বিন্দু তালুকদার, সুনামগঞ্জ

০৩ মার্চ, ২০২৬ ১৯:০৪

সুনামগঞ্জে এক জমিতেই ৫১ জাতের ধান চাষ

হাওরে ‘রাইস মিউজিয়াম’

বোরো ফসলের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের বোরো চাষীদের জন্য জেলায় এই প্রথম স্থাপন করা হয়েছে ‘রাইস মিউজিয়াম’।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইউস্টিটিউট (ব্রি’র) সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের উদ্যোগে ব্রি’র এলএসটিডি প্রকল্পের অর্থায়নে শান্তিগঞ্জ উপজেলার সাংহাই হাওরপাড়ের উজানীগাঁও গ্রামের কাছে ৫১টি জাতের ধানের চারা রোপন করে এই ‘মিউজিয়াম’টি করা হয়েছে।

একই জমিতে ৫১ টি জাতের ধান চাষের খবর পেয়ে প্রতিদিনই ‘রাইস মিউজিয়াম’ দেখতে আসছেন এলাকার কৃষকরা। ব্রি’র সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের প্রধান কর্মকর্তা বলেছেন, ধানের বৈচিত্র সম্পর্কে কৃষকদেরকে ধারনা দেওয়ার জন্য এই ‘রাইস মিউজিয়াম’ করা হয়েছে। এতে কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালকও জানিয়েছেন, এই রাইস মিউজিয়ামের মাধ্যমে হাওরে চাষের উপযোগি ধানের বিষয়ে কৃষকরা জানতে পারবেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জের ছোট-বড় ১৩৭ টি হাওরে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫০৫ হেক্টর বোরো জমি রয়েছে। এসব হাওরে প্রতি বছর প্রায় ১৪ লাখ মে. টন বোরো ধান উৎপাদন হয়ে থাকে। যার বাজার মূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। জেলায় কৃষক রয়েছেন প্রায় ১০ লাখ। কিন্তু নতুন ও উন্নত জাতের অনেক ধানের নাম জানেন না কৃষকরা।

ব্রি’র সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের দাবি- বোরো ধানের বৈচিত্র সম্পর্কে কৃষকদের ধারনা দেওয়ার জন্য ৮ শতক জমিতে পাশাপাশি ৫১ টি জাতের ধান চাষ করে রাইস মিউজিয়ামটি করা হয়েছে। গেল ২২ জানুয়ারি উজানীগাঁও গ্রামের কাছে করা রাইস মিউজিয়ামের প্রতিটি জাতের ধানের পাশে খুঁটি পুঁতে স্টিকার (নাম লিখে) দেওয়া হয়েছে কৃষকদের সুবিধার জন্য। মিউজিয়ামে বাশমতি টাইপের ব্রি ধান-১০৪, উচ্চমাত্রার জিংক সমৃদ্ধ লম্বা ও চিকন টাইপের ব্রি ধান-১০২, লম্বা ও চিকন জিরা টাইপের ব্রি ধান-১০৮, সল্প জীবনকালের ব্রি ধান-৮৮সহ উচ্চফলনশীল জাতসহ নানা ধান রোপন করা হয়েছে।

উজানীগাঁও গ্রামের কৃষক আব্দুর রহিম ও রাজু মিয়া বলেন,‘ বাপ-দাদার আমল থেকেই আমরা কয়েকটা জাতের ধানের নাম শুনে ও দেখে আসছি। এই প্রথম ব্রি অফিসের মাধ্যমে এক সাথে ৫১ টা জাতের ধানের চারা দেখলাম। এসব ধানের নাম আগে কখনও শুনিনি। এইবার আমরা দেখব কোন জাতের ধান খরায় নষ্ট হয় না, রোগ বালাই কম হয়, পোকা-মাকড়ের উপদ্রব কম ও কোন ধানটি বেশি ফলে। তারপর আগামী বছরে ওই ভাল জাতগুলো চাষ করব।’ প্রতিদিনই কৃষকরা রাইস মিউজিয়াম দেখতে আসেন বলে জানান তারা।

রাইস মিউজিয়াম দেখতে আসা সুলতানপুর গ্রামের কৃষক মো. আব্দুল মতিন বলেন,‘্ একটা জমিতেই অনেক জাতের ধান লাগানো হয়েছে শুনে এটা দেখতে এসেছিলাম। দেখলাম চিকন, মোটা ও উন্নত জাতের অনেক ধান লাগানো হয়েছে। জাত চিনতে কৃষকদের সুবিধার জন্য সব ধানের পাশে ধানের নাম লেখা রয়েছে। বৈশাখে আবার এসে দেখব কোন জাতের ধান আগে পাকে, কোনটির ফলন বেশি। তারপর চেষ্টা করব এসব ধান নিজে চাষ করতে। ’

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন,‘ শুনেছি ব্রি’র উদ্যোগে শান্তিগঞ্জের সাংহাই হাওরের পাড়ে রাইস মিউজিয়াম করা হয়েছে। কোন জাতের ধানগুলো বোরো মওসুমে হাওরে চাষাবাদের উপযোগি, হাওরের পরিবেশের সাথে কোনটি মানানসই তা জানা যাবে। এতে কৃষকদের সুবিধা হবে, কৃষকরা অনেকগুলো ধানের জাত সম্পর্কে জানতে পারবেন। ’

ব্রি’র সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রধান ড. মো. রেজওয়ান ভূঁইয়া বলেন,‘ ব্রি’র উদ্ভাবিত ও প্রচলিত জাতের বোরো ধানের বিষয়ে কৃষকদের ধারনা দেওয়ার জন্য এই রাইস মিউজিয়ামটি করা হয়েছে। কারণ কৃষকরা সাধারণ ৫-৭ জাতের ধান চাষ করে থাকেন। ব্রি’র উদ্ভাবন করা বিভিন্ন বৈশিষ্টের, বিভিন্ন গুণের, বিভিন্ন জাতের ধান তারা দেখতে পান না ও জানতে পারেন না। ধানের বৈচিত্র সম্পর্কে ধারনা দেওয়ার জন্য একটি জমিতে এক সাথে ৫১ টি জাত রোপন করা হয়েছে। এতে কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়েছে, কৃষকরা প্রতিদিনই মিউজিয়ামটি দেখছেন। ’

আপনার মন্তব্য

আলোচিত