আজ সোমবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৯ ইং

ডাক্তাররা পরিশ্রমের স্বীকৃতি কেন পাবে না?

শেখ মো. নাজমুল হাসান  

আমার এ লেখাটি কারও কারও চোখে উল্টোরথের বলে মনে হতে পারে। সে সব ভিন্নমতকে অগ্রিম শ্রদ্ধা জানিয়ে আমার যৌক্তিক-মতপ্রকাশ করছি। আমি বিশ্বাস করি, যৌক্তিকতার তুলাদণ্ডে যাচাই করে সহমতের পেশাদারগণ বিষয়টিতে উচ্চকিত হবেন।

এ লেখাটিতে কেউ কষ্ট পেলে সে জন্য আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কোন বিশেষ পেশার প্রতি বিদ্বেষভাজন হয়ে নয়, ব্যাখ্যার প্রয়োজনেই কিছু কিছু বিষয়ের অবতারণা অবশ্যম্ভাবী বলেই তার অবতারণা করতে হয়েছে। লেখাটিকে কেউ ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে না নিয়ে পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিবেচনা করলে সার্বিকভাবে তা পেশার জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস।

লেখাটির কোনও কোনও যায়গায় ব্যক্তিগত উদাহরণগুলি হয়ত মুখ্য হয়ে গেছে, সেটি নিজেকে প্রকাশের জন্য নয় বরং এই পেশার একজন প্রতিনিধি হিসেবে সেগুলি যে এই পেশার সাথে অন্যান্য যারা আছেন তাদের সকলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য সেটি প্রকাশের জন্য।

আমার যদি ভুল না হয়, তবে আমার দেখামতে এ দেশে পেশাসংক্রান্ত যতো ধরনের যুক্তিহীন বাহাস হয় তার সিংহভাগই হয় ডাক্তারি পেশা নিয়ে। নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে এমন কোন মানুষ নেই যিনি এ ব্যাপারে তার জ্ঞানের বহর উগরে দিতে পিছিয়ে থাকেন না। প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ অবস্থানে এমনভাবে একাট্টা থাকেন যেন তিনিই দেশের সেরা জ্ঞানী, আর ডাক্তাররা সবাই এই দেশের সবচেয়ে কমবোঝা অবুঝ শ্রেণিভুক্ত না-বুঝ প্রাণি।

এসব বাহাসের যৎসামান্য যৌক্তিক অংশটুকু স্বীকার করে নিয়েই বলছি- এর পেছনে যে কারণগুলি প্রকট এবং প্রচ্ছন্ন থাকে তা যারা বলেন তাদের হীনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট, সার্বজনীন নয়। নীতিনির্ধারকরা সস্তা জনপ্রিয়তা তৈরি করে ভোট পাবার মানস থেকে বাহাস ছড়ান। অন্যান্য পেশাদার যারা নীতি নির্ধারণ করেন বা নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখেন তারা নিজেদের অযোগ্যতাকে ঢেকে নিয়ন্ত্রণের মূল চালিকায় থাকার জন্য কাজগুলি করেন। এ দুষ্ট চালটিকে আমরা ঠিকমত বুঝে পেশার উৎকর্ষতা সাধনে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নিতে পারছি কিনা সেটি বিবেচনায় রাখার দরকার।

ফাও খাওয়ার স্বভাব হচ্ছে এদেশের আপামর জনসাধারণের সহজাত প্রবৃত্তি। সে প্রবৃত্তির কারণে সবাই ডাক্তারদের কাছ থেকে ফাও সেবা পাবার জন্য মুখিয়ে থাকেন। নীতিনির্ধারকরা যখন এই ফাও খাওয়ার আগুনে বাতাস দেন তখন তা শিবের শ্মশানের মতো জ্বলে ওঠে এবং নিরন্তর জ্বলতে থাকে। এ আগুনের লেলিহান পরশে সাধারণ মানুষগুলো একেকজন স্বাস্থ্য-বিপ্লবী বনে যান এবং দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে সিধে করার জন্য কাজের কাজ কী করতে হবে সে সম্পর্কে শূন্য জ্ঞান নিয়েও জ্ঞানগর্ভ মতামতের বিষবাষ্প ছড়ান, যার মধ্যে ডাক্তারদের বদনাম ছাড়া আর কোন সারবস্তু নাই। এ দেশের জ্ঞানী হতে অবশ্য আর কিছু লাগেও না।

স্বাস্থ্যসেবা কখনোই বিনামূল্যে হয় না, এ জন্য সেবার বিনিময়-মূল্য পরিশোধ করতেই হয়- এই স্বাভাবিক সেন্স যে মানুষগুলির নাই, তারা হচ্ছে ডাক্তারদের সবচেয়ে বড় সমালোচক ও বোদ্ধা। স্বার্থ উদ্ধারে ষোলআনা সিদ্ধহস্ত লোকগুলি ডাক্তারদের কাছে ফাও সেবা চায়। সুতরাং এ সমালোচনার মূল উদ্দেশ্য ফাও খাওয়া। আরেকটা বড় উদ্দেশ্য হচ্ছে লোকজনের জাতে উঠা। লোভী ও অযোগ্য মানুষগুলির অধিকাংশেরই সুবোধ কোন যোগ্যতা নাই যা দিয়ে জাতে উঠা যায়, ফলে ডাক্তারদের সমালোচনা করে জাতে ওঠার প্রবণতা ভীষণভাবে লক্ষণীয়। ডাক্তারদের সমালোচনা করলে হালে বেশ ভালই পানি পাওয়া যায় এবং নিজেকে জ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে জ্ঞানী-ভাব নিতে সুবিধে হয়। অকৃতজ্ঞ স্বভাবের এ মানুষগুলি যে থালে খায় সেই থালে হাগে। উপকার নেবার পরে তা তো স্বীকার করেই না, উল্টো চোখ উল্টিয়ে দেয় এবং ডাক্তারদের সমালোচনায় মিথ্যের বেসাতি তুলে সমালোচনা-সভাকে গরম করে ফেলে। অসুর বনে যায় দেবতা।

এই যে ডাক্তার সমাজের নামে এমন নেতিবাচক ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে সেটির জন্য যদি ডাক্তার সমাজ নিজেরা শুধু আফসোসই করে যায় এবং পাবলিকের বিরুদ্ধে সচকিত থাকে তাতে মূল কাজের কাজ কিছুই হবে না। এ জন্য দরকার পেশার মহত্বের পেশাদার ভিত্তি দৃঢ়ভাবে স্থাপন করা। আমার মনে হয় না ডাক্তার সমাজ সেটা করতে পেরেছে। বরং চ্যালেঞ্জ দেখলে ডাক্তার নেতারা পিছু হটে এবং পেশার ন্যায্যতাকে পায়ে দলে অন্যদের চাওয়াকে প্রতিষ্ঠিত করতেই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। একজন ডাক্তারি পেশার নেতা যখন একজন আমলা বা নেতার সাথে ছবি তুলে সেটি প্রচার করে নিজেকে জাতের একজন বলে প্রচার করতে চায় তখন তাদের হেডম বুঝতে আর বাকী থাকে না। নেতারা যতটা না পেশার প্রতি অনুগত তার চেয়ে ঢের বেশি অনুগত দলের প্রতি। ফলে উচ্চবাচ্যই সার, অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে ঠনঠনা। তাছাড়া সততার প্রশ্নটিও প্রশ্নবিদ্ধ।

ডাক্তারি পেশায় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য পেশাদার ডিগ্রি এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দু ধরনের ব্যবস্থাই প্রচলিত আছে। ডাক্তাররা তাদের পেশাদার পরিচয়কে সুনির্দিষ্ট করার জন্য এ প্রশিক্ষণ বা ডিগ্রিগুলিকে সংক্ষিপ্ত আকারে লিখে তাদের সাইনবোর্ডে বা কার্ডে ব্যবহার করে থাকেন। বেশ কিছুদিন যাবত বেশ গরম গরম খবর শুনছি যে, বিএমডিসির স্বীকৃত ডিগ্রি ছাড়া অন্য কোনকিছু ডাক্তাররা তাদের পেশাদার পরিচয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবে না। এখানে আমি আমার মূল বক্তব্য তুলে ধরতে চাই।

