মিত্রশক্তির প্রতিনিধিত্ব। আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠন সংক্রান্ত সনদের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল যে, এ আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণে টেকনিক্যাল রীতিনীতি মানতে বাধ্য নয়। এতে আরো বলা হয়, এ আদালত রায়দানে যত দূর সম্ভব নিজস্ব বিচারবুদ্ধি ও নন-টেকনিক্যাল পদ্ধতি অনুসরণ করবে এবং প্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করলে যে কারো সাক্ষ্য গ্রহণ করতে পারবে।

একই গ্রনে'র ২২৫ নম্বর পৃষ্ঠায় তিনি আরো লিখেছেন, 'All regime trials occur after a period of war, civil war, revolution or all three, immense collective passions are invariably unleashed by them. Very often the public bays for the defandants blood outside the courtroom (and occassionally inside it too). Accusations itself are very instrumentalized precisely in order to create social cohesion after a period of internal division. The act of accusation becomes more powerful and intoxicating the more public and collective it is. The intensity of the passions generated, combined precisely with the desire to use them to create a new political order on the ruins of the old one, has often meant that the charges brought are exaggarated or wrong. To be sure, many of the men in the dock whose trials are discussed in this book had acted venally, vainly, dishonestly, cruelty, evilly and often illegally. Nonetheless, they were often prosecuted for other things or on the basis of newly invented laws which they had not done.’
অর্থাৎ ‘যুদ্ধ, বিপ্লব অথবা গৃহযুদ্ধ অথবা এ তিনটি শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো বিচারের আয়োজন করে। যুদ্ধোত্তর সরকারগুলো অপ্রতিরোধ্য আবেগ ছড়িয়ে দেয়। জনতা আদালতের বাইরে (কখনো কখনো আদালতের ভেতর) অভিযুক্তদের রক্ত চায়। সামাজিক অসি'রতা সৃষ্টির জন্য পরিকল্পিতভাবে অভিযোগ ছড়িয়ে দেয়া হয়। অভিযোগগুলো হয় অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তাতে জনগণের মন বিষিয়ে ওঠে। পুরনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার ধ্বংসস্তূপের ওপর নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে তীব্র আবেগ ফেনিয়ে তোলা হয়। তার মানে হলো যেসব অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছিল সেগুলো ছিল হয়তো অতিরঞ্জিত, নয়তো ভুল। নিশ্চিতভাবে এ বইয়ে যেসব অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে তাদের অনেকেই অসাধু, অবৈধ, নিষ্ঠুর, অশুভ, নিষ্ফল কিংবা লালসাপূর্ণ কাজ করেছেন। কিন' নয়া আইনে তাদের বিচার করা হয়েছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে যা তারা করেননি।’

উইকিপিডিয়া :
দ্য ফ্রি এনসাইক্লোপিডিয়ায় বিজয়ীদের চাপিয়ে দেয়া বিচারের একটি সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, 'The `victor’s justice’ (in German Siegerjustiz) is a situation in which an entity partakes in carrying out `justice’ on its own basis of applying different rules to judge what is right or wrong for their own forces and for those of the ( former) enemy. Advocates generally charge that the difference in rules amounts to hypocrisy and leads to injustice. Targets may consider it derogatory.’ অর্থাৎ ‘বিজয়ীদের চাপিয়ে দেয়া বিচার হলো এমন একটি পলিসি'তি যেখানে একটি রাষ্ট্রসত্তা তাদের নিজেদের এবং (সাবেক) শক্র বাহিনীর জন্য ভুল অথবা শুদ্ধ রায়দানে যেকোনো আইন প্রয়োগ করে নিজেদের মতো করে বিচারকার্য পরিচালনা করেন। কৌঁসুলিরা সাধারণত এমন অভিযোগ উত্থাপন করেন যা প্রতারণার শামিল এবং এ প্রতারণা অবিচারের দিকে ধাবিত করে। অভিযুক্তরা এ বিচারকে ক্ষতিকর বলে বিবেচনা করতে পারেন।’ওপরে উল্লেখিত বক্তব্যগুলোর মর্মার্থ হচ্ছে যে, বিজয়ীরা তাদের নির্ধারিত শর্তে পরাজিতদের বিচার করছেন।

এ রকম আরও অনেক সমালোচনা হয়েছে নুরেমবার্গ ট্রায়ালকে ঘিরে। কিন্তু তারপরও নুরেমবার্গ ট্রায়ালই ইতিহাসের পাতায় টিকে আছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে। সমালোচকরা যাই বলুক অথবা আইনের সূক্ষ্ম মারপ্যাঁচ যাই থাকুক, এটা তো সত্য যে হিটলারের নাৎসি বাহিনী কি তাণ্ডব চালিয়েছে ইহুদিদের উপর। কিভাবে পদদলিত করেছে মানবতা। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশেও পদদলিত হয়েছে মানবতা। হয়েছে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ; মারাত্মক ভাবে ভঙ্গ করা হয়েছে 'জেনেভা কনভেনশন'। এ অপরাধের বিচার আজ হচ্ছে। আর একই ধারাবাহিকতায় বিচার কার্যও সমালোচিত হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার সমালোচিত হবে এটাই স্বাভাবিক। সমালোচনার কারণে যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধ থাকা সমীচীন নয়। কেননা ত্রুটি হীন ভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্ভব নয়; অতীতে কখনো সম্ভব হয়নি; ভবিষ্যতেও হবে না।

অন্যান্য দেশে নাৎসি যুদ্ধাপরাধের বিচার:
নুরেমবার্গের বাইরে ইউরোপে অন্য যে যুদ্ধাপরাধের বিচার করার আদালত হয়েছিল তার সব কয়টিতেই অভিযুক্তদের পক্ষে জার্মান, জাপান বা ইতালিয়ান আইনজীবী ও সাক্ষীর আধিক্য ছিল। এমন উল্লেখযোগ্য ট্রাইব্যুনালগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিচ্ছি-
১/ ডাকাও, ডোরা, মওথওসেন-গিউসেন ট্রায়ালসহ ১২টি আমেরিকান ট্রায়াল : নুরেমবার্গ ট্রায়ালের পরে আমেরিকা অধিকৃত এলাকায় মোট ১২টি ট্রায়ালে মোট ১হাজার ৬শত ৭২জন চিহ্নিত জার্মান যুদ্ধাপরাধীর বিচার করা হয়েছিল। সবার বিরুদ্ধেই সিভিলিয়ান বন্দী হত্যার অভিযোগ ছিল। এর মধ্যে ২৯৭জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল, ২৭৯জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়েছিল, ৮৪০ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়েছিল এবং ২৫৬জন বেকসুর খালাস পেয়েছিল।

২/ আউসউইৎস ট্রায়াল : ৪০জন অভিযুক্ত, ২১ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৮ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড, ৭ জনের ১৫ বছর মেয়াদে কারাদণ্ড, ১ জনের ১০ বছর কারাদণ্ড, ১ জনের ৫ বছরের কারাদণ্ড, ১জনের ৩ বছরের কারাদণ্ড এবং ১ জন বেকসুর খালাস।

৩/ বেলসেন ট্রায়াল : ৩২জন অভিযুক্ত, ১১ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনের ১৫ বছর মেয়াদে কারাদণ্ড, ৫ জনের ১০ বছর কারাদণ্ড, ১ জনের ৫ বছরের কারাদণ্ড, ১জনের ৩ বছরের কারাদণ্ড, ১ জনের ১ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ জন বেকসুর খালাস।

৪/ বেলজেক ট্রায়াল : এই বিচারে অভিযুক্ত ৮জন এসএস অফিসারের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই ৯০ হাজার থেকে ৩ লাখ বন্দীকে গ্যাস চেম্বারে হত্যার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশে তারা এই কাজ করেছেন, এমন জার্মান সাক্ষীদের প্রমাণ হিসেবে ডিফেন্স আদালতে পেশ করার কারণে মাত্র একজনের সাড়ে চার বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল, বাকী ৭জন বেকসুর খালাস পেয়েছিল।

