নিরঞ্জন দে

০৮ মে, ২০২৬ ১০:২৯

রবীন্দ্রনাট্যে অমানবিক সকল মত ও পথের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

ছবি: নিরঞ্জন দে

বিশ্বের সকল অমানবিক মতবাদ ও দর্শনের বিরুদ্ধে নাটক, উপন্যাস, কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও চিঠিপত্রে সোচ্চার ছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। স্বৈরাচার, সাম্রাজ্যবাদ, ফ্যাসিবাদ, নাৎসিবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী ছিল অতুলনীয়। আজকাল আমরা যত্রতত্র যে ফ্যাসিবাদ শব্দটি শুনি তার উৎপত্তি সুদূর ইতালিতে। ফ্যাসি কথাটি ইতালিয়। আবার ল্যাটিন ফাসিসি (Fascis) শব্দটির অর্থ আঁটি বা গোছা। প্রাচীন কালে রোমান সেনা নায়কদের প্রতীক ছিল একটি কুঠারের সঙ্গে আঁটি বাঁধা একগুচ্ছ দণ্ড। তাকে বলা হতো ফাসিও (Fascio). ফ্যাসিবাদ বলতে যা আমরা এখন বুঝি তারও জন্ম ইতালিতে।

এই ফ্যাসিবাদের জন্মদাতার নাম বেনিতো হুয়ারেজ। মুসোলিনি। তাঁর বাবা আলেসান্দ্র ছিলেন একজন সমাজতন্ত্রী। মুসোলিনিও প্রথম জীবনে ছিলেন সমাজতন্ত্রী। ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের বিভীষিকা গোটা পৃথিবীর মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। তৎকালীন সময়ের বৈশ্বিক বাস্তবতায় সব দেশে এই দুই মতবাদ স্বনামে চালু না থাকলেও শোষণ, শাসন, বঞ্চনা, বৈষম্য, মানবতার অপমান চলছিল নানা ভাবে। ব্রিটিশ উপনিবেশের সীমানা ও প্রভাব ছিল অনেক বড়। সেই অস্থির সময়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এসকল অমানবিক চিন্তাচেতনার অন্ধকারা থেকে মানুষকে মুক্তির স্বাদ দিতে চেয়েছেন।

প্রকৃত কবি সত্যদ্রষ্টা হন। রবীন্দ্রনাথ মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রার অন্তরায় গুলো অনুধাবন করতে পেরেছিলেন অনেকের আগেই। বিশ শতকের শুরুতে যখন ইউরোপে ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের বাড়বাড়ন্ত, তখন অনেকেই এই অমানবিক শক্তিগুলোর সর্বগ্রাসী রূপ বুঝতে পারেননি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ খুব দ্রুত উপলব্ধি করেছিলেন যে এই মতাদর্শ মানুষের আত্মমর্যাদা, মানবতা, সভ্যতা ও মুক্তির জন্য ভয়ংকর হুমকি। তিনি প্রকাশ্যে ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন এবং সেটা তৎকালীন অনেক মনীষীদের চিন্তার আগেই। রবীন্দ্রনাথের চিন্তার কেন্দ্রে যেহেতু মানুষ- তাই মানুষের মিলন, আত্মপ্রকাশ, আত্মমর্যাদা, অধিকার ও সহাবস্থান নিয়ে তিনি লিখেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষে মানুষে ভেদ নয়, বরং মিলনই সভ্যতার আসল শক্তি। অন্যদিকে ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদ মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে দেয় এবং ক্ষমতার নামে নিষ্ঠুরতা ও দমননীতিকে বৈধতা দেয়। তাই এই মতবাদগুলোর মধ্যে তিনি সভ্যতার গভীর সংকট দেখতে পেয়েছিলেন।

ইতালির বেনিতো মুসোলিনি সম্পর্কে প্রথমদিকে কবির ধারণা স্পষ্ট ছিলনা। ১৯২৬ সালে ইতালি সফরের সময় তাঁর মুসোলিনিকে জানার আগ্রহ ছিল । কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বুঝতে পারেন, এই শাসনের ভিত গড়ে উঠেছে ভয়, দমননীতি ও ব্যক্তি নির্ভরতার ওপর। সত্য উপলব্ধি হওয়ার পর তাঁর মোহভঙ্গ ঘটে। দেশে ফিরে তিনি ব্রিটিশ সংবাদপত্র ঞযব গধহপযবংঃবৎ এঁধৎফরধহ-এ চিঠি লিখে মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী শাসনের কঠোর সমালোচনা করেন। সেই সময় এই সাহসী অবস্থান নেওয়া মুটেও সহজ ছিলনা। রবীন্দ্রনাথ উগ্র জাতীয়তাবাদ নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল - মানবতা বিহীন দেশপ্রেম সুন্দর ও কল্যাণকর হতে পারেনা। যখন উগ্র জাতীয়তাবাদ মানুষের বিবেককে অন্ধ করে দেয় এবং অন্য জাতিকে ঘৃণা করতে শেখায়, তখন তা ধ্বংস ডেকে আনে। ধর্মান্ধতার ব্যাপারেও তাঁর একই বক্তব্য। জাপানের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন এবং জার্মানির নাৎসি উন্মত্ততা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। তিনি বুঝেছিলেন, এই শক্তিগুলো শেষ পর্যন্ত পৃথিবীকে যুদ্ধ, রক্তপাত ও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে। হিটলারের নাৎসিবাদ এবং নাৎসিদের ইহুদি বিদ্বেষ এবং জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে তিনি মানবসভ্যতার জন্য অপমানজনক বলে মনে করতেন। তাঁর কাছে মানুষ কোনো জাতি, ধর্ম বা বর্ণের কারণে বড় বা ছোট নয়; মানুষের পরিচয় তার কর্মে ও মানবতায়। বাস্তবে নাৎসিবাদের দর্শন কবিগুরুর মানবতাবাদী চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। ইতালির আবিসিনিয়া আক্রমণের প্রেক্ষাপটে গুরুদেব তাঁর বিখ্যাত 'আফ্রিকা' কবিতাটি রচনা করেন । এই কবিতায় আফ্রিকার অমানবিক দুঃখকষ্ট ও উপনিবেশবাদী শক্তির নির্মম চেহারা ফুটে উঠেছে। নিঃসহায়, নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের প্রতি তাঁর গভীর সহমর্মিতা এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে ধিক্কার কবিতাটিকে ব্যতিক্রমী উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

"এসো যুগান্তরের কবি
আসন্ন সন্ধ্যার শেষ রশ্মিপাতে
দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে,
বলো 'ক্ষমা করো'-
হিংস্র প্রলাপের মধ্যে
সেই হোক তোমার সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী।"

১৯৪১ সালে কবি ৮০ বৎসর বয়সে সভ্যতার সংকট ও নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে কালজয়ী 'সভ্যতার সংকট' প্রবন্ধটি লিখেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্ধকার সময়, ফ্যাসিবাদের বর্বরতা এবং মানুষের ওপর মানুষের নিষ্ঠুরতা তাঁকে ব্যথিত করেছিল। তবু তিনি মানবতার প্রতি আস্থা হারাননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন মানুষ ঘৃণা ও হিংসার পথ ছেড়ে সত্যিকার মানবিকতার পথেই ফিরে আসবে। রবীন্দ্রনাথের ফ্যাসিবাদ-বিরোধী অবস্থানের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো-তিনি শুধু রাজনৈতিক সমালোচনা করেননি, তিনি এর নৈতিক বিপদও বুঝেছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, যে মতবাদ মানুষের স্বাধীন চিন্তা কেড়ে নেয়, ভয়ের মাধ্যমে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং ঘৃণাকে বিধ্বংসী শক্তিতে পরিণত করে, সেই মতবাদ এবং সংশ্লিষ্ট সমাজ-সভ্যতা শেষ পর্যন্ত নিজেকেই ধ্বংস করে। আজকের পৃথিবীতেও রবীন্দ্রনাথের এই সতর্কবাণী গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে অসহিষ্ণুতা, ধর্মান্ধতা, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও আগ্রাসন নীতি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তখন রবীন্দ্রনাথ আমাদের মনে করিয়ে দেন-মানুষের প্রকৃত শক্তি অস্ত্রে নয়, মানবতায়, প্রজ্ঞায়; আধিপত্যে নয়, সহমর্মিতায়; বিভাজনে নয়, মিলনে।

