সিলেটটুডে ডেস্ক

১৩ জুলাই, ২০২৬ ২২:৪৬

মহাকাশের মিষ্টি রহস্য: মিল্কিওয়ের মেঘে মিলল ফলমূলের চিনি!

ছবি: সয়েন্টিফিক আমেরিকা

মহাবিশ্বের অসীম শূন্যতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কত শত রহস্য। তার কতটুকুই বা আমরা জানি? তবে এবার বিজ্ঞানীরা মহাকাশের এক অদ্ভুত ও মিষ্টি রহস্যের জট খুলেছেন। প্রথমবারের মতো আন্তঃনাক্ষত্রিক গভীর মহাকাশে সন্ধান মিলেছে চিনিজাতীয় অণুর।

আমাদের অতি পরিচিত রাস্পবেরি, কিউই কিংবা লাল রঙের মিষ্টি ফলে যে ‘এরিথ্রুলোজ’ (Erythrulose) নামের প্রাকৃতিক চিনি পাওয়া যায়, ঠিক সেই চিনিই এবার ভেসে বেড়াতে দেখা গেছে আমাদেরই ছায়াপথ ‘মিল্কিওয়ে’র হৃদপিণ্ডের কাছাকাছি এক বিশাল ধূলিকণার মেঘে! বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’-তে প্রকাশিত এই যুগান্তকারী আবিষ্কার মহাবিশ্বে জীবনের উৎপত্তি ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণায় এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।

২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরের ‘মিষ্টি’ কারখানা
সম্প্রতি ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকা’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পৃথিবী থেকে প্রায় ২৬ হাজার ৭৪৫ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত G+ 0.693-0.027 নামের একটি বিশাল আণবিক মেঘে এই চিনির অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছে।

মহাকাশের এই আণবিক মেঘগুলোকে বিজ্ঞানীরা বর্ণনা করছেন একেকটি বিশাল ‘রাসায়নিক কারখানা’ হিসেবে। গবেষণার প্রধান লেখক এবং স্পেনের সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোবায়োলজির জ্যোতিরসায়নবিদ ইজাসকুন জিমেনেজ-সেরা জানান, এই মেঘগুলোর ভেতরেই মূলত নতুন নতুন নক্ষত্র এবং গ্রহের জন্ম হয়। এই জন্মপ্রক্রিয়ার সমান্তরালেই সেখানে তৈরি হয় নানা জটিল রাসায়নিক যৌগ।

ঘন ধূলিকণাগুলো মহাজাগতিক পরমাণু ও অণুগুলোকে কাছাকাছি এসে জমাট বাঁধার সুযোগ করে দেয়। একই সঙ্গে এই ধূলিকণার চাদরটি মহাকাশের অতিবেগুনি রশ্মি ও উচ্চশক্তির ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে বাঁচিয়ে রাখে অণুগুলোকে। ফলে চিনির মতো অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং সংবেদনশীল যৌগও মহাশূন্যের বৈরী পরিবেশে দিব্যি টিকে থাকতে পারে।

মহাজাগতিক ‘বারকোড’ ও অভিনব প্রযুক্তি
এত দূরে অবস্থিত মহাজাগতিক ধূলিকণার আড়ালে লুকিয়ে থাকা চিনির খোঁজ পাওয়া মোটেও সহজ ছিল না। এই অসাধ্য সাধনের জন্য গবেষকেরা স্পেনের দুটি শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপ— ‘ইয়েবেস ৪০ মিটার’ এবং ‘আইরাম ৩০ মিটার’ ব্যবহার করেছেন। এই দূরবীক্ষণ যন্ত্রগুলো ধূলিকণার ঘন স্তর ভেদ করে মহাকাশের রেডিও সংকেত সংগ্রহ করতে পারে। প্রতিটি অণুরই নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র রেডিও সংকেত বা ‘ডিজিটাল বারকোড’ থাকে, যা দেখে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন সেখানে ঠিক কী ধরনের পদার্থ রয়েছে।

তবে আসল চ্যালেঞ্জটি ছিল পরীক্ষাগারে। তরল ও আঠালো প্রকৃতির হওয়ায় পৃথিবীতে ল্যাবরেটরির ভেতরে এই চিনির সুনির্দিষ্ট সংকেত বা সিগনেচার তৈরি করা যাচ্ছিল না। অবশেষে বিজ্ঞানীরা এক অভিনব প্রযুক্তি বের করলেন। তারা ট্যালকম পাউডারের সঙ্গে এই চিনি মিশিয়ে প্রথমে কঠিন অবস্থায় রূপান্তর করেন, তারপর লেজারের সাহায্যে সেটিকে বাষ্পে পরিণত করে এরিথ্রুলোজের প্রকৃত সংকেতটি নির্ধারণ করেন। এরপর সেই সংকেতের সঙ্গে মহাকাশ থেকে পাওয়া তথ্য মেলাতেই নিশ্চিত হওয়া যায়—মহাকাশে সত্যিই ভেসে বেড়াচ্ছে ফলের মিষ্টি চিনি!

রসায়নের এক উল্টো ধাঁধা
সাধারণত রসায়নের নিয়ম অনুযায়ী ধারণা করা হয়েছিল, তিন-কার্বনবিশিষ্ট সহজ চিনি থেকে ধাপে ধাপে জটিল চার-কার্বনবিশিষ্ট এই ‘এরিথ্রুলোজ’ তৈরি হয়েছে। কিন্তু মহাকাশের এই মেঘে পরীক্ষা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে দেখলেন, সেখানে তিন-কার্বনের চিনির উপস্থিতি খুবই কম!

তাহলে এই চিনি তৈরি হলো কীভাবে? গবেষকদের ধারণা, দুই-কার্বনবিশিষ্ট ‘গ্লাইকোলঅ্যালডিহাইড’ এবং ‘ইথিলিন গ্লাইকোল’ নামের দুটি সহজ অণু মহাশূন্যে নিজেদের মধ্যে বিক্রিয়া করে সরাসরি এই এরিথ্রুলোজে রূপ নিয়েছে। প্রকৃতি যে বিজ্ঞানীদের হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ও চমকপ্রদ, এই ঘটনা তারই প্রমাণ।

তবে কি আমরা মহাবিশ্বে একা নই?
মহাকাশে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০টিরও বেশি অণু শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা, যার বেশির ভাগই মানুষের জন্য তীব্র বিষাক্ত। কিন্তু ধীরে ধীরে এমন সব জটিল জৈব যৌগের সন্ধান মিলছে, যেগুলো প্রাণ সৃষ্টির মূল ভিত্তি বা ডিএনএ-আরএনএ তৈরির পূর্বসূরি।

নক্ষত্র ও গ্রহের জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত এই মহাজাগতিক আণবিক মেঘগুলোতে যদি প্রাকৃতিকভাবেই জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক উপাদান বা শর্করা তৈরি হতে পারে, তবে তা এক বিরাট ইঙ্গিত বহন করে। তা হলো—জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ কেবল আমাদের পৃথিবীতেই তৈরি হয়নি, বরং তা ছড়িয়ে আছে পুরো মহাবিশ্বের আনাচে-কানাচে। আজ থেকে কোটি বছর পর হয়তো এই চিনির মেঘগুলো থেকে জন্ম নেওয়া কোনো নতুন গ্রহেও স্পন্দিত হবে প্রাণের নতুন কোনো রূপ!

আপনার মন্তব্য

আলোচিত