৫/ শেলমো ট্রায়াল : পোল্যান্ডের শেলমো এক্সটার্মিনেশন ক্যাম্পে ১লাখ ৮০ হাজার বন্দিকে হত্যার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ১৩ জনের বিচার করা হয়েছিল। এখানেও ডিফেন্স যথেষ্ট পরিমাণে জার্মান সাক্ষী উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছিল এবং বিচার শেষে ২ জনের ১৫ বছর, ১ জনের ১৩ বছর, ১ জনের ৮ বছর, ১ জনের ৭ বছর, ১ জনের সাড়ে তিন বছর এক জনের সাড়ে ১৩ মাস কারাদণ্ড হয়েছিল এবং বাকি ৬জন বেকসুর খালাস পেয়েছিল।

৬/ ফ্রাংফুর্ট-আউসউইৎস ট্রায়াল : এই ট্রায়ালটা যুদ্ধাপরাধ বা মানবতা বিরোধী আইনে হয়নি, হয়েছিল জার্মান ফেডারেল আইনের অধীনে। এসএস এবং গেস্টাপোর ৭৮৯জন অপরাধীর মধ্যে বিচারে ৭৫০ জন বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিল এবং ৩৯জন বেকসুর খালাস পেয়েছিল।

৭/ ম্যাজডানেক ট্রায়াল : পোল্যান্ড ও জার্মানিতে বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধের বিচারে এই ট্রায়ালটি ছিল সর্বাধিক ৩০ বছর ধরে তিন ধাপে চলা ট্রাইব্যুনাল। পোল্যান্ডের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ১লক্ষ ৩০ হাজার বন্দীকে হত্যার দায়ে ১৭০জন নাজী যুদ্ধাপরাধীর বিচার করা হয়েছিল। ১৭জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল, ৩ জনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড, ১৬জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড এবং ১৩৪জন বেকসুর খালাস পেয়েছিল।

৮/ হামবার্গ-র‍্যা ভেন্সব্রুক ট্রায়াল : সাত ধাপে অনুষ্ঠিত বৃটিশ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই ট্রাইব্যুনালে মোট ৩৮জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার করা হয়। এর মধ্যে ২০জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১জনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড, ১৩জনকে ২ থেকে ২০বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয় এবং ৪জনকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়।

৯/ সৌবেবর ট্রায়াল : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের সাথে জড়িত যেসব নাজি এসএস এবং গেস্টাপো অফিসার ছদ্ম পরিচয়ে পালিয়ে গিয়ে বিভিন্ন ট্রায়াল এড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন তাদের ১২ জনের বিচার হয়েছিল সৌবেবর ট্রায়ালে। একজন বিচার চলাকালে আত্মহত্যা করেছিলেন, একজনের আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়েছিল, ৩ থেকে ৮ বছর মেয়াদে কারাদণ্ড হয়েছিল ৪ জনের, আর বেকসুর খালাস পেয়েছিল ৬জন।

১০/ ট্রেবলিংকা ট্রায়াল : যুদ্ধের পর পলাতক কিন্তু পরবর্তীতে ধৃত আরো ১২জন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের করা হয়েছিল এই ট্রাইব্যুনালে। বিচার চলাকালে একজনের মৃত্যু হয়। বাকীদের মধ্যে ৫ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়, ৩ থেকে ১২ বছরের কারাদণ্ড হয় ৫ জনের আর ১জন বেকসুর খালাস পায়।

টোকিও ট্রায়াল
‘ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ফার ইস্ট’-এর চার্টার অনুমোদিত হয় ১৯৪৫ সালের ১৯ জানুয়ারি। একই বছরের ৩ মে ট্রায়ালের বিচারকার্য শুরু হয় জাপানের টোকিওতে। যেসকল নীতিমালার ভিত্তিতে জার্মানির যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হয়েছিল ঐ একই নীতিমালার ভিত্তিতে জাপানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য টোকিও ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এ ট্রায়ালে ২৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল যাদের মধ্যে ২ জন মামলা চলাকালে মারা যায় এবং ১ জনকে মানসিক ভারসাম্য হারানোর ফলে ছেড়ে দেয়া হয়। ১৯৪৮ সালের নভেম্বরে ট্রাইব্যুনাল এর রায় ঘোষণা করেন। যারা যুদ্ধ সংঘটিত ও পরিচালিত করেছিলেন তাদের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয় এবং যারা যুদ্ধাপরাধ, মানবতা ও শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ করেছিলেন তাদের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

আইখম্যান মামলা
হিটলারের সময়কালে আইখম্যানের বিরুদ্ধে হাজার হাজার ইহুদিকে হত্যার অভিযোগ উঠে। যুদ্ধ শেষে তিনি জার্মানি থেকে আর্জেন্টিনায় গা ঢাকা দেন। ১৯৬০ সালে ইসরায়েলি গোয়েন্দা বাহিনী আর্জেন্টিনা সরকারের অজ্ঞাতে আইখম্যানকে অপহরণ করে ইসরায়েলে নিয়ে আসে। জেরুজালেমে তার বিচার কাজ শুরু হয় ১৯৬১ সালের ১১ এপ্রিলে। ইসরাইলের ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট অব জেরুজালেম আইখম্যানকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন।

যুগোস্লাভিয়া ট্রাইব্যুনাল
সাবেক যুগোস্লাভিয়া অঞ্চলে ১৯৯১ সাল থেকে সংঘটিত যুদ্ধকালীন অপরাধের বিচারের জন্য যুগোস্লাভিয়া ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ১৯৯৩ সালের ২৫ মে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ৮২৭নং প্রস্তাব অনুমোদনের মাধ্যমে এ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৩ সালের ১৭ নভেম্বরে ১১ সদস্য বিশিষ্ট সাবেক যুগোস্লাভিয়ার যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল নেদারল্যান্ডের হেগ শহরে গঠিত হয়। ১৯৯৪ সালের ৮ নভেম্বর থেকে যুগোস্লাভিয়া ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্য শুরু হয়। ১৬২ জন অভিযুক্তের মধ্যে ১০০ জনের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম শুরু করেন আদালত। এর মধ্যে ৪৮ জনকে সাজা প্রদান করা হয়, ১১ জনের মামলা স্থানীয় আদালতে প্রেরণ করা হয় এবং ৫ জনকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়। ২০১৪ সালের মধ্যে এই বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বিচার কাজ এখনো সমাপ্ত হয়নি।

রুয়ান্ডা ও কম্বোডিয়ার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার
রুয়ান্ডাতে হুতুদের সঙ্গে তুতসিদের জাতিগত বিরোধে ১ লক্ষ হুতুকে হত্যা করা হয়, সেটা ১৯৮০ এর দশকের শেষদিকে। রুয়ান্ডা ও আশপাশের রাষ্ট্রে জেনেভা কনভেনশন ও অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি প্রদান করার জন্য ১৯৯৪ সালের ৮ নভেম্বর নিরাপত্তা পরিষদ একটি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয় ১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে। ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনাল ৯২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন।দু’জন মৃত্যু বরণ করায় এবং তিনজন পালিয়ে যাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে সাজা কার্যকর করা যায়নি। তবে ১০ জন এরই মধ্যে সাজা ভোগ করে ছাড়া পেয়েছে, ১৭ জন তাদের সাজার বিরুদ্ধে আপিল করেছে। চারজনের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করা হয়েছে। ১০ জন অপরাধীর বিচার প্রক্রিয়া জাতীয় আদালতে স্থানান্তর করা হয়েছে। সম্প্রতি আরও ৩২ জনের বিচার প্রক্রিয়া চলছে। এই ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া ২০০৮ সালের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে কয়েক দফায় সময় বাড়ানো হয়।

সিয়েরালিওনে যুদ্ধাপরাধের বিচার
সিয়েরালিওনের যৌথ উদ্যোগে জাতিসংঘের সহায়তায় ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় স্পেশাল কোর্ট ফর সিয়েরালিওন। এই বিশেষ আদালত বিচার কার্যক্রম শুরু করে ২০০৪ সালের জুনে। ২০১২ সাল পর্যন্ত মোট ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হলেও ২০০৩ সালের ১০ মার্চ ৭ জনের বিচার কাজ শুরু হয়। এই সাত জনের মধ্যে দু’জন মারা যাওয়ায় তাদের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। বাকি পাঁচজনের মধ্যে অ্যালেক্স বিমাকে ৫০ বছরের কারাদণ্ড, মরিস কেলনকে ৪০ বছরের কারাদণ্ড, ব্রিমা কামানাকে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড, ইসা সেসাকে ৫২ বছরের কারাদণ্ড, অগাস্টিন গিবাওকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। লাইবেরিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপতি চার্লস টেলরের বিচারকার্য শুরু হয় ২০০৬ সালের ২৯ মার্চ। ২০১২ সালের ৩০ মে বিশেষ আদালত টেলরকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ৫০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। চার্লস টেলর এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। বর্তমানে আপিলের শুনানি চলছে।

রোম-বিধি ও আন্তর্জাতিক আদালত
স্থায়ী কার্যকর আন্তর্জাতিক আদালত গঠনের উদ্দেশ্যে ১৯৯৮ সালের জুলাই মাসে ‘রোম বিধি’ গৃহীত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি, ব্যক্তিবর্গের বিচার আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বিচারের মুখোমুখি করা। প্রয়োজনীয় ৬০ রাষ্ট্রের অনুমোদনের পর ২০০২ সালের ১ জুলাই রোমবিধি কার্যকর হলে এর মধ্য দিয়ে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত’ যাত্রা শুরু করে। এখন পর্যন্ত এ আদালত উগান্ডা, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও সুদানের দারফুর ঘটনার বিচার হাতে নেন। এখনও এসব দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম চলছে।

বাংলাদেশে চলছে ৭১এর মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সংগঠিত খুন,ধর্ষণ,লুটতরাজ,অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি অপরাধের সাথে জড়িত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজ।ইতিমধ্যেই রায় ও সাজা কার্যকরী হয়েছে বেশ কয়েকটি মামলায়।এর আগের ট্রায়ালগুলোর তুলনায় বলতে গেলে অনেকটা বেশী সুযোগ সুবিধাই পাচ্ছে আসামীপক্ষ। কেননা অপরাপর ট্রায়ালগুলোতে যেখানে আপীলের সুযোগ পর্যন্ত ছিলোনা,সেখানে এখানে আপীল,রিভিউ এমনকি সবশেষে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা চাওয়ার বিধান পর্যন্ত সংযোজিত হয়েছে।সেই কারণে প্রত্যাশা করা যায় একদিন নুরেমবার্গ ট্রায়ালের মত বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নিমিত্তে তৈরি করা ট্রাইব্যুনালও আইনের ইতিহাসে এক মূল্যবান সংযোজন বলেই বিবেচিত হবে।

 

তথ্যসুত্র:
১।http://www.arthosuchak.com/archives/4512/%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%A7%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87/

২।http://shkhan402.blogspot.com/2012/01/blog-post.html
৩।http://www.arthosuchak.com/archives/4512/%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%A7%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87/
৪। http://www.priyo.com/blog/2014/11/12/118179.html
৫।http://www.polashi.com/?p=169
৬।https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%A8%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%AE%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%97_%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%B0
৭।https://www.amarblog.com/MH-RONY/posts/177626
৮।http://www.liberationwarbangladesh.org/2015/07/blog-post_34.html
৯।http://www.kalerkantho.com/home/printnews/294269
১০। http://oldsite.dailyjanakantha.com/news_view.php?nc=15&dd=2011-01-07&ni=44835

রাজেশ পাল, আইনজীবী, ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কর্মী

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫০ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৮ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৪ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬১ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০২ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১১০ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৬ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