সমগ্র রবীন্দ্র সাহিত্য ও দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে যে অমৃতের সন্তান 'মানুষ'-তার রয়েছে স্বাধীন আত্মচেতনা, অনিন্দ্য সুন্দর সৃজনশীলতা, বহুমাত্রিক প্রেম, উদার দৃষ্টি, সৌন্দর্যবোধ এবং মানবিক মর্যাদা । তাই তিনি জীবনের প্রতিটি স্তরে অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা, কূপমণ্ডূকতা, যান্ত্রিকতা ও অন্ধ মতবাদের বিরুদ্ধে নানাভাবে প্রতিবাদ করেছেন। তিনি কখনোই এমন কোনো দর্শন, ধর্মীয় গোঁড়ামি, প্রাচীন কু-প্রথা, রাষ্ট্রশক্তি, উগ্র জাতীয়তাবাদ, অর্থলোভ বা সামাজিক কুসংস্কারকে সমর্থন করেননি, যা মানুষের স্বাভাবিক মুক্তচিন্তা ও মানবিক সত্তাকে ধ্বংস করে। মানুষের অপার সম্ভাবনা এবং এর অপচয় নিয়েই তিনি কথা বলেছেন জীবনভর। মানবিকতা বিরুদ্ধ, মানুষের চেয়ে বড় কোনো মতবাদ তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ একদিকে যেমন ভারতে আগত বহিরাগত শক্তির মনন ও দৃষ্টিভঙ্গিগত সমস্যা গুলো নির্ণয় করেছেন ঠিক তেমনি ঔপনিবেশিক শাসনের অমানবিকতার সমালোচনা করেছেন। অন্ধ জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় উন্মাদনা, বিভিন্ন রাজনৈতিক মতবাদ ও দর্শনের নানা ত্রুটি, যন্ত্রসভ্যতার নিষ্ঠুরতা এবং সামাজিক স্থবিরতার বিরুদ্ধেও সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন তিনি বার বার। বিশ্বযুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড কিংবা আধুনিক শিল্পসভ্যতার নির্মম প্রতিযোগিতা রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, শুধুই অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সভ্যতার বাহ্যিক অগ্রগতি মানুষকে যদি মানবিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে, যদি চরিত্রের উন্নয়ন না হয় তবে সেই সভ্যতা আত্মবিনাশের দিকেই এগিয়ে যায়। এই উপলব্ধি থেকেই তাঁর সাহিত্যজুড়ে একটি আদর্শিক ও গভীর মানবতাবাদী চেতনা কাজ করেছে। তিনি চেয়েছেন মানুষের আত্মমুক্তি-খর্বতা,লোভ, ভয়, অন্ধ আনুগত্য, সংকীর্ণতা ও নিষ্ঠুর ক্ষমতার হাত থেকে মুক্তি।

সকল অমানবিক মতবাদ, দর্শন, পশ্চাৎপদতা, অসংগতি সহ যাবতীয় অকল্যাণকর বিষয় ও শক্তির বিরুদ্ধে বিশ্বকবি তাঁর নিপুণ প্রতিবাদ তুলে ধরেছেন তাঁর নাটকগুলোতে। রবীন্দ্র-নাট্যে সভ্যতা ও সমাজের জটিল দ্বন্দ্ব ও মানবমুক্তির দর্শন অত্যন্ত শিল্পিত ও প্রতীকী রূপে প্রকাশ পেয়েছে। রক্তকরবী, অচলায়তন, তাসের দেশ, রথের রশি, রাজা, চণ্ডালিকা ও বিসর্জন নাটকে কিংবা ঘরে বাইরে উপন্যাসে-প্রতিটি রচনায় রবীন্দ্রনাথ নানা রূপের, নানা আবরণের, ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের অমানবিক শক্তির মুখোশ উন্মোচন করেছেন। কোথাও অন্ধ ক্ষমতা ও যান্ত্রিক সভ্যতা মানুষকে সংখ্যায় পরিণত করেছে, কোথাও প্রাচীন ধর্মীয় প্রথা প্রাণের স্বাধীনতাকে বন্দি করেছে, কোথাও বৃদ্ধ শাস্ত্র, কোথাও অন্ধ জাতীয়তাবাদ মানবিকতাকে গ্রাস করেছে, কোথাও সামাজিক বিভাজন মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি শেষ পর্যন্ত মানুষের আত্মজাগরণের শক্তি, প্রেম, স্বাধীনতা ও মানবিকতার জয়কেই প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রকৃতির জয়গান করেছেন। মুক্তির ডাক, পরিবর্তনের ডাক এসেছে বার বার নানা রূপকে।
রক্তকরবীর যক্ষপুরীর রাজা এমন এক শাসক, যিনি আড়ালে থেকে মানুষের শ্রম ও জীবন নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁর রাজ্যে মানুষ তার পরিচয় হারিয়ে হয়ে গেছে এক একটি সংখ্যা । শ্রমিকের ব্যক্তিসত্তা নেই, স্বাধীনতা নেই, আনন্দ নেই। লোভ ও যন্ত্রসভ্যতার নির্মমতা সেখানে সমস্ত মানবিকতাকে গ্রাস করেছে। রাজার চারদিকে তৈরি হয়েছে এক অলীক অসত্য বেড়াজাল। রাজা এই নিষ্ঠুর ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হলেও তিনি নিজেও সুখী নন। বরং তিনিই সবচেয়ে নিঃসঙ্গ। তাঁর চারপাশে ক্ষমতা আছে, তোষামোদ আছে, প্রাচুর্য আছে, কিন্তু প্রাণ নেই। তাই নন্দিনীর আবির্ভাব তাঁর ভিতরে এক গভীর আলোড়ন তোলে। নন্দিনী এখানে প্রেম, প্রকৃতি, স্বাধীনতা ও জীবনের প্রতীক। সে রাজার ভিতরের মৃত মানুষটিকে জাগিয়ে তোলে। প্রতিটি ক্ষমতাবান মানুষের ভেতরে এরকম একজন নিঃসঙ্গ মোহগ্রস্ত রাজা আছে, অন্ধকারে আবদ্ধ। তাই এই জাগরণ আসলে রবীন্দ্রনাথের মানবমুক্তির দর্শনেরই প্রকাশ।এই মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা অচলায়তন নাটকেও প্রবলভাবে প্রকাশিত হয়েছে। কী অসাধারণ গান সেখানে, গানে গানে অন্ধকারের দেয়াল ভাঙার ডাক।

"মাঠের বাঁশি শুনে শুনে আকাশ খুশি হল।
ঘরেতে আজ কে রবে গো,
খোলো খোলো দুয়ার খোলো..."

বিভাস-বাউল রাগে সুরারোপিত এ গানে রূপকের মাধ্যমে মুক্তির ডাক শুনিয়েছেন কবি। সেখানে কোনো দৃশ্যমান অত্যাচারী রাজা নেই, কিন্তু আছে আরও ভয়ংকর এক শক্তি-অন্ধ প্রথা, বিশ্বাস ও স্থবির প্রতিষ্ঠান। অচলায়তন এমন প্রতীকী প্রতিষ্ঠান বা সমাজব্যবস্থা বা প্রথা, যা প্রগতির অন্তরায়, কুশিক্ষা ও গোঁড়ামিপূর্ণ এবং রক্ষণশীল, অর্থাৎ যাকে সহজে নড়ানো বা পরিবর্তন করা যায় না । এটি মূলত বদ্ধমূল ধারণা, জড়তা, কুসংস্কার এবং অচলাবস্থাকে নির্দেশ করে। সর্বত্র বৃদ্ধ নিয়মের ভয়! অচলায়তনের মানুষরা জীবনের পরিবর্তে নিয়মকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে। সেখানে প্রশ্ন নেই, স্বাধীন চিন্তা নেই, প্রাণের স্পন্দন নেই। মানুষ যেন এক নিষ্প্রাণ জগতে বসবাস করছে। রক্তকরবীতে যেমন সোনার খনি মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করেছে, অচলায়তনে তেমনি ধর্মীয় ও সামাজিক গোঁড়ামি মানুষকে প্রাণহীন করে তুলেছে। আনন্দের সন্তান হয়েও তার আনন্দ নেই। রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, যেকোনো স্থবিরতা-সে অর্থলোভ বা ধর্মীয় প্রথা বা জরা-বৃদ্ধ শাস্ত্রের দোহাই -মানুষের স্বাভাবিক বিকাশকে ধ্বংস করে। তাসের দেশ নাটকেও "চলো নিয়ম মতে" এ চিন্তার আড়ষ্টতা মানুষকে নিয়মের দাসে পরিণত করেছে। অন্ধ অনুকরণ, অনুসরণ আর বিশ্বাস মানবের অসীম সম্ভাবনাকে বুঝতে দেয়না। নিয়মের এই ভাবনা শিল্পিত ও ব্যঙ্গাত্মক রূপে প্রকাশিত হয়েছে তাসের দেশ নাটকে। শুধুই নিয়মমতো চলতে গিয়ে তাসের দেশের মানুষরা যেন জীবন্ত মানুষ নয়, তারা তাসের পুতুল-যন্ত্রের মতো নির্দিষ্ট নিয়মে চলে। সেখানে হাসি, কান্না, প্রেম, স্বতঃস্ফূর্ততা কিছুই নেই। সবাই বাঁধাধরা অর্থহীন নিয়মের অধীন। কে কোথায় দাঁড়াবে, কীভাবে চলবে, কীভাবে কথা বলবে-সব নির্ধারিত। তাসের দেশ আসলে এমন এক সমাজের প্রতীক, যেখানে মানুষ তার স্বাধীন সত্তা হারিয়ে একটি ফ্রেমে আটকানো জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। অন্ধ অনুসরণ ও মান্যতা তাকে মেরুদণ্ডহীন করে একেবারে গ্রাস করে ফেলে। তাসের দেশের মূল বক্তব্য হলো-মানুষের সত্যিকার জীবন কেবল নিয়মের মধ্যে নয়, স্বাধীন সৃজনশীলতার মধ্যে। তাই নাটকের রাজপুত্র যখন সেখানে প্রাণের স্পর্শ নিয়ে আসে, তখন সেই স্থবির জগতে পরিবর্তনের সূচনা হয়। ভেঙে দাও, ভেঙে দাও- আহ্বান আসলে মানুষের ভিতরের জড়তা, ভয় ও অন্ধ আনুগত্য ভেঙে ফেলার আহ্বান। রক্তকরবীর নন্দিনী যেমন যক্ষপুরীর মৃত্যু গহন অন্ধকারে আশার আলো নিয়ে আসে, জীবনের বারতা শুনায় তেমনি তাসের দেশের রাজপুত্র ও সদাগরপুত্র যান্ত্রিক সমাজে প্রাণ সঞ্চার করে, উদ্দীপনা যোগায়। উভয় ক্ষেত্রেই রবীন্দ্রনাথের সত্য ঘোষণা -মানুষের স্বভাবই মুক্তি, তার প্রকৃত পরিচয় স্বাধীন সৃজনশীলতায়। " আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে"- এটি মানুষের চিরন্তন বাসনা।

রবীন্দ্রনাথের রথের রশি নাটকেও এই মানবমুক্তির দর্শন বিশেষ তাৎপর্যে প্রকাশিত হয়েছে। রথ এখানে সমাজ-সভ্যতার প্রতীক। অস্তিত্বের প্রতীক। এই নাটকে রথের রশি কেবল একটি বস্তু নয়; এটি সমাজ, ধর্ম, ক্ষমতা ও সভ্যতার চালিকাশক্তির প্রতীক। রশিতে টান পড়লেই রথের চাকা ঘুরবে। ফলে রথ টানার অধিকার নিয়ে সমাজে বিভেদ, অহংকার ও শ্রেণিবৈষম্য সৃষ্টি হয়। উচ্চবর্ণ ও ক্ষমতাবানরা মনে করে, রথ টানার অধিকার কেবল তাদেরই, তারাই সমাজের চালিকাশক্তি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, ঈশ্বর কিংবা সভ্যতা ও মানবতার রথ কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। মানুষের মর্যাদা জন্মে নয়, কর্মে স্থির হয়, মানবিকতায় বিকশিত হয়। রথের রশি নাটকে আমরা দেখি যেখানে সমাজ বিভাজনের প্রাচীর তৈরি করে, সেখানে মানবতা সেই প্রাচীর ভেঙে দেয়। রথ তখনই সত্যিকার অর্থে চলতে পারে, যখন সকল মানুষ একসঙ্গে তার রশি ধরে। এই প্রতীক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ বোঝাতে চেয়েছেন, সভ্যতার অগ্রগতি কেবল তখনই সম্ভব, যখন মানুষ ভেদাভেদ ভুলে সম্মিলিত ভাবে মানবতার পথে এগিয়ে যায়। এখানে তাঁর মানবতাবাদী দর্শন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উচ্চনীচ ভেদাভেদ, ধনী-গরীব বৈষম্য, জাতপাতের ছুৎমার্গ, বর্ণবিদ্বেষ এসব নিয়ে রথ এগিয়ে নেয়া যায়না। রথ চলেনা। এ যে মানব অভ্যুদয়ের রথ। তার রশিতে সকলের হাতে টান লাগালেই সে চলবে। সমাজে প্রচলিত শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষও এটা বুঝতে চায়না। নিজের জাত্যভিমান থেকে বের হতে পারেনা। শ্রেণি স্বার্থ ও চিন্তা তাকে অন্ধ করে, মোহগ্রস্ত করে ঘোরের মধ্য বন্দী করে রাখে। নিয়মের অদৃশ্য কারা থেকে তার মুক্তি হয়না। নিয়মই তার সম্ভাবনা বিকাশের অন্তরায়। রথের রশিতে টান পড়েনা তার হাতে। মানুষেরে অপমান করে মানুষের বিধাতার রথ চালানো অসম্ভব। সভ্যতা হয়ে পড়ে স্থবির বিবর্ণ। অন্যদিকে বিসর্জন নাটকে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন রাজশক্তির উপর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ও অমানবিক ক্ষমতার ভয়াবহ পরিণতি। এই নাটকে রাজা গোবিন্দমাণিক্য মানবিকতা ও করুণার পক্ষে দাঁড়ান। তিনি রক্তাক্ত পশুবলির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। কারণ তিনি উপলব্ধি করেন যে ধর্মের নামে নিষ্ঠুরতা কখনো সত্যিকার ধর্ম হতে পারে না। কিন্তু ব্রাহ্মণ পুরোহিত রঘুপতি খুব কঠিন চরিত্র, ধর্মীয় ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ। তাঁর কাছে ধর্ম মানে নিজ স্বার্থ, শাস্ত্র, পুঁথি, আচার, বলি ও ক্ষমতার আধিপত্য। যার ফলে Ñরাজশক্তি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অন্ধ ক্ষমতার কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। রাজ পুরোহিত রঘুপতির প্রভাব এমন গভীর যে রাজাও স্বাধীনভাবে মানবিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারেন না। ফলে ধর্ম মানুষের মুক্তির পথ না হয়ে শাসন ও ভয়ের অস্ত্রে পরিণত হয়। এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত করুণ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।

নিঃসন্তান রাজরানীর সন্তান লাভের আকাঙ্ক্ষা, পশুর মধ্যেও মাতৃস্নেহের অবলোকন, জয়সিংহ ও অপর্ণার মানবীয় প্রেম, রাজার কল্যাণচিন্তা, অহেতুকী প্রাণী হত্যার বিপরীতে শত যুক্তি - কোনো কিছুই পাষাণ ব্রাহ্মণ পুরোহিত রঘুপতির ভ্রান্তি ঘুচাতে পারেনা, মন গলাতে পারেনা। ফলে জয়সিংহের মৃত্যু, রঘুপতির আত্মিক বিপর্যয় এবং রাজ্যের অমঙ্গল ও অস্থিরতা দেখিয়ে রবীন্দ্রনাথ বুঝিয়েছেনÑ ধর্মের অপব্যাখ্যা মানুষের প্রেম, করুণা ও মানবিকতাকে অস্বীকার করে, তা শেষ পর্যন্ত ধ্বংস ডেকে আনে। রাজর্ষি উপন্যাসে বিষয়টি আরও ব্যাপক ও গভীর ভাবে উঠে এসেছে। বিসর্জন নাটকে রঘুপতির মুখে শুনা যায়-
"এসো বৎস আর এক শিক্ষা দেই,
পাপ পুণ্য কিছু নাই এ পৃথিবীতে
কে বলেছে হত্যাকাণ্ড পাপ?"

এ সংলাপে অন্ধ বিশ্বাস, ধর্মের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা আর ক্ষমতা রক্ষার্থে হত্যাকেও প্রকৃতির বিধান আখ্যা দিয়ে বৈধ করার কূটকৌশল লক্ষ্য করা যায়। আজকের দিনেও বৈশ্বিক বাস্তবতায় বিসর্জন নাটকটি বিশেষভাবে গুরুত্ব বহন করে। এখানে রবীন্দ্রনাথ ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্ককে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, যখন ধর্ম ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা মানুষের বিবেককে গ্রাস করে। ধর্ম যদি মানবকল্যাণের পরিবর্তে নিয়ন্ত্রণ ও ভয়ের মাধ্যম হয়ে যায়, তবে তা সভ্যতার জন্য বিপজ্জনক। তাই বিসর্জনে গোবিন্দমাণিক্য রাজা হয়েও আসলে মানবিক বিবেকের প্রতিনিধি, আর রঘুপতি অন্ধ ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রতীক। অন্যদিকে ঘরে বাইরে উপন্যাসের সন্দীপ চরিত্রও একটি শ্রেণি এবং শক্তির প্রতিনিধি । তবে রক্তকরবীর রাজার মতো সে অদৃশ্য নয়; বরং অত্যন্ত আকর্ষণীয়, বাকপটু ও আবেগ-উদ্দীপক। সন্দীপ জাতীয়তাবাদের নামে মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে ক্ষমতা ও স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সে মানুষের হৃদয়ে আগুন জ্বালায়, কিন্তু সেই আগুনের মধ্যে সত্যিকারের মানবকল্যাণ নেই। ফলে সন্দীপের চরিত্রেও নীতিনৈতিকতা বর্জিত এক ধরনের আত্মকেন্দ্রিক ক্ষমতালিপ্সা ও ডাবল স্ট্যান্ডার্ড দেখা যায়। উগ্র জাতীয়তাবাদ আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তার দেশপ্রেমের পথকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। নিখিলের মুখ থেকে কবি সেই অকল্যাণের সাবধান বাণী শুনিয়ে দেন। শেষে ভ্রান্তি বা ঘোর কেটে যায় ঘর থেকে বাইরে আসা মুক্তির স্বাদ এবং আধুনিকতার পাঠ নেয়া বিমলার।

রক্তকরবীর রাজা ও ঘরে বাইরের সন্দীপÑদুজনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল হলো, উভয়েই মানুষকে নিজের উদ্দেশ্যের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। তবে পার্থক্য হলো, রক্তকরবীর রাজা শেষ পর্যন্ত নিজের অন্তর্দহন অনুভব করেন ; কিন্তু সন্দীপের মধ্যে সেই আত্মসমালোচনা নেই। সে নিজের ভেতরের অন্ধকারকে স্বীকার করতে পারে না। ফলে রক্তকরবীর রাজা ট্র্যাজিক ও আত্মরূপান্তরমুখী চরিত্র হলেও সন্দীপ অনেক বেশি আত্মঅহংকারে আবদ্ধ। এই সমস্ত নাটক ও চরিত্রকে একসঙ্গে পড়লে স্পষ্ট হয় যে রবীন্দ্রনাথের মূল চিন্তা ছিল মানুষের মুক্তি। কিন্তু তাঁর মুক্তি কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়। তিনি চেয়েছেন- লোভ থেকে মুক্তি,অন্ধ প্রথা থেকে মুক্তি, যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি,ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে মুক্তি, উগ্র জাতীয়তাবাদ থেকে মুক্তি, ভয় ও বিভাজন থেকে মুক্তি, জাত্যভিমান ও জাতপাতের ভেদাভেদ থেকে মুক্তি, শাস্ত্র আর নিয়মের দোহাই থেকে মুক্তি। কারণ পরিবর্তনই জগৎসংসারের নিয়ম এবং সেটা হতে হবে কল্যাণকর, প্রগতির পথে, অখণ্ড মানবসমাজের ভাবনায়। মানবের সকল সম্ভাবনাকে জাগাতে হবে। রক্তকরবীর রাজা, অচলায়তনের স্থবির প্রতিষ্ঠান, তাসের দেশের নিয়ম ও যান্ত্রিক সমাজ, রথের রশির সামাজিক বিভাজন, বিসর্জনের ধর্মীয় আধিপত্য কিংবা ঘরে বাইরের আবেগমত্ত জাতীয়তাবাদ-সবই মানুষের স্বাধীন প্রাণসত্তাকে বন্দি করার ভিন্ন ভিন্ন রূপ। আর রবীন্দ্রনাথের নাট্যদর্শন সেই বন্দিত্বের বিরুদ্ধে প্রাণের বিদ্রোহ। তাঁর কাছে মানুষ কেবল রাষ্ট্রের নাগরিক নয়, ধর্মের অনুসারী নয়, অর্থনৈতিক শক্তির যন্ত্রও নয়; মানুষ মূলত এক সৃজনশীল, প্রেমময় ও স্বাধীন সত্তা। তাই তাঁর নাটকে বারবার প্রাণের জয় ঘটে জড়তার বিরুদ্ধে, মানবতার জয় ঘটে ক্ষমতার বিরুদ্ধে, মুক্তির জয় ঘটে অন্ধ নিয়মের বিরুদ্ধে।

অসাধারণ রূপক, সংলাপ ও সঙ্গীতে রবীন্দ্রনাট্য হয়ে উঠেছে সত্যপ্রকাশক অপূর্ব মাধুরীময় মানবহৃদয় ও মানবমুক্তির জয়গাঁথা। তাঁর নাটকের রাজারা কখনো ক্ষমতার প্রতীক, কখনো আত্মিক সংকটের প্রতীক, কখনো মানবিক জাগরণের সম্ভাবনা। কিন্তু প্রতিটি নাটকের অন্তর্লীন আহ্বান একটিইÑমানুষকে তার সত্যিকার মানবিক সত্তায় ফিরিয়ে আনা। কারণ রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, মানুষ তখনই সত্যিকার অর্থে মানুষ হয়ে ওঠে, যখন সে ভয়, লোভ, অন্ধতা ও বিভাজনের শৃঙ্খল ভেঙে মুক্ত প্রাণের জগতে প্রবেশ করতে পারে। তিনি ভৈরবের শক্তি নিয়ে সর্ব খর্বতাকে জয় করতে চেয়েছেন। বলেছেন-

"ওঠো ওঠো রে-- বিফলে প্রভাত বহে যায় যে।
মেলো আঁখি, জাগো জাগো, থেকো না রে অচেতন।"

  • নিরঞ্জন দে: লেখক, প্রামাণ্যকার ও সংগঠক

আপনার মন্তব্য

আলোচিত