নাদির আহমেদ, শাবিপ্রবি

১৭ আগস্ট, ২০২৫ ১৪:২৮

শাবিপ্রবির ‘লালমামা’, ‘গোলবানু খালা’ : ক্যাম্পাস ঘিরে জীবন যাদের

প্রতিদিন ভোরের আলো ফুটতেই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) ক্যাম্পাসে শুরু হয় প্রাণচাঞ্চল্য। শিক্ষার্থীদের পদচারণ, আড্ডা, ক্লাস-পরীক্ষা আর চায়ের দোকানের হাসি-গল্পে ভরে ওঠে চারপাশ।

তবে এই কর্মচাঞ্চল্যের ভিড়ে কিছু মুখ আছে যাঁদের জীবনযাত্রা, আয়ের পথ আর স্মৃতির ভাণ্ডার গড়ে উঠেছে এই ক্যাম্পাসকে ঘিরে।প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্মৃতির ভাঁজে রয়ে যায় কিছু চেনা মুখ—যাঁদের জীবন আর জীবিকা জড়িয়ে আছে এই ক্যাম্পাসের সঙ্গে। শাবিপ্রবির এমনই কিছু চেনা মুখের গল্প শোনে আসা যাক।

সবার প্রিয় ‘প্রদীপ-সঞ্জীব’

শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসের লাইব্রেরি ভবনের নিচে দীর্ঘ তিন দশক ধরে জুতা সেলাই ও পালিশের কাজ করে আসছেন দুই ভাই প্রদীপ ও সঞ্জীব। পৈতৃক নিবাস হবিগঞ্জ হলেও তারা স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সুরমা আবাসিক এলাকার একটি কুঁড়েঘরে যৌথভাবে বসবাস করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই তাদের বাবা দিলীপ বাবু একই স্থানে কাজ করতেন। বাবার হাত ধরেই এই পেশায় আসেন দুই ভাই, যা এখন তাদের জীবনের একমাত্র অবলম্বন। নিয়মিত লাইব্রেরি ভবনের নিচে কাজ করলেও ক্যাম্পাস বন্ধের দিন যান আবাসিক হলগুলোতে। আয় সীমিত হলেও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধন এবং পেশার প্রতি সম্মানবোধের কারণে তারা এই কাজ চালিয়ে যেতে চান।

গিফারি চত্বরের ‘সবুজ ভাই’

ক্যাম্পাসের গিফারি চত্বরে ছোট্ট টং দোকান দিয়ে শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন সবুজ মিয়া, যাঁকে সবাই ‘সবুজ ভাই’ নামে চেনে। টিনের ছাউনি, কাচের আলমারিতে সাজানো শিঙাড়া, পেঁয়াজু, খিচুড়ি, চা আর ঠান্ডা পানীয়—দোকানটি দেখতে সাধারণ হলেও শিক্ষার্থীদের কাছে এটি শুধু খাবারের জায়গা নয়, বরং বন্ধুত্ব, আড্ডা এবং স্মৃতির কেন্দ্র। সবুজ ভাই ২০০২ সালে শিক্ষা ভবনের নির্মাণকাজে শ্রমিক হিসেবে ক্যাম্পাসে আসেন। পরে শুরু করেন টংদোকান। বিভিন্ন সময় দোকান উচ্ছেদ ও ক্ষতির মুখোমুখি হলেও হাল ছাড়েননি। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ও আস্থা তৈরি করেছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

সবজি বিক্রেতা ষাটোর্ধ্ব ‘গোলবানু’

প্রায় এক দশক ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী হলের পাশে প্রতিদিন টাটকা সবজি বিক্রি করেন ষাটোর্ধ্ব গোলবানু। বাঁশ ও কাগজের ছাউনি দিয়ে তৈরি ছোট ঝুপড়ি দোকানে তিনি ভোরে সিলেটের আড়ত থেকে আনা সবজি বিক্রি করেন। ক্রেতা শুধু ছাত্রীরাই। তার পরিবারে অসুস্থ স্বামী, ছেলে, মেয়ে ও নাতি-নাতনি মিলিয়ে ১১ জন রয়েছেন। ছাত্রীরা তাঁকে স্নেহভরে ‘খালা’ বা ‘মামি’ বলে সম্বোধন করেন। হলে ব্যক্তিগতভাবে রান্না করার সুযোগ থাকায় অধিকাংশ ছাত্রী গোলবানুর কাছ থেকে সবজি কিনে থাকেন। তাই তাঁর দোকান শুধু খাবারের উৎস নয়, বরং স্নেহ, নির্ভরতা ও বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

লাল টংয়ের ‘লাল মামা’

বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বর সংলগ্ন ছোট্ট স্টিলের লাল রঙের দোকানটি সবাই ‘লাল মামার টং’ নামে চেনে। ৫৫ বছর বয়সী অজয় আচার্য, যাঁকে লাল মামা বলা হয়, দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে চা, বিস্কুট ও পান বিক্রি করে ক্যাম্পাসের পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। ২০০০ সালে ক্যাম্পাসে টংদোকান স্থাপন করেন তিনি।২০০৮ সালে দোকানটি লাল রং করলে শিক্ষার্থীরা তাঁকে ‘লাল মামা’ নামে চিনতে শুরু করে। ছোটবেলা থেকেই পরিবারে দায়িত্ব নেন, বাবার মৃত্যুর পর চা-বিস্কুট বিক্রি করেই সংসার চালাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধু ব্যবসা নয়, বরং বন্ধুত্ব ও সহমর্মিতার প্রতীক।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত