ডা. মু. সাঈদ এনাম

২১ মে, ২০২৬ ১১:০৭

যখন মৃত্যুর সব দায় চিকিৎসকের..

নিজের ব্যর্থতা, অসহায়ত্ব কিংবা অপরাধবোধকে আড়াল করতে মানুষ অনেক সময় প্রিয়জনের মৃত্যুর জন্য সৃষ্টিকর্তাকে দায়ী করে, আবার কেউ চিকিৎসককে দোষারোপ করে। অস্ট্রিয়ান মনোবিজ্ঞানী ও নিউরোলজিস্ট মনোবিজ্ঞানের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েড (Sigmund Freud) এর মতে, এরকম চিন্তা ভাবনা এক ধরনের 'সাইকোলজিক্যাল ডিফেন্স মেকানিজম' (Psychological Defense Mechanism) এর পর্যায়ে পড়ে।

হঠাৎ শোক, ক্ষতি, স্বজনের মৃত্যু কিংবা মানসিক আঘাত মানুষের মনের মধ্যে তীব্র অসহায়ত্ব তৈরি করে। তখন মন নিজেকে মানসিক কষ্ট থেকে রক্ষা করতে বাস্তবতার কঠিন অংশকে এড়িয়ে অন্য কারও ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করে। এ ধরনের আচরণকে ফ্রয়েডীয় পরিভাষায় প্রধানত Projection (প্রজেকশন) বলা হয়। কখনও কখনও এটি Displacement (ডিসপ্লেসমেন্ট)-এর কাছাকাছি হলেও, মূলত নিজের অসহায়ত্বের দায় অন্যকে আরোপ করার প্রক্রিয়াটি Projection-এর অন্তর্গত।

পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে অনেক সময় যথাযথ উত্তর দিতে না পারলে আমরা আমাদের প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা স্বীকার না করে বলি, “প্রশ্ন সিলেবাসের বাইরে এসেছে” বা “প্রশ্ন কঠিন হয়েছে”। এটি ফ্রয়েডীয় ডিফেন্স মেকানিজমের ‘Rationalization’ (যুক্তিকরণ) নিজের ব্যর্থতাকে গ্রহণযোগ্য অজুহাতে ঢেকে দেওয়া।

একইভাবে রোগীকে দেরিতে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া, চিকিৎসকের পরামর্শ না মানা, চিকিৎসায় গাফিলতি ইত্যাদির দায় অনেক সময় আমরা নিতে চাই না; বরং অজুহাত তৈরি করে দায় চাপাই চিকিৎসক বা নার্সের ওপর। এটিও Rationalization-এর উদাহরণ।

এমনকি সাধারণ দৈনন্দিন জীবনেও এই প্রতিরক্ষা কৌশলগুলো প্রায়শই দেখা যায়। যেমন, আমাদের সমাজে একটি মজার প্রবাদ আছে “নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা”। অর্থাৎ, নিজের নাচ না জানার ব্যর্থতা স্বীকার না করে উঠোনকে দোষ দেওয়া। ঠিক এটিই মনোবিজ্ঞানী ও নিউরোলজিস্ট ফ্রয়েড (Freud) এর Denial ও Rationalization-এর মিশ্রণ: বাস্তবতা (নাচ না জানা) অস্বীকার করে বাহ্যিক বাধা (বাঁকা উঠোন) দিয়ে ব্যাখ্যা করা।
আরেকটি ক্লাসিক উদাহরণ হলো Displacement (ডিসপ্লেসমেন্ট) বা ক্ষোভ স্থানান্তর। কল্পনা করুন, সকালে গিন্নির কাছে পরাভূত হয়ে অফিসে এসে নিরীহ চাপরাশিকে অকারণে বকাঝকা করলেন। বেচারা হয়তো এখনো বুঝতেই পারেনি তার অপরাধটা কী!

অথবা প্রেমিকার কাছে কোনো বিষয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ঘরে ফিরে ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে পাওয়া তার সেই “অমূল্য স্মৃতিচিহ্ন”আগাছা-পরগাছা রঙিন কাগজ দিয়ে বানানো নিরীহ শো-পিসগুলো একে একে চুরমার করে ফেললেন। যেন শো-পিসগুলোই বিচ্ছেদের মূল ষড়যন্ত্রকারী!

এখানে মূল রাগের উৎস অন্য জায়গায় গিন্নী বা বান্ধবী, কিন্তু ক্ষোভ ঝাড়া হচ্ছে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও দুর্বল বস্তুর ওপর। মনোবিজ্ঞানে এটিই ডিসপ্লেসমেন্ট (Displacement)

সত্য মেনে নেওয়া যে সবকিছু সব সময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে নয় তা অনেকের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে। তখন কারও কাছে সৃষ্টিকর্তা, কারও কাছে চিকিৎসক, কিংবা কারও কাছে ভাগ্য হয়ে ওঠে ক্ষোভ প্রকাশের লক্ষ্যবস্তু।

শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে শোক মানুষকে ভেঙে দেয়, আর ভেঙে পড়া মানুষ অনেক সময় যুক্তির চেয়ে আবেগের ভাষাতেই বেশি কথা বলে। কিন্তু সেই আবেগ যদি ক্রমাগত ভুল তথ্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার কিংবা দায় এড়ানোর কৌশলের সঙ্গে মিশে যায়, তখন তা শুধু একজন চিকিৎসককেই আঘাত করে না; ধীরে ধীরে পুরো চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকেও ক্ষয় করতে থাকে।

চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্ক মূলত বিশ্বাসের সম্পর্ক। সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরলে ক্ষতিগ্রস্ত হন দু’পক্ষই—চিকিৎসক হারান কাজের নিরাপত্তা ও মানসিক স্বস্তি, আর রোগী হারান নির্ভরতার জায়গা। তাই শোকের ভাষা হোক সহমর্মিতার, অভিযোগের পথ হোক তথ্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে; কারণ অবিশ্বাসের আগুন একসময় এমন জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে ক্ষতি হয় পুরো সমাজের।

  • ডা. মু. সাঈদ এনাম: সহযোগী অধ্যাপক (সাইকিয়াট্রি), সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ; ইন্টারন্যাশনাল ফেলো, আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত