অপূর্ব শর্মা

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:৩৬

নৈঃশব্দ্যের ভেতর জন্ম নেওয়া শব্দের উৎসব

বড় মায়ার শহর মৌলভীবাজার। শুধু প্রকৃতির মায়া নয়, এই শহরের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানুষের রুচিশীলতাতেও জড়িয়ে আছে নির্মল মায়া। এই শহর থেকে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিনগুলো যেমন নান্দনিক ও আকর্ষণীয়, তেমনি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর কর্মপ্রয়াসও নিবেদনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

মৌলভীবাজার শহরের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হচ্ছে-একটি সংগঠন কোনো উদ্যোগ নিলে অন্যরা পাশে এসে দাঁড়ায়। প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতা, আত্মঅহংকারের চেয়ে সৌহার্দ্য, আর ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে সম্মিলিত আনন্দ এখানে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। সবাই মিলে ভালো থাকার, ভালো কিছু করার প্রয়াসই মৌলভীবাজারের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য।

বেশ কয়েজন অগ্রসর মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছে এই সুদৃঢ় বন্ধন। সামন থেকে রয ক’জন নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে অন্যতম মুজাহিদ আহমদ এবং সুনীল শৈশব। একজন ‘কোরাস’, অন্যজন ‘স্বনন’-এর মাধ্যমে সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। এই দুঃসময়ে তারা প্রমাণ করে চলেছেন-ইচ্ছা, নিষ্ঠা আর ভালোবাসা থাকলে অসম্ভব বলে কিছু নেই।

‘স্বনন সাহিত্য উৎসব’ নিয়ে কিছু কথা বলতে গিয়ে এই কথাগুলো বলা প্রয়োজন বলে মনে হলো। গত শুক্র ও শনিবার সুনীল শৈশব দুদিনব্যাপী ‘স্বনন সাহিত্য উৎসব’-আয়োজন করেছিলেন। সেই আয়োজন ছিলো নান্দনিক এবং সফল। এই আয়োজনটি কেবল একটি উৎসব ছিলো না; এটি ছিলো মানুষের সঙ্গে মানুষের, হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের সেতুবন্ধন।

নিঃস্বার্থ ও নিবেদিতপ্রাণ কিছু মানুষ আছেন বলেই আজও সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই আলো জ্বলছে। আর সুনীল শৈশবের এই আয়োজন যেন সেই আলোরই আরেকটি উজ্জ্বল নাম-যেখানে ভালোবাসা দিয়ে অসাধ্যকেও সম্ভব করে তোলা যায়। আমরা প্রকৃত অনেক নেপথ্যের কারিগরের কথা বলতে চাইনা। স্বীকার করিনা তাদের অবদানের কথা, আমার মনে হয়েছে পুরো অনুষ্ঠানের পেছনে অন্যতম প্রেরণা দিয়েছেন যিনি তিনি রয়ে গেছেন নিভৃৃতে। চৈতালী চৈতির কথা, আমরা সেভাবে উচ্চারণ করিনি। অথচ, একজন সুনীল শৈশবের এই আয়োজন সফল্যের অন্যতম শক্তি আসলে তিনি। যদিও মুজাহিদ আহমদের অবদান কোনো অংশ কম নয়, কিন্তু আমি সুনীল শৈশব এবং মুজাহিদ আহমদকে অভিন্ন মনে করি।

আমাদের সমাজে অনেকেই পথপ্রদর্শন করেন। কিন্তু পথচলার সাথী সবাই হতে পারেন না। কিন্তু এই দুটি পরিবারের একসঙ্গে অভিযাত্রা দেখে আমি আপ্লুত হয়েছি। সবাই যদি এভাবে চলতো, সত্যি সত্যি বদলে যেতো দেশ। ভালোবাসাময় হয়ে উঠতো সমাজ। অনুষ্ঠানে সুনীল শৈশবের উচ্চারণ সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত বন্ধুকন্যাকে আবৃত্তির আমন্ত্রণ জানাতে গিয়ে তিনি বললেন, এবার আসছেন আমার আত্মজা তাওফিকা মুজাহিদ। তাঁর এই উচ্চারণে আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং সম্প্রীতির কথাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। সত্যি বলতে কি, এটাইতো আমাদের সমাজ। এর যাত্রাইতো যুগ যুগ ধরে প্রবহমান।

নৈশব্দ্যের ভেতর জন্ম নেওয়া শব্দের উৎসব-শীর্ষক স্বনন সাহিত্য উৎসব সত্যি সত্যি আশার আলো দেখালো। চেতনায় দিল সান! শব্দের শক্তিযে অফুরান সেটাই তুলে ধরা হলো প্রতিপাদ্যে। আমরা সবাই শুধু করতে হবে বলি। জ্ঞান দেই মানুষকে। কিন্তু সুনীল শৈশব সেটা করলেন খুব সুন্দরভাবে।

সিলেট এবং মৌলভীবাজার শহরের ঘুম ভাঙে একটু দেরিতে। সেখানে সাত সকালে অনুষ্ঠান আয়োজন এবং হল ভর্তি উপস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দিলো সুন্দর আয়োজনে মানুষ হতাশ করেন না। স্বনন সাহিত্য উৎসব এর প্রমাণ। সকালের নরম রোদে এই উৎসবের উদ্বোধন করেন কবি ও লোকসংস্কৃতি গবেষক ডক্টর আবুল ফতেহ ফাত্তাহ। এরপর অনুষ্ঠিত হয় র‌্যালি। র‌্যালি শেষে ছিলো আলোচনা। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সচিব কবি জাকির জাফরান। জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়ের কবি হিসেবে খ্যাতি পাওয়া জাকির জাফরান শুনালেন আশাবাদের গল্প। বললেন, সাংস্কৃতিক জাগরণের কথা। জানালেন, বছর দুয়েকের মধ্যে বদলে যাবে অনেক কিছু। আসবে স্বাভাবিকতা। প্রতিটি শিশু কোনোনা কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শিখবে। সে অনুযায়ি চলছে কর্মপ্রবাহ। আমরা তাঁর কথায় আশাবাদী হয়েছি।

নন্দিতা দেবের সঞ্চালনায় উদ্বোধনী পর্বে স্বাগত বক্তব্য দেন ‘স্বনন’-এর সম্পাদক কবি সুনীল শৈশব। কথা বলেন, সৈয়দ মুজিবুর রহমান, চিকিৎসক অঞ্জন ভৌমিক, চিকিৎসক বিনেন্দু ভৌমিক, চিকিৎসক ওবায়েদ বাপ্পি, এম এ আহাদ, সৈয়দ মজিবুর রহমান রঞ্জু, আইনজীবী মিজানুর রহমান, আইনজীবী বিশ্বজিৎ ঘোষ ও নুরুল ইসলাম। এ পর্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন-লোকগবেষক আহমদ সিরাজ, কবি কথাসাহিত্যিক আকমল হোসেন নিপু, কবি প্রাবন্ধিক অধ্যাপক স্বপন নাথ, কবি সম্পাদক কামরুল বাহার আরিফ এবং কবি-সম্পাদক নাহিদ আশরাফী।

দুইদিনব্যাপি এই উৎসব ছিলো খুবই প্রাণবন্ত। দ্বিতীয় পর্বের সভাপতি ছিলাম আমি। মডারেটরের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে এ পর্বে। প্রথম পর্বে কথা বলেছি, তৃতীয় পর্বে পাঠ করেছি স্বরচিত কবিতা। সঞ্চালনাও করেছি কিছু সময়। এ পর্বে প্রধান বক্তা ছিলেন অগ্নিশিখা সম্পাদক সুমন বনিক, আলোচনায় অংশ নেন, মৃদঙ্গ সম্পাদক কামরুল বাহার আরিফ, জলধী সম্পাদক নাহিদা আশরাফী, অনার্য সম্পাদক নুরুল ইসলাম, শৈশব সম্পাদক মহিদুর রহমান, লেখাবিল নির্বাহী সম্পাদক জয়নাল আবেদীন শিবু, দহলিজ সম্পাদক হাসান মাহামুদ।

মৃদঙ্গ সম্পাদক কামরুল বাহার আরিফের সভাপতিত্বে কবি কন্ঠে কবিতা পাঠে অংশ নেন উপস্থিত সব কবিরা। অকাল প্রয়াত কবি সৌমিত্র দেবকে স্মরণ করা হয় এ পর্বে। অশ্রুসিক্ত নয়নে তাঁর লেখা কবিতা আবৃত্তি করেন সুনীল শৈশব।

উৎসব এতোটাই ভালোবাসাময় ছিলো যে, মনে হয়েছে আয়োজকদের একজন আমি। অর্থাৎ স্বনন পরিবারের সদস্য। এইযে সার্বজনীনতা এটাই ছিলো এই উৎসবের বড়ো সাফল্য।

দীর্ঘদিন দেখা না হওয়া অনেক স্বজনের সাথে এই উৎসবে দেখা হওয়াটা ছিলো বাড়তি পাওয়া। আহমেদ সিরাজ ভাই দেখা হতেই জড়িয়ে ধরলেন, উপহার হিসেবে তুলে দিলেন তাঁর লেখা বই, কোদালীর সুকান্ত সংখ্যা তুলে দিলেন অন্যতম সম্পাদক মুহিদুর রহমান, তরুন কবি সুমন দাশগুপ্ত কাব্যগ্রন্থ শ্রাবনের চিঠি ভাঙা কাচের টুকরো’ সাংবাদিক নুরুল ইসলাম শেফুল ভাই বিনিময় করলেন কুশল, ড. বিনেন্দু ভৌমিক জানালেন উষ্ণ শুভেচ্ছা।

১১ সেপ্টেম্বর ছিল সুনীল শৈশবের জন্মদিন। উৎসবের ব্যস্ততার মধ্যেই সহকর্মীরা নিয়ে এলেন কেক। কোনো আনুষ্ঠানিক জাঁকজমক নয়, একেবারে আপনজনের মতো ভালোবাসায় কেক কাটা হলো। বিশেষভাবে মনে থাকার মতো হয়ে রইল তাঁর সহধর্মিণী চৈতালী চৈতীর ভালোবাসাময় উপস্থিতি ও সংগীত পরিবেশনা। সেই কণ্ঠে যেন জন্মদিনের শুভেচ্ছা আরও ব্যক্তিগত, আরও মায়াময় হয়ে উঠল।

‘স্বনন’-এর সপ্তম সংখ্যা, বিশেষ চা সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করা হয় উৎস মঞ্চে। এটি এই উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। চা-শিল্পের ইতিহাস, চা-শ্রমিকের জীবন, সংগ্রাম ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে প্রকাশিত এই সংখ্যা শুধু একটি ছোটকাগজের প্রকাশনা নয়; এটি এই ভূখ-ের ইতিহাস ও মানুষের জীবনকে শব্দে ধরে রাখার একটি প্রয়াস। মুজাহিদ আহমদ এবং চৈতালী চৈতি ছিলেন এই সংখ্যার অন্যতম কারিগর। নেতৃত্বে ছিলেন যথারীতি সুনীল শৈশব।

চতুর্থ পর্ব ছিলো ‘সমকালীন সাহিত্য, শিল্পচেতনা ও সিলেটের সাহিত্য’ বিষয়ে। এ পর্বে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন কবি ও লোক গবেষক ডক্টর আবুল ফতেহ ফাত্তাহ। সভাপতির বক্তব্যে তিনি জানালেন অন্ধকার দূর করার আহ্বান আর স্বপন নাথের কন্ঠে ধ্বনিত হলো সাহিত্যের জয়গান, লোকসাহিত্যের সমৃদ্ধির কথা উঠে এলো আহমদ সিরাজের বক্তব্যে। অন্যরা শুভেচ্ছায় ভালোবাসায় সিক্ত করলেন স্বননকে।

সাহিত্য আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে সংগীত পরিবেশন করে আমাদেরকে আনন্দ দিয়েছেন শ্রীমঙ্গল দ্বারিকা পাল মহিলা কলেজের শিক্ষক জলি পাল এবং কবি তাসনীম চৌধুরী বিথী। কোনো সংগত ছাড়াই তাদের সুরের দ্যুতনা আমাদেরকে করে রেখেছিলো মোহময়।

অন্যান্য বছরের মতো এবারও ভালো কাজের স্বীকৃতি দিয়েছে স্বনন। এ বছর দু’জনকে প্রদান করা হয়েছে পুরস্কার। কথা সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আকমল হোসেন নিপু এবং ছোটেকাগজ সম্পাদনায় অবদানের জন্য অগ্নিশিখা সম্পাদক সুমন বনিক পেয়েছেন স্বনন পুরস্কার। পুরস্কার গ্রহণ শেষে অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সুমন বনিক বললেন, এই পুরস্কার ‘লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশনায় তার দায়বদ্ধতা বেড়ে গেলো। আকমল হোসেন নিপু বললেন, ‘ভিন্ন কথা। তাঁর ভাষ্যে আমি কি সত্যি সত্যি এই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য।’ একটা কথা এখানে বলা প্রয়োজন, পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে নিভৃতচারি নিপু ভাইয়ের উচ্চসিত প্রশংসা হয়েছে। এই প্রশংসা তার প্রাপ্য। যা শুনে খুবই ভালো লেগেছে।

একটি উৎসবকে পরিপূর্ণ করতে যা যা প্রয়োজন, তার সবই ছিলো আয়োজনে। সাহিত্য উৎসবের সন্ধ্যাকে উপভোগ্য করলো গানের দল ‘পিঞ্জিরা’। তাদের কন্ঠযাদুতে ছড়িয়েছে মুগ্ধতা।

উৎসবের দ্বিতীয় দিন সাহিত্যিকদের নিয়ে যাত্রা হলো প্রকৃতির কাছে, বড়লেখার মাধবকুন্ডে। ঝরনার জলধারার পাশে কবিতা, গান, আবৃত্তি আর কথামালায় প্রকৃতি ও শিল্প যেন একাকার হয়ে গেল। মনে হলো, সাহিত্য কেবল বইয়ের পাতায় থাকে না; কখনো সে ঝরনার জলে নামে, কখনো সবুজ পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তোলে, কখনো মানুষের হাত ধরে মানুষের কাছেই ফিরে আসে।

এ কথা দ্বিধাহীনভাবেই বলা যায় সুনীল শৈশব অনেকটা অসাধ্যকেই সাধন করেছেন। সাংস্কৃতিক বন্ধ্যাত্বের এই সময়ে নৈঃশব্দ্যের ভেতর তিনি যে শব্দের প্রদীপ জ্বালিয়েছেন, তার আলো হয়তো বহুদূর যাবে। কারণ শব্দ অমর-শব্দের শক্তি অফুরান, তার যাত্রা অনন্ত। সুনীলের মতো মানুষেরা আছেন বলেই আজও শব্দের ভেতর ভালোবাসা বেঁচে আছে, কবিতা বেঁচে আছে, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বেঁচে আছে।

ফিরে আসার সময় বার বার মনে হচ্ছিল, উৎসবের মঞ্চতো নীরব হয়েছে, আমরা ফিরছি গন্তব্যে। কিন্তু কিছু মুহূর্ত কি কখনো শেষ হয়? কিছু দেখা, কিছু কথা, কিছু সুরতো থেকে যায় হৃদয়ের গভীরে। ‘স্বনন সাহিত্য উৎসব’ও তেমনই এক স্মৃতি হয়ে থাকবে, যেখানে শব্দ মানুষকে কাছে এনেছে, কবিতা হৃদয় ছুঁয়েছে, আর সংস্কৃতি নতুন করে স্বপ্ন দেখতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

নৈঃশব্দ্যের ভেতর জন্ম নেওয়া সেই শব্দেরা হয়তো একদিন আরও দূরে পৌঁছাবে। আর আমরা শুনব, একটি শহর জেগে উঠছে, একটি সমাজ জেগে উঠছে, মানুষ আবার ফিরছে মানুষের কাছে!

আপনার মন্তব্য

আলোচিত