সিলেটটুডে ডেস্ক

১৮ জানুয়ারি, ২০২২ ১৫:২৪

অমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট গুণিতক আকারে বাড়ার আশঙ্কা গবেষকদের

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্তদের ২০ শতাংশই বর্তমানে ওমিকন ভ্যারিয়েন্ট দ্বারা আক্রান্ত। তবে চলতি মাসে অমিক্রন আক্রান্তের সংখ্যা গুণিতক হারে বাড়ার আশঙ্কা করেছে গবেষকরা।

মঙ্গলবার (১৮ জানুয়ারি) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) জেনোম সিকোয়েন্সিং রিসার্চ প্রজেক্টের প্রধান পৃষ্ঠপোষক (সুপারভাইজার) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, কেভিড-১৯ এর জেনোম সিকোয়েন্সিং গবেষণার উদ্দেশ্য কেভিড-১১ এর জেনোমের চরিত্র উন্মোচন, মিউটেশনের ধরন এবং বৈশ্বিক কোভিড-১৯ ভাইরাসের জেনোমের সঙ্গে এর আন্তঃসম্পর্ক বের করা এবং বাংলাদেশি কোভিড-১৯ জেনোম ডাটাবেজ তৈরি করা। এ প্রতিবেদন বিএসএমএমইউ-এর চলমান গবেষণার ৬ (ছয়) মাস ১৫ (পনের) দিনের ফলাফল, আমরা আশা করি পরবর্তী সপ্তাহগুলােতে হালনাগাদকরা ফলাফল জানাতে পারব।

২৯ জুন ২০২১ থেকে ৮ জানুয়ারি ২০২২ পর্যন্ত কোভিড-১৯ আক্রান্ত সারা দেশব্যাপী রোগীদের ওপর এ গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণায় দেশের সব বিভাগের রিপ্রেজেন্টেটিভ স্যাম্পলিং করা হয়। গবেষণায় মোট ৭৬৯ কোভিড-১৯ পজিটিভ রোগীর ন্যাযযাফ্যারিনজিয়াল সোয়াব স্যাম্পল থেকে নেক্সট জেনারেশন সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে করোনাভাইরাসের জেনোম সিকোয়েন্সিং করা হয়।

বিএসএমএমইউ’র গবেষণায় ৯ মাস থেকে শুরু করে ৯০ বছরের বয়স পর্যন্ত রোগী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে ২১ থেকে ৫৮ বছর বয়সের রোগীদের সংখ্যা বেশি। যেহেতু কোনো বয়সসীমাকেই কোভিড ১৯-এর জন্য ইমিউন করছে না, সে হিসেবে শিশুদের মধ্যেও কোভিড সংক্রমণ রয়েছে।

গবেষণায় আরও পাওয়া গেছে, কোভিড আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে যাদের কো-মরবিডিটি রয়েছে যেমন- ক্যানসার, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস তাদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি পেয়েছিলাম। পাশাপাশি ষাটোর্ধ্ব বয়সের রোগীদের দ্বিতীয়বার সংক্রমণ হলে সে ক্ষেত্রে মৃত্যু ঝুঁকি বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে।

কোভিড-১৯-এর জেনোম সিকোয়েন্সিং বিশ্লেষণ গবেষণায় জুলাই ২০২১ এ দেখা যায়, মোট সংক্রমণের প্রায় ৯৮ শতাংশ হচ্ছে ইন্ডিয়ান বা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। ১ শতাংশ হচ্ছে সাউথ আফ্রিকান বা বেটা ভ্যারিয়েন্ট দ্বারা সংক্রমণ, ১ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে আমরা পেয়েছি মরিসাস ভ্যারিয়েন্ট অথবা নাইজেরিয়ান ভ্যারিয়েন্ট। জুলাই ২০২১ থেকে ডিসেম্বর ২০২১-এর প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত জিনোম সিকোয়েন্স এ প্রাপ্ত ডাটা অনুযায়ী ৯৯.৩১ শতাংশ ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট, একটি করে ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন- আলফা বা ইউকে ভ্যারিয়েন্ট এবং বেটা বা সাউথ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট এবং অন্য একটি স্যাম্পল এ শনাক্ত হয় 20B ভ্যারিয়েন্ট, যা SARS-COV-2-এর একটি ভ্যারিয়েন্ট অব ইন্টারেস্ট। ৮ ডিসেম্বর ২০১১ থেকে ৮ জানুয়ারি ২০২২ পর্যন্ত সংগৃহীত স্যাম্পলের ২০ শতাংশই অমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট এবং ৮০ শতাংশ ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া যায়। পরবর্তী মাসে এই অমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট গুণিতক হারে বৃদ