প্রথম কথা হচ্ছে, বিএমডিসি এবং অন্যান্য যে রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানগুলি আছে তাদের কাজ কী? আমি এটা নিয়ে একটা গবেষণার সাথে জড়িত ছিলাম, সেখানে দেখেছি যে, এদের অধিকাংশই জানে না তাদের কী কাজ! কয়েকজন কর্মচারী আছে যারা সার্টিফিকেট আনতে গেলে টাকা নেয় এবং তা না দিলে ন্যায্য সার্টিফিকেটটাও দেয় না, গড়িমসি করে। সার্টিফিকেট নবায়নের ক্ষেত্রেও তাই। এখানের কোন কর্মকর্তা ডাক্তারি পেশার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করছে এমন উদাহরণ পেতে হলে গবেষণা করে তা বের করতে হবে। জো হুকুম জাঁহাপনা বলে নিজের চেয়ারটা টিকিয়ে রাখা ছাড়া এদের কাজের আর কোন শক্ত ভিত নেই। মানহীন বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলি বন্ধ করে দেবার হুমকি দিয়ে সেখান থেকে আয়-রোজগার করাও সংশ্লিষ্ট রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানগুলির একটা প্রধান দায়িত্ব। যে মান নিয়ে অধিকাংশ মেডিকেল কলেজ চলছে তা দেখলে এটি বুঝতে কোন অসুবিধা হবার কথা নয়।

কেন ডাক্তাররা কষ্ট করে অর্জন করা তাদের প্রশিক্ষণকে নামের পাশে উল্লেখ করে তা ব্যবহার করতে পারবেন না? এ বিষয়টি কেন সিদ্ধান্ত আকারে গ্রহণ করা হয়েছে সেটির কারণ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

কোন নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণার ভিত্তিতে জানতে পারলাম এ দেশে হাতুড়ের সংখ্যা ছয় লক্ষের মতো। এসব হাতুড়েরা নামের পূর্বে ডাক্তার লেখেন এবং ডাক্তার বলে সমাজে পরিচয়ও দেন। সঙ্গত কারণেই সমাজেও তারা ডাক্তার বলেই পরিচিত। এসব হাতুড়েরা তাদের নামের পাশে ডিগ্রি হিসেবে নানা ধরনের এ্যাবরিভিয়েশন ব্যবহার করেন যা মূলত অন্তঃসারশূন্য এবং ফালতু। এতেকরে মানুষ বিভ্রান্ত হয় এবং তাদের কাছে গিয়ে প্রতারিত হয়। এর থেকে মানুষকে পরিত্রাণের জন্য এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর জন্য ডাক্তাররা দায়ী নন, যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। বন্ধ করতে হবে ওসব ফালতু চর্চা।

ডাক্তার না, একথা জেনেও যে মানুষটি চিকিৎসার জন্য হাতুড়ের কাছে যায়, সে নিজে তো আগে থেকেই বিভ্রান্ত! নতুন করে তার বিভ্রান্তি কাটানোর জন্য আইন করে পাশ করা ডাক্তারদের লেজ কাটার দরকার কী? হাতুড়েরা কেন ডাক্তারি করবে? পাস করা ডাক্তার ছাড়া ডাক্তারি করা যায়, এটা কোথাকার নিয়ম? বিভ্রান্তি তো আরও গোঁড়ায়। সারা রাষ্ট্র ব্যবস্থা, তার রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানগুলি কী বসে বসে ঘোড়ার ঘাস কাটে? ডাক্তার সমাজের ভারী ভারী নেতারা কী বসে বসে আঙ্গুল চোষে? এখন পাস করা ডাক্তার ছাড়া অন্যদের নামের পূর্বে ডাক্তার লেখার উপরে সার্কুলার আসছে বলে পত্রিকার খবরে দেখলাম। কিন্তু এটাই কী যথেষ্ট? ডাক্তার লিখতে পারবে না কিন্তু ডাক্তারি করতে পারবে, বিষয়টি তেমন হয়ে গেল না? একটা শুভঙ্করের ফাঁকি তো রয়েই গেল। স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা ডাক্তার ছাড়া অন্য কেউ ডাক্তারি করতেই পারবে না, এটা সারা পৃথিবীর জন্য প্রযোজ্য, বাংলাদেশে কেন নয়? নাকি বাংলাদেশের মানুষগুলি মানুষ নয় বলে এমন নিয়ম করার দরকার নাই?

দেশে আড়াই লক্ষ ঔষধের দোকানদারদের সবাই ডাক্তার! তারা চিকিৎসা দিচ্ছে। পাস করা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া হাতে কাটা ঔষধ বিক্রি করছে। পাস করা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের পুরো ঔষধ বিক্রি না করে আংশিক ঔষধ বিক্রি করছে।

প্রেসক্রিপশনের ঔষধ পরিবর্তন করে অন্য ঔষধ দিচ্ছে? কেন? এটা কিভাবে সম্ভব? এ কোন নিয়ম? দুনিয়ার কোথাও আছে এ নিয়ম? আর থাকলেও তা কেন আমাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে? কোন ঘাস কাটছেন রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানগুলি? মন্ত্রী বাজখাঁই আওয়াজ তোলেন, ডাক্তারদেরকে টাইট দেন- স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মাথা হিসেবে এই ব্যবস্থাটির শুদ্ধতার জন্য তিনি কী ন্যায্য হুমকি দিয়ে বলতে পারবেন, পাস করা ডাক্তার ছাড়া অন্য যারা ডাক্তারি করছে সেটা এই মুহূর্ত থেকে বন্ধ করা হল। যদি কেউ করে তবে তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা হবে। করবেন না, কারণ ওখানে ভোট আছে।

ডাক্তারদের উপরে যারা খড়গ তুলছেন তারা কী এই কাজটি করা ছাড়া দেশে আর কোন দুরাচার দেখতে পান না? তারা সবাই কী কুম্ভকর্ণ সেজে বসে আছেন? কী করছেন আমাদের ডাক্তারি পেশার নেতাগণ? কেন এগুলি বন্ধ করার ব্যাপারে রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে পারছেন না? উল্টো পাশ করা ডাক্তারদের উপরে এর প্রচ্ছন্ন ও অ-প্রচ্ছন্ন দায় চাপানোর ব্যাপারে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছেন। কাপুরুষ স্বামীরা যেমন সারা যায়গায় ব্যর্থ হয়ে ঘরে এসে স্ত্রীর উপরে ঝাল ঝাড়ে, আমাদের ডাক্তারি পেশার নেতাসহ নীতিনির্ধারকরা তেমনি কোথাও কিছু না পেরে পাশ করা ডাক্তারদের উপরে ছড়ি ঘুরিয়ে ডন কুইক্সোটের বাহাদুর সেজে বসে আছেন। দু নম্বরি আয়-রোজগারের ধান্দাবাজি ছাড়া কাজের কাজ কিছুই তো হয় না। কেউ ম্যাজিস্ট্রেট না হয়ে ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয় দিলে সেটা কী দোষের নয়? তাহলে এখানে কেন কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?

আমি এমবিবিএস পাস করার পর এক বছর চর্ম ও যৌন রোগের উপরে রেসিডেন্সিয়াল ট্রেনিং করেছি। আউটডোর, ইনডোর সবখানেই ডিউটি করেছি। এ সময়ে মাত্র আড়াই হাজার টাকা বেতনে একটা ক্লিনিকে কাজ করতাম। ট্রেনিং করার জন্য ক্লিনিকের ডিউটির সাথে অনেক কম্প্রোমাইজ করতে হয়েছে। আমার বাচ্চাটা তখন খুব ছোট। তাদেরকে ঢাকা পাঠিয়ে দিয়ে আমি বরিশালে রয়ে গেলাম শুধু ট্রেনিং শেষ করার জন্য। নিজের মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়া এই ট্রেনিংয়ের সুযোগ পাওয়া যে কত কঠিন তা সংশ্লিষ্ট সকলেই জানেন। এই সামান্য আয়ে চলা যে কত কঠিন তা বুঝতে বোকারও খুব একটা বুদ্ধি খরচার দরকার নাই।

এরপরে এক বছরের রেসিডেন্সিয়াল ট্রেনিং শুরু করলাম ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিতে। কলেজ প্যাথ ও হসপিটাল প্যাথ সবখানেই দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। এই ট্রেনিং চলাকালীন আমি কেয়ার বাংলাদেশে চাকুরী পাই। আমার পোস্টিং ছিল মাদারীপুরে। স্যারের সাথে কথা বলে কাজ শেখার জন্য বিকেলে অফিস শেষ করে বরিশালে স্যারের ল্যাবে চলে যেতাম। শনিবারে সারাদিন কলেজ প্যাথ ও হসপিটাল প্যাথ এ কাজ করতাম। সাপ্তাহিক ছুটিতে বাচ্চাটাকে দেখতেও ঢাকায় আসতে পারিনি। তখন মোবাইলের যুগ ছিল না, চিঠিপত্র লিখে পরিবারের যতটুকু খোঁজ-খবর নেওয়া গেছে সেটুকুর উপরেই ভরসা করে থাকতে হয়েছে। মাদারীপুর থেকে বরিশালে গিয়ে ট্রেনিং করে কাজ শেখার বিষয়টি সহজ ছিল না। আমাকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। এমন ত্যাগ স্বীকার করছেন প্রশিক্ষণে থাকা ডাক্তার সমাজের প্রতিটি সদস্য। পেটে ভাত নাই, থাকার যায়গা নাই, এমন অবস্থা প্রশিক্ষণে থাকা প্রায় সবারই।

ঢাকায় এসে প্রথমে এমপিএইচ করি। এরপরে অস্ট্রেলিয়াতে গিয়ে ফ্লিন্ডারস ইউনিভার্সটির পাবলিক পলিসি এন্ড ম্যানেজমেন্ট এর থেকে একটা স্কলারশিপ পাই। সেটা দিয়ে পাবলিক হেলথকে মেজর নিয়ে এনজিও ম্যানেজমেন্টের উপরে ছয় মাসের একটা পোস্ট গ্রাজুয়েশন ডিপ্লোমা করি। আমি এতে ডিস্টিংশন পাই। যদিও ছয় মাসের কোর্স শেষ করার পরে আমি তিন মাসের একটা সার্টিফিকেট পাই। সেটার কারণ অবশ্য ভিন্ন। আমি অস্ট্রেলিয়াতে যাবার পর, আমার নন-ওয়ার্কিং ভিসার স্ট্যাটাস পরিবর্তন করে ওয়ার্কিং ভিসা করি। আমার জানা ছিল না যে, ফুলটাইম ওয়ার্কিং ভিসা স্ট্যাটাস থাকলে ইউনিভার্সিটি তিন মাসের বেশি মেয়াদের সার্টিফিকেট দিতে পারে না। দেশের চাকুরী ছেড়ে দিয়ে আমি পড়তে যাই এবং দু বছর পরে বেকার অবস্থায় ফিরে আসি।

দেশে ফিরে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সাইন্সে ভর্তি হই এবং ডিপ্লোমা নেই। এখানেও আমার ডিস্টিংশন ছিল। এটার পরে আইটিএন বুয়েটে আর্সেনিক মিটিগেশনের উপরে একটা সার্টিফিকেট কোর্স করি। চাকুরী, সংসার সব ম্যানেজ করে এ ট্রেনিং এবং ডিগ্রিগুলি আমাকে করতে হয়েছে। যারা ট্রেনিং ও ডিগ্রি করেন এমন কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার তাদের প্রত্যেকের জন্যই প্রযোজ্য।

আমি আমার কর্মজীবনে দুই শ’রও বেশি ট্রেনিং নিয়েছি এবং দিয়েছি। আলোচনার সুবিধার্থে এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি মাত্র উল্লেখ করলাম। সংশ্লিষ্ট সবাই জানেন যে, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটা ট্রেনিং পেতে হলে কী পরিমাণ কম্পিটিশন করতে হয়। যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবার থেকেও এ কম্পিটিশন বেশি। ট্রেনিং মানে এখানে পুরোপুরি ডিউটি করা এবং সরকারের কাজ করে দেওয়া। সাকসেসফুল ট্রেনিং করে, কাজ শিখে তারপরে সার্টিফিকেটটা নিতে হয়। এ জন্য সরকারী কোষাগারে টাকাও জমা দিতে হয়। এগুলি সব ফুল টাইম ট্রেনিং। এর ফাঁকে কষ্ট করে আবার ক্যারিয়ার গড়তে হয়। আর কোন পেশায় যে এমন কষ্টকর অভিজ্ঞতা আছে তা আমার জানা নাই।

বর্তমানে সিসিডি (সার্টিফিকেট কোর্স অন ডায়াবেটোলজি) বা সিএমইউ (সার্টিফিকেট কোর্স অন মেডিকেল আলট্রাসনোগ্রাফি) কোর্সের থেকে বহুগুণ কঠিন, সময় ও মেধা-সাপেক্ষ এসব ট্রেনিং। আমার কথা হচ্ছে একজন ডাক্তার কেন তার পরিচয়ের সাথে এসব ভ্যালিড প্রশিক্ষণের বিষয়টি উল্লেখ করতে পারবেন না? ট্রেনিং থাকলে সেটি ট্রেনিং হিসেবেই উল্লেখ থাকবে। ট্রেনিং নিলে কী পেশাগত দক্ষতা বাড়ে না? যদি না বাড়ে তবে কেন এসব ট্রেনিং দেওয়া হয়? ট্রেনিং কিভাবে উল্লেখ থাকবে সে বিষয়ে নিয়ম করা যেতে পারে, কিন্তু উল্লেখই করা যাবে না সেটি তো কোন কথাই হতে পারে না। কোন ব্যক্তি সাইনবোর্ডে লেখা ট্রেনিংকে ডিগ্রি মনে করে বিভ্রান্ত হল, আর সে জন্য তার কনফিউশন কাটানোর জন্য ট্রেনিং উল্লেখ করার রেওয়াজই বন্ধ করে দিতে হবে- এটি কোন যুক্তির কথা হতে পারে না।

মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একেকটা ট্রেনিং নিতে যে কম্পিটিশন, সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করতে হয় তা দিয়ে চৌদ্দবার দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর্টসের যে কোন সাবজেক্ট থেকে উচ্চ গ্রেডসহ মাষ্টার ডিগ্রি নেওয়া যায়। অথচ ডাক্তাররা এটা উল্লেখই করতে পারবে না! এতো ভূতের চেয়েও অদ্ভুত। একজন ডাক্তার ট্রেনিং করেও এই নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে তার পরিচয়ে এসবের কিছুই উল্লেখ করতে পারল না, আরেকজন ডাক্তার কোন ট্রেনিংই নিলো না, ফলে কিছু উল্লেখও করল না- দুটো বিষয় তাহলে এক হয়ে গেল না? সেটা কি হওয়া উচিৎ?

এই নিয়ম থাকার জন্য কারা চেম্বারে গিয়ে গিয়ে ডাক্তারদের সাইনবোর্ডে লেখা ডিগ্রি সঠিক কী বেঠিক সেটি নিয়ে ডাক্তারদের হেনস্তা করছে সে খবর রাখেন? যে কোন সময়ে এসে ডিগ্রি চ্যালেঞ্জ করে হেনস্তা করার সুযোগ অন্যের হাতে তুলে দিয়ে আমরা নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছি। নিজেদের কষ্টার্জিত ট্রেনিং বা ডিগ্রিকে উল্লেখ পর্যন্ত করতে পারছি না। এটা তো যুক্তিযুক্ত কোন কথা হতে পারে না।

দেশের সাড়ে তেরো হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকে যে সিএইচসিপি-রা (কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রমোটার) সরকারী চিকিৎসা দিচ্ছেন তা কিসের বলে দিচ্ছেন? প্রথমে সিদ্ধান্ত হয়েছিল সিএইচসিপি হবার ন্যুনতম যোগ্যতা হবে সাইন্স থেকে ডিগ্রি পাস নারী। রাজনীতিবিদদের দাবীর কাছে তা ইন্টারমিডিয়েট এ নেমে আসে। যুক্তি দিয়ে দেখানো হয়েছিল তাহলে শুধু সাইন্স হতে হবে, সেটিও থাকেনি। আর্ট, কমার্স, সাইন্স যে কোন গ্রুপ থেকে আড়াই জিপিএ পেয়ে ফেল এর থেকে একটু বেশি নম্বর পেয়ে পাস করলেই নেতাদেরকে কাড়ি কাড়ি টাকা ঢেলে নারী/পুরুষ সবার সিএইচসিপি হবার পথ খোলা রাখা হয়েছে এবং তা অব্যাহত আছে।

সিএইচসিপিদের জন্য বারো সপ্তাহের একটা ট্রেনিং রাখা হয়েছিল, ছয় সপ্তাহ ক্লিনিক্যাল এবং ছয় সপ্তাহ প্রাকটিক্যাল। কী যে ট্রেনিং হয়েছে তা আমার চেয়ে বেশি জানা লোক সতের কোটির মধ্যে দেশে দু/চার জনের বেশি নাই। তাও আবার সবাই ট্রেনিং করেনি। কোন প্রকার ট্রেনিং না করেই এরা শুধুমাত্র আমার লেখা বইটা দেখে দেখে প্রেসক্রিপশন করে যাচ্ছে। কোন বাধা নাই। ডাক্তারদের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএমডিসি আছে, নার্সদের জন্য ডিএনএস আছে, টেকনিক্যালদের জন্য স্টেট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি আছে অথচ সিএইচসিপিদের জন্য কোন নিয়ন্ত্রক সংস্থা নাই। এরা ছাড়া গরু! এভাবে কোন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চলে? সকল মাতব্বরি খালি পাশ করা ডাক্তারদেরকে নিয়ে।

আমি হেলথ এবং পাবলিক হেলথ সংক্রান্ত যে সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ও ট্রেনিং করেছি তা আমি আমার সাইনবোর্ড ও কার্ডে উল্লেখ করবো বলে ভাবছি। এটি আমার যৌক্তিক প্রতিবাদ। যদি কেউ আমার প্রশিক্ষণ ও ডিগ্রি না বোঝেন, আমি তাকে তা শুদ্ধভাবে বুঝিয়ে দেবো। কাজটি আমি করিও বটে। আমাকে যদি কেউ চ্যালেঞ্জ করে তাহলে আমি বিনীত অনুরোধ করব, আগে পাস করা ডাক্তার ছাড়া সমস্ত প্রকার প্রেসক্রিপশন লেখা ও চিকিৎসা দেওয়া বন্ধ করুন, প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওটিসি ড্রাগ বাদে সমস্ত প্রকার ঔষধ বিক্রি বন্ধ করুন- তারপরে এ বিষয়ে নজর দিন। আমি আমার প্রশিক্ষণ ও ডিগ্রি উল্লেখ করলে রোগীর বিভ্রান্ত হবার সম্ভাবনা নাই, কিন্তু না করলে আছে বলে আমি মনে করি এবং সকল ক্ষেত্রেই তাই। সত্যি কথা অবগতির জন্য লিখলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়, এ তো আজব কথা! পাবলিক হেলথ এর সহযোগী অধ্যাপক ছিলাম, সেটি উল্লেখ করলে যদি কেউ বিভ্রান্ত হয়, সে দায় নিশ্চয়ই আমার নয়।

ডাক্তারি পেশার নেতাদেরকে বলব, পেশাগত প্রশিক্ষণ ও ডিগ্রিকে সাইনবোর্ডে উল্লেখ করার নীতিমালা প্রণয়ন করুন, বন্ধ করার মতো আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত নিয়ে পেশায় নিয়োজিত পেশাজীবীদের অর্জনকে হাইড করবেন না। কোয়াক দশটা ডিগ্রি লাগিয়ে বড় ডাক্তার সেজে বসে থাকবে আর চিকিৎসার নামে মানুষের সর্বনাশ করবে, আর পাস করা ডাক্তাররা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণও উল্লেখ করতে পারবে না- এ নিয়মের প্রতি আমার কোন শ্রদ্ধা নাই। দেশে সত্যিকার রেফারাল সিস্টেম চালু করার ব্যবস্থা নিন। একজন প্রফেসর বা স্পেশালিষ্ট কেন রেফার করা রোগী ছাড়া রোগী দেখবেন? কেন একজন রোগী ইচ্ছে করলেই স্পেশালিষ্ট দেখাতে পারবে? টাকার জোরে ফুটানি করে ইচ্ছে করলেই বড় ডাক্তার দেখানো যায় না, সেটি প্রতিষ্ঠিত করুন। এতে পেশার মান বাড়বে বৈ কমবে না।

ডাক্তার নেতারা বিষয়টি নিয়ে যদি একটু নড়েচড়ে বসেন তবে তা ভাল হয়।

শেখ মো. নাজমুল হাসান, চিকিৎসক, লেখক।

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৪৯ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৫ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১১ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭০ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৪ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৫১ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০১ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১০ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ৯৬ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৫ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