২৬ জুলাই, ২০২৬ ০৬:২৯
ছবি: সংগৃহীত
যে দাবির ওপর ভর করে নব্বইয়ের দশকে রাজপথে ছাত্রনেতা হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উঠে এসেছিলেন, ঠিক তিন দশক পর সেই একই অপরাধের দায়ে মন্ত্রীত্বের পদ ছাড়তে হলো তাঁকে। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগে দেশজুড়ে প্রবল আন্দোলনের মুখে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। আর এর মধ্য দিয়েই ওডিশা থেকে দিল্লির রাজপথ কাঁপানো এই প্রভাবশালী বিজেপি নেতার রাজনীতিতে নেমে এল এক চরম বিদ্রূপাত্মক অধ্যায়।
১৯৯৬ সালে ওডিশা কাউন্সিল অব হায়ার সেকেন্ডারি এডুকেশনের দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তৎকালীন কংগ্রেস সরকারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন তিনি। সে সময় তিনি আরএসএসের ছাত্রসংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) ওডিশা রাজ্য সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে ১৯৯৫ সালে এবিভিপির জাতীয় সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে যে প্রশ্নপত্র ফাঁস আন্দোলন তাঁর উত্থানের পথ তৈরি করেছিল, প্রায় তিন দশক পর সেই একই ইস্যু তার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্বের অবসান ঘটাল।
১৯৬৯ সালের ২৬ জুন ওডিশার তালচেরে জন্মগ্রহণ করেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। তার বাবা দেবেন্দ্র প্রধান ছিলেন ওডিশার একজন প্রভাবশালী বিজেপি নেতা এবং অটল বিহারি বাজপেয়ি সরকারের মন্ত্রী। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের উত্থানের পেছনে পারিবারিক পরিচয়ের চেয়ে বেশি ভূমিকা ছিল তার আরএসএস-সংযোগ ও সাংগঠনিক দক্ষতা।
তিনি তালচের কলেজে নৃবিজ্ঞানে পড়ার সময় আশির দশকের মাঝামাঝি এবিভিপিতে যোগ দেন। পরে ভুবনেশ্বরের উৎকল বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর পড়ার সময় ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তবে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল পরাজয় দিয়ে। উৎকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সভাপতির পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি হেরে যান। সে সময় তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (এসএফআই) নেতা অরুণ কুমার সাহু, যিনি পরে বিজু জনতা দলের (বিজেডি) নেতা ও ওডিশার শিক্ষামন্ত্রী হন।
অরুণ কুমার সাহুর ভাষ্য অনুযায়ী, তালচের কলেজে ছাত্রজীবনে ধর্মেন্দ্র প্রধান একবার কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠান বাধাগ্রস্ত করতে গিয়ে অন্য শিক্ষার্থীদের হাতে মারও খেয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি যে ছবিগুলো ভাইরাল হয়েছে, সেগুলো সেই ঘটনারই বলে দাবি করেন তিনি।
ধর্মেন্দ্র প্রধান শৈশবে আরএসএসের শাখায় যাওয়া শুরু করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুবেন ব্যানার্জির মতে, আরএসএসের নেতারাই পরে তার বাবা দেবেন্দ্র প্রধানকে বিজেপিতে যোগ দিতে উৎসাহিত করেন। ফলে অনেকের ধারণার বিপরীতে, বাবার কারণে নয়; বরং ছেলের আরএসএস-সংযোগের কারণেই দেবেন্দ্র প্রধানের বিজেপিতে যোগ দেওয়া হয়েছিল।
১৯৯৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগ দেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। এর আগেই তিনি ১৯৯৩ সালে এবিভিপির ওডিশা রাজ্য সম্পাদক এবং ১৯৯৫ সালে জাতীয় সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
২০০০ সালে ওডিশা বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০০১ সালে বিজেপি যুবমোর্চার ওডিশা সভাপতি এবং ২০০২ সালে বিজেপির জাতীয় সম্পাদক হন। ২০০৪ সালে প্রথমবার লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি ভারতীয় জনতা যুবমোর্চার জাতীয় সভাপতির দায়িত্ব পান।
লোকসভা ও রাজ্যসভা—দুই কক্ষেই দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। ২০০৪ সালে লোকসভায় প্রবেশের পর তিনি পিটিশন কমিটি ও জ্বালানিসংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সদস্য হন। পরে জ্বালানিবিষয়ক স্থায়ী কমিটি, সরকারি প্রতিশ্রুতি কমিটি এবং টেলিকম লাইসেন্স ও স্পেকট্রাম বরাদ্দ তদন্তে গঠিত যৌথ সংসদীয় কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। এরপর ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সাম্বলপুর আসন থেকে জয়ী হয়ে আবার লোকসভায় ফেরেন।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির প্রথম মন্ত্রিসভায় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান ধর্মেন্দ্র প্রধান। পরে পূর্ণমন্ত্রী হন। ২০১৭ সালে তার হাতে দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও দেওয়া হয়। ২০১৯ সালে মোদি সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি পেট্রোলিয়াম, প্রাকৃতিক গ্যাস ও ইস্পাত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ সালের জুলাইয়ে বড় ধরনের মন্ত্রিসভা রদবদলে তাকে শিক্ষামন্ত্রী করা হয়। এরপর ২০২৪ সালের জুনে তৃতীয় মোদি সরকারের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পান। দীর্ঘ সময় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করায় তাকে অনেকে ‘উজ্জ্বলা ম্যান’ নামে অভিহিত করতেন। প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনার সফল বাস্তবায়নের কৃতিত্বও তার ঝুলিতে যোগ হয়েছিল।
শুধু মন্ত্রী হিসেবেই নয়, নির্বাচনী কৌশলবিদ হিসেবেও বিজেপির অন্যতম নির্ভরযোগ্য নেতা ছিলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখন্ড, ঝাড়খন্ড, হরিয়ানা, বিহার, পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনে দলের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০২২ সালের উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে বিজেপির বড় জয়ের পেছনে তার সাংগঠনিক দক্ষতার কথা দলীয় নেতারাই উল্লেখ করেছেন।
পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রামে ২০২১ সালের নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারীর হয়ে প্রচারের দায়িত্বও ছিল তার ওপর। যদিও রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠন করতে পারেনি, তবু তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নন্দীগ্রামে পরাজিত করতে ভূমিকা রাখার জন্য তার প্রশংসা করা হয়। তবে কর্ণাটক ও মধ্যপ্রদেশের কয়েকটি নির্বাচনে তিনি প্রত্যাশিত ফল এনে দিতে পারেননি।
দীর্ঘদিন ধরে ওডিশায় বিজেপির সাংগঠনিক বিস্তারের অন্যতম কারিগর হিসেবে বিবেচিত হন ধর্মেন্দ্র প্রধান। ২০০৯ সালে বিজেপি-বিজেডি জোট ভেঙে যাওয়ার পর দল যখন সাংগঠনিক সংকটে পড়ে, তখন তিনি রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে সংগঠন পুনর্গঠনে মনোযোগ দেন।
দলীয় নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওডিশার প্রায় প্রতিটি জেলায় তার নিজস্ব সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক রয়েছে। ২০২৪ সালে রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্যকে তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে অনেকে ধারণা করেছিলেন, বিজেপি সরকার গঠন করলে ধর্মেন্দ্র প্রধানই মুখ্যমন্ত্রী হবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মোহন মাঝিকে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়। দলীয় সূত্রগুলোর মতে, লোকসভায় বিজেপির আসনসংখ্যা কমে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাকে দিল্লিতে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।
শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে একাধিক বিতর্কের মুখে পড়েন ধর্মেন্দ্র প্রধান। এনসিইআরটির পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নতুন বিধিমালা, বিভিন্ন নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে অভিযোগ এবং শেষ পর্যন্ত নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষা অনিয়ম—সব মিলিয়ে তার মন্ত্রণালয় ক্রমেই চাপে পড়ে।
নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার পর দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা পরীক্ষা বাতিল, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ, মামলা প্রত্যাহার এবং ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেন। সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাধিক আলোচনা করলেও ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের প্রশ্নে দীর্ঘদিন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। শেষ পর্যন্ত টানা বিক্ষোভের মুখে গতকাল শনিবার (২৫ জুলাই) তিনি পদত্যাগ করেন।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করলে সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হয়তো এখানেই—১৯৯৬ সালে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলন তাকে জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিতি এনে দিয়েছিল। প্রায় তিন দশক পর আরেকটি প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগই তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াল। একসময় ছাত্রদের নেতৃত্ব দিয়ে পরীক্ষার স্বচ্ছতার দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সেই ছাত্রসমাজের আন্দোলনের মুখেই শিক্ষামন্ত্রীর পদ ছাড়তে হলো তাকে।
ভারতের রাজনীতিতে ধর্মেন্দ্র প্রধান এখনো বিজেপির অন্যতম প্রভাবশালী সংগঠক ও নির্বাচনী কৌশলবিদ হিসেবে বিবেচিত। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসবিরোধী আন্দোলনের নায়ক থেকে একই ইস্যুতে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া শিক্ষামন্ত্রী—এই বৈপরীত্যই সম্ভবত তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় হয়ে থাকবে।
আপনার মন্তব্য