২৫ জুন, ২০১৬ ০০:২৯
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে ব্রিটিশ জনগণের রায়ের প্রভাব পড়েছে ইংল্যান্ডের রাজনীতিতে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এ ফলাফলের পর পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। কেবল ক্ষমতাসীন দলই নয় বিরোধীদলের অনেক নেতাই ছিলেন বিচ্ছেদের বিপক্ষে। ফলে বেশ বড় ধাক্কাই খেল ইংল্যান্ডের রাজনীতি।
ব্রিটিশ জনগণ পক্ষে-বিপক্ষে ভোট দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিক্রিয়ায় টের পাওয়া যায় তারা অনেকেই এমন ফলাফলের জন্যে মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। এদিকে, কেবল ইংল্যান্ডই নয় এ গণভোটের ফলাফলের পর এর প্রভাব পড়েছে ইইউ-জোটের অন্যান্য দেশেও। অনেক দেশের বেশ কিছু রাজনৈতিক নেতা তাদের নিজেদের দেশে এমন গণভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
এ তালিকায় বেশ উপরের দিকেই আছে ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, সুইডেন, ডেনমার্ক ও জার্মানি সহ বেশ কয়েকটি দেশ। ফলে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের ভোটে ব্রেক্সিটের পক্ষে রায় আসায় ইইউভুক্ত ফ্রান্সে গণভোট আয়োজনের দাবি জানিয়েছে ডানপন্থি দল ন্যাশনাল ফ্রন্ট। বেকারত্বের হার বৃদ্ধি, চোরাকারবারি, সন্ত্রাসী ও শরণার্থীদের রুখতে ব্যর্থতার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নকে দায়ী করে ফ্রান্সের ন্যাশনাল ফ্রন্ট নেতা মারিন লে পাঁ বলেছেন, ফ্রান্সেরও এখন এ জোটে থাকা না থাকার বিষয়টি বেছে নেওয়ার অধিকার আছে।
যুক্তরাজ্যের গণভোটের রায়কে স্বাগত জানিয়ে মারিন লে পাঁ একটি টুইট করেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘স্বাধীনতার জন্য জয় হয়েছে। যেমনটি আমি কয়েক বছর ধরে বলে আসছি। এখন ফ্রান্স এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য দেশগুলোতেও একই রকম করে গণভোট হওয়া প্রয়োজন।’
নেদারল্যান্ডসের ফ্রিডম পার্টির নেতা গ্রিট ওয়াইল্ডারস বলেন, “হুররে ব্রিটিশ! এখন আমাদের পালা। এখন সময় ডাচ গণভোটের।”
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আমরা নিজ দেশে পরিবর্তন চাই, নিজেদের অর্থ চাই, নিজেদের সীমান্ত চাই এবং নিজেদের অভিবাসন নীতি চাই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইইউ এ নেদারল্যান্ডসের সদস্যপদের ব্যাপারে ডাচ জনগণের রায় জানার সুযোগ পাওয়া উচিত।”
মার্চে নেদারল্যান্ডসে সাধারণ নির্বাচন হবে এবং জনমত জরিপে এগিয়ে আছেন ওয়াইল্ডারস। দেশটিতে সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে ৫৪ শতাংশ মানুষই ইইউয়ে থাকা না থাকা প্রশ্নে গণভোটের পক্ষে।
ইতালির অভিবাসনবিরোধী নর্দার্ন লিগের নেতা মাত্তেও সালভিনি ব্রেক্সিটের খবরে উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “হুররে মুক্ত নাগরিক হওয়ার সাহস! হৃদয়, মগজ এবং গৌরব পরাজিত করল মিথ্যা, হুমকি ও ব্ল্যাকমেইলকে।”
সুইডেনের অভিবাসনবিরোধী ডেমোক্র্যাটরা টুইটারে লিখেছে, “ আমরা এখন সুয়েক্সিটের অপেক্ষায়।”
ডেনমার্কে ‘ড্যানিশ পিপলস পার্টি’ নেতা ক্রিস্টিয়ান তুলেসেন বলেছেন, “গণভোট খুবই ভাল একটি গণতান্ত্রিক রীতি।”
জার্মানির ইউরোবিরোধী এএফডি পার্টির ব্রিয়াট্রিকস ফন স্টচ যুক্তরাজ্যের গণভোটকে গ্রেট ব্রিটেনের জন্য ‘স্বাধীনতা দিবস’ বলেছেন। তিনি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট মার্টিন শুলজ এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান জ্য ক্লদ জাঙ্কেরকে পদত্যাগের আহ্বান জানান। রাজনৈতিক জোট হিসাবে ইইউ ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে যুক্তরাজ্যের গণভোটের প্রভাবে ইইউ নাজুক অবস্থায় পড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট মার্টিন শুলজ। ইইউয়ের ‘খুবই ভাল’ প্রস্তুতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
মার্টিন শুলজ তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আমরা এই ফলাফলকে সম্মান জানাই। আমরা পরিষ্কার হলাম যুক্তরাজ্য তার নিজের পথে যাবে।”
তিনি আরো বলেন, “এখন আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে দায়িত্বশীল আচরণ করার সময়। ডেভিড ক্যামেরনের নিজের দেশের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে, ইইউ-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। আপনারা দেখছেন বাজারে স্টার্লিং-এর কী অবস্থা। আমি চাইনা একই বিষয় ইউরোর ক্ষেত্রেও ঘটুক।”
বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী চার্লস মিশেল মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন। তিনি বলেন, “ইইউ সদস্যদের অগ্রাধিকার এবং ইউরোপের নয়া ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আলোচনা করা প্রয়োজন।”
আইরিশ সরকার জানিয়েছে, “এই ফলাফল আয়ারল্যান্ড, ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলাফল বিষয়ে সরকার সকালে বৈঠক করবে। ওই বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী জনগণের উদ্দেশে বিবৃতি দেবেন।”
জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টেইনমেয়ারের কথায় হতাশাই ঝরে পড়েছে। তিনি বলেন, “ব্রিটেনের যে সংবাদ পেলাম তা সত্যিই গুরুতর। ইউরোপ এবং ব্রিটেনের জন্য দিনটি শোকের বলেই মনে হচ্ছে।”
জার্মানির ভাইস-চ্যান্সেলর সিগমার গ্যাব্রিয়েল সরাসরি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান, “ড্যাম! ইউরোপের জন্য একটি বাজে দিন।”
পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইটোল্ড ওয়াসজিকক্সি বলেন, “ব্রেক্সিট ব্রিটেন এবং ইউরোপের জন্য খারাপ খবর। ইইউ ধারণা পরিবর্তন প্রয়োজন, এ তারই নিদর্শন।”
এদিকে, যুক্তরাজ্যকে দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ত্যাগের আলোচনা শুরু করতে হবে বলে জানিয়ে দিয়েছেন নেতারা। দেরি হলে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হবে বলে মত দিয়েছেন তারা। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ইইউ ছাড়ার প্রক্রিয়াটি পরবর্তী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ওপর ছেড়ে দিতে চাইলেও এ নিয়ে অপেক্ষায় থাকতে রাজি নন ইউরোপীয় নেতারা।
যুক্তরাজ্যের গণভোটে ইউরোপের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এ জোটটির সঙ্গে ৪১ বছরের বন্ধন ছেঁড়ার পক্ষে রায় আসার পর হতাশ ইইউ নেতারা ‘স্থিতিশীলতা ও সংহতি’র আহ্বান জানিয়েছেন। সেইসঙ্গে ইইউ’র পরিবর্তন ও সংস্কারের কথাও বলেছেন।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান জেন ক্লদে জাঙ্কার জোর দিয়ে বলেছেন, “(যুক্তরাজ্য সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও) ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাকি ২৭ সদস্য রাষ্ট্র একসঙ্গে পথ চলবে।”
বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যে ইইউ-তে থাকা না থাকা নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৫২ শতাংশ ব্রিটিশ ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে এবং ৪৮ শতাংশ মানুষ ইইউ য়ে থাকার পক্ষে ভোট দেয়।
এরপরই পদত্যাগের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। তিনি যুক্তরাজ্যের ইইউ ত্যাগের প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়টি ছেড়ে দেন নতুন প্রধানমন্ত্রীর ওপর।
কিন্তু ইইউ নেতারা চান আলোচনা আগামী সপ্তাহেই শুরু হোক। অক্টোবরে নতুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে নারাজ তারা।
ব্রেক্সিটে বিশ্ব বাজারে বড় ধরনের ঝাঁকুনির প্রেক্ষাপটে শুক্রবার সংকটকালীন জরুরি আলোচনায় বসেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান জাঙ্কার, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট প্রেসিডেন্ট মার্টিন শুলজ, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক এবং ডাচ প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুটে।
পরে তাদের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে ব্রেক্সিটের জন্য দুঃখপ্রকাশ করার পাশাপাশি ব্রিটিশদের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানানো হয়। আর এ বিবৃতিতেই যুক্তরাজ্যকে যত দ্রুত সম্ভব জনগণের সিদ্ধান্ত কার্যকরের আহ্বান জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, “ইইউ ত্যাগের প্রক্রিয়া যত বেদনাদায়কই হোক না কেন, যুক্তরাজ্যের যত দ্রুত সম্ভব জনগণের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা উচিত। কারণ, এক্ষেত্রে কোনও ধরনের বিলম্ব অকারণে অনিশ্চয়তা বাড়াবে।”
নেতারা বলেন,“আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ সংক্রান্ত শর্তাবলী নিয়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে দ্রুত আলোচনা শুরু করতে প্রস্তুত।
শনিবার ইইউ-র প্রতিষ্ঠাতা ছয় সদস্য জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, বেলজিয়াম ও লুক্সেমবার্গ এর প্রতিনিধিরা বার্লিনে এক বৈঠকে বসবেন। এছাড়া, ভোট মূল্যায়নের জন্য আগামী মঙ্গলবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বিশেষ অধিবেশন বসবে।
ব্রেক্সিট ভোটের পর যুক্তরাজ্যের ইউকিপ নেতা নাইজেল ফারাজের মন্তব্য, “ইইউ মরতে বসেছে।” ব্রেক্সিটের পর বিশ্বজুড়ে শেয়ার বাজারে ধস নেমেছে। যুক্তরাজ্যের মুদ্রা পাউন্ডের দামও নাটকীয়ভাবে পড়ে গেছে।
আপনার মন্তব্য