০৩ নভেম্বর, ২০১৫ ১৫:২৫
নিজের ও বন্ধুদের উপর হামলার বিচার চান না বলে জানিয়েছেন প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুল।
টুটুল বলেন, 'বিচার আমি চাই না। কার কাছে চাইব?' শুধু পুলিশ দিয়ে জঙ্গিবাদ দমন করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন উগ্রবাদীদের হামলায় আহত এই প্রকাশক।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক সাক্ষাতকারে এসব কথা জানান টুটুল।
এরআগে হামলায় নিহত প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনের বাবা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকও ছেলে হত্যার বিচার চান না বলে জানিয়েছিলেন। একইভাবে গত ফেব্রুয়ারিতে খুন হওয়া অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী রাফিদা হোসেন বণ্যাও জানিয়েছেন, তিনি স্বামী হত্যার বিচার চান না।
সরকার ও প্রশাসনের প্রতি আস্থাহীনতা থেকে ভূক্তভোগীরা এমন মন্তব্য করছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গত শনিবার দুর্বত্তদের হামলায় খুন হন প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন। একইদিনে হামলায় গুরুতর আহত হন আরেক প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুল, ব্লগার রণদীপম বসু ও তারেক রহিম।
আজ প্রথম আলোতে প্রকাশিত সাক্ষাতকারে শুদ্ধস্বরের সত্ত্বাধিকারী টুটুল বলেন, অভিজিতের হত্যাকাণ্ডের পর ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের এক সমাবেশে আমাকে কিছু বলতে বলা হয়েছিল। আমি বলেছিলাম, হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই না। অভিজিৎকে যেখানে খুন করা হয়, সেখানে পুলিশ ছিল। আমি কার কাছে যাব? আমি শুধু বলেছিলাম, আমার যা করার আছে আমি তা-ই করব।
তিনি বলেন, অভিজিৎ রায়ের মৃত্যু, ওর বই প্রকাশের জন্য হত্যার হুমকি—এসব কিছু আমার জীবনটাকে অনেকটাই পাল্টে দিয়েছিল। আমি অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছিলাম নিজেকে। আমি বন্ধুবান্ধবের আড্ডায় খুব একটা সময় দিতে পারছিলাম না। কারও সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন হলে ফেসবুকে ইনবক্স করে ম্যাসেজ দিতাম। অন্যরাও একইভাবে যোগাযোগ করত আমার সঙ্গে। তবু ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে একটা কথা আছে না, আমার মনে হচ্ছিল কেউ একজন আমার ঘাড়ের ওপর শ্বাস ফেলছে। তারপর তো দেখলেনই। ৫ নভেম্বর হেমন্তের বইমেলা হওয়ার কথা। আমি, দীপন মানে আমরাই হেমন্তের বইমেলাটা চালু করেছিলাম। শনিবার বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে বলেছিলাম, বিকেলে শাহবাগে দীপনের ওখানে যাব। হেমন্তের বইমেলা নিয়ে কথাবার্তা বলতে হবে। কথা হলো না।
টুটুল বলেন, জিডি করার পর মোহাম্মদপুর থানা থেকে কয়েকবারই পুলিশ কিন্তু আমার অফিসে এসেছে। এমনকি ওরা যখন টহল দিত, তখনো আমার অফিস ঘুরে যেত। কিন্তু এভাবে তো চলতে পারে না, না? আমি একজন সাধারণ মানুষ। আমার স্ত্রী, সন্তান, স্বজন আছেন। আমি পথে হাঁটব, রিকশায় চড়ে ঘুরে বেড়াব। পুলিশ কি সারাক্ষণ আমার নিরাপত্তা দিতে পারবে? ঠিক যে জায়গাটায় এখন কাজ করা দরকার, সেই জায়গাটা তো কেউ ধরছে না।
পুলিশ দিয়ে জঙ্গিবাদ দমন করা যাবে না মন্তব্য করে এই প্রকাশক বলেন, আমার অফিসে এসে যখন কুড়ি-পঁচিশ বছর বয়সী যুবক মাথায় চাপাতির কোপ দেয়, তখন সে একটা বিশ্বাস নিয়ে কাজটা করেছে। আমরা কি তৃণমূলে মুক্তমতের ধারণা পৌঁছাতে পেরেছি? ওরা কিন্তু ঠিকই ওর বিশ্বাসের জায়গাটা গড়ে দিয়েছে, যেটা আমরা পারিনি। এভাবে শুধু পুলিশ দিয়ে কি জঙ্গিবাদ দমন করা যাবে? এটা আমাদের সবার ব্যর্থতা। আমরা সবাই ব্যর্থ হয়েছি।
আমাদের তো একটা হাজার বছরের পুরোনো ঐতিহ্য আছে। আমাদের একটা সংস্কৃতি আছে। বহুকাল আমরা পরাধীন ছিলাম। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন কিছু ভুল ছিল, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও কিছু ভুল হয়েছে, দীর্ঘদিন সামরিক শাসন ছিল। মাঝখানে বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের শাসনামল ছাড়া বাকি সময়টায় আমাদের সংস্কৃতিটাকে যে কীভাবে ধ্বংসের চেষ্টা হয়েছে! সেই সুযোগটাকেই জঙ্গিবাদের প্রসারে কাজে লাগানো হয়েছে। উচ্ছৃঙ্খলতা, অরাজকতার প্রসার হয়েছে। উন্নয়ন মানে তো শুধু দালান-কোঠা, শক্ত অবকাঠামো গড়া নয়। সুকুমার বৃত্তির বিকাশে কাজ করা। চোখের সামনে যেটাকে আমরা উন্নয়ন বলে ভাবছি, সেটা ভীষণ ফাঁপা, বলেন টুটুল।
এই দায় সকলের উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি ছাত্র আন্দোলনের কথাই বলেন, যা চলছে সেটাকে কী বলব? ছাত্র রাজনীতিতে এখন কারা আছে? এই দায় তো রাজনীতিবিদেরা অস্বীকার করতে পারেন না। শুধু সভা-সমাবেশে বক্তৃতা করলে আর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে কাগজ পত্রিকা অফিসে পাঠিয়ে দেওয়া কি রাজনীতি? আমি আমার ছোটবেলার কথা বলতে পারি। আমরা তখন বই পড়তাম বা সংস্কৃতির যে চর্চাটা ছিল, সেটা পরবর্তীতে পাল্টে গেল। ভোগবাদী, পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থায় এই চর্চাটা পিছিয়ে গেল। সংস্কৃতিকর্মীদের দায়িত্ব সংস্কৃতি বিকাশের দায়িত্বটা নেওয়া। আর অনুকূল পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব সরকারের।
হামলার পরও পিছু হটবে না জানিয়ে টুটুল বলেন, আমি পিছু হটব না। বই প্রকাশনার কাজটা আমি ব্যবসা হিসেবে নিইনি। আমার একটা দর্শন আছে। হাজার বছরের মুক্তবাক, মুক্তবুদ্ধি চর্চার যে ঐতিহ্য আছে বাংলাদেশের, সেটা বিকাশের কাজে কেউ আমাকে আটকাতে পারবে না।
আপনার মন্তব্য