সিলেটটুডে ডেস্ক

২১ মে, ২০২৬ ০৯:১৩

পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১.২০ থেকে দেড় টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব

পাইকারি পর্যায়ে ক্রমবর্ধমান ঘাটতি কমাতে বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত (১৭-২১ শতাংশ) বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।

পিডিবির প্রস্তাবিত বৃদ্ধি অনুযায়ী প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় পাইকারি দাম হবে ৮ টাকা ২৪ পয়সা থেকে ৮ টাকা ৫৪ পয়সা। বর্তমানে পাইকারি ইউনিটপ্রতি গড় মূল্যহার ৭ টাকা ০৪ পয়সা।

বুধবার (২০ মে) ঢাকার ফার্মগেটে কেআইবি মিলনায়তনে পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি করে বিইআরসি। একই দিনে বিদ্যুতের সঞ্চালন খরচ বাড়ানোর জন্য পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিসিবি) প্রস্তাবের ওপরও গণশুনানি হয়।

পিজিসিবির বর্তমান গড় সঞ্চালন চার্জ প্রতি ইউনিটে শূন্য দশমিক ৩০৯৬ টাকা থেকে ১৮ পয়সা বাড়িয়ে শূন্য দশমিক ৪৯৫৫ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে পিজিসিবি। কমিশনের কারিগরি কমিটি প্রতি ইউনিটে ১৩ পয়সা দাম বাড়িয়ে ইউনিটপ্রতি সঞ্চালন চার্জ শূন্য দশমিক ৪৪৮১ টাকা করার সুপারিশ করেছে।

মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবে পিডিবি দাবি করে, বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় অন্যান্য দামি জ্বালানির ব্যবহার বেড়েছে। বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ করা গ্যাসের দামও বেড়েছে। এইচএফওর মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে। আমদানি করা কয়লার দাম বেড়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে। বিতরণ পর্যায়ে বিদ্যুতের ব্যবহারের অনুপাত পরিবর্তন হওয়ায় গড় পাইকারি মূল্য শূন্য দশমিক ০৫ টাকা কমেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিলে ইউনিটপ্রতি ১৫ পয়সা হারে স্থানান্তরকে উৎপাদন ব্যয় হিসাবে ধরা হয়েছে।

পিডিবির প্রস্তাবে আরও দাবি করা হয়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয়-ব্যয়ের ঘাটতি ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এই হিসাবে পাইকারি বিদ্যুতের গড় সরবরাহ মূল্য হবে ১৩ টাকা ০৯ পয়সা। বর্তমান পাইকারি মূল্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ঘাটতি হিসাব করা হয়েছে ৬৫ হাজার ৫৫৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

পিডিবির প্রস্তাবে বলা হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয় বাবদ মোট ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা রাজস্ব চাহিদার বিবেচনায় প্রতি ইউনিট গড় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যয় ১২ দশমিক ৯১ টাকা অনুযায়ী পাইকারি মূল্য নির্ধারণ করা হলে কোনো ঘাটতি থাকবে না। তবে ‘ভারিত গড় পাইকারি মূল্য’ ইউনিটপ্রতি ১ দশমিক ২০ টাকা বাড়ালে ঘাটতি ১৩ হাজার ২৯৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা কমবে। একইভাবে ইউনিটপ্রতি ১ দশমিক ৫০ টাকা বাড়ালে ঘাটতি ১৬ হাজার ৬২২ কোটি ৭০ লাখ টাকা কমবে। সে বিবেচনায় পাইকারি মূল্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

অবশ্য বিইআরসির কারিগরি কমিটির মূল্যায়নে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পিডিবির নিট রাজস্ব চাহিদা ইউনিটপ্রতি ১২ টাকা ৫১ পয়সা। বর্তমানে প্রতি ইউনিটের গড় পাইকারি মূল্য ৭ টাকা ০৪ পয়সা বিবেচনায় ঘাটতি ৫ টাকা ৪৭ পয়সা। প্রতি ইউনিটে ৭৭ দশমিক ৭০ শতাংশ ঘাটতি থাকলেও সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ বিবেচনায় পাইকারি মূল্যহার সমন্বয় করা যেতে পারে।

বিদ্যমান আবাসিক (এলটি-এ) ট্যারিফের দ্বিতীয় ধাপের (৭৬-২০০ ইউনিট) পরিবর্তে (০-২০০) ইউনিট দ্বারা প্রতিস্থাপন করলে খুচরা পর্যায়ে বিতরণ সংস্থার আয় প্রায় ২ হাজার ৬৫৭ কোটি ১২ লাখ টাকা বাড়বে। এর মাধ্যমে পাইকারিতে প্রতি ইউনিটে প্রায় শূন্য দশমিক ২৭ টাকা ট্যারিফ সমন্বয় করা যাবে।

বৃহত্তর ঢাকাসহ পল্লী বিদ্যুতের শহরাঞ্চলের ২১টি সমিতিতে ডেসকো ও ডিপিসির মতো মূল্য নির্ধারণ করলে ভর্তুকি কিছুটা কমবে।

আয়-ব্যয়ের ঘাটতি কমাতে পাইকারি মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি আরও যেসব প্রস্তাব দিয়েছে বিপিডিবি— গড় পাইকারি মূল্য ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর গড় বিক্রয়মূল্যের মধ্যে লাভের মার্জিন ১ টাকা ১০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৯৪ পয়সা পর্যন্ত। পল্লী বিদ্যুতের ৮০টি সমিতির মধ্যে শহরকেন্দ্রিক ২১টি সমিতিতে বিদ্যুতের ব্যবহার ৪৫ শতাংশ। এই ২১টি সমিতির গ্রাহক মিশ্রণ ডেসকো-ডিপিডিসির গ্রাহক মিশ্রণের সমতুল্য। এই ২১টি সমিতির বিদ্যুতের গড় খুচরা মূল্য ৯ টাকা ৩৬ পয়সা, যেখানে অন্য ৫৯টি সমিতির গড় বিলিং রেট ৭ টাকা ৭৭ পয়সা। এসব দিক বিবেচনায় এই ২১টি সমিতিকে দেওয়া বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য বর্তমান ভর্তুকি রেট থেকে বাড়িয়ে ডেসকো-ডিপিডিসির পর্যায়ে নিয়ে এলে সার্বিক ভর্তুকি কিছুটা হলেও কমবে।

পল্লী বিদ্যুৎ, ডেসকো ও ডিপিডিসির আওতাধীন ১৩২ কেভির বেশি ভোল্টেজের গ্রাহকদের সরাসরি বিদ্যুৎ দিতে চায় পিডিবি। এতে সরকার প্রতি মেগাওয়াট বিদ্যুতে ২ কোটি টাকা হারে ভর্তুকি কমাতে পারবে বলে দাবি প্রতিষ্ঠানটির।

বর্তমানে পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন ১৯টি সংযোগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, যেখানে ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে। পল্লী বিদ্যুতের মাধ্যমে চালু করলে বছরে ৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। কিন্তু এই সংযোগগুলো পিডিবির মাধ্যমে দিলে এই ভর্তুকি যাবে না। একই প্রক্রিয়ায় পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৪ থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা তৈরি হবে।

এদিকে, পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম শুনানিতে অংশ নিয়ে পাইকারি বিদ্যুতে ৩ শতাংশ সিস্টেম লস বিবেচনায় আনার দাবি জানান। পাশাপাশি বিদ্যমান ৪ শতাংশ হারে উৎসে কর মওকুফ করেও ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমিয়ে আনা যায় বলে প্রস্তাব দেন তিনি।

গণশুনানিতে অংশ নেননি কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম। তবে তার পক্ষে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক সৈয়দ মিজানুর রহমান শুনানিতে অংশ নিয়ে মূল্যবৃদ্ধির তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করা হলে বিইআরসি ‘গণশত্রুতে’ পরিণত হবে। অতীতে আইনের দোহাই দিয়ে সবচেয়ে বেশি বেআইনি কাজ করা হয়েছে এবং এতে বিইআরসি সহায়তা করেছে। এখনো কমিশনের সতর্ক হওয়ার সময় আছে। বিইআরসিকে দেশের স্বার্থে কাজ করতে হবে। ৫ আগস্টের পর দেশে অনেক কিছু পরিবর্তন হলেও বিইআরসিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন মিয়া বলেন, বর্তমানে দেশের রপ্তানি খাত নিম্নমুখী অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে শিল্প খাত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারাবে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে এবং ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। তাই মূল্যবৃদ্ধির কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বিপিডিবির মূল্যবৃদ্ধির সুপারিশে জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করা হয়নি। এ জন্য এই গণশুনানি বাতিল করতে হবে।

এর আগে সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল। এর পর থেকে বিভিন্ন কারণে ব্যয় বাড়লেও আর দাম সমন্বয় করা হয়নি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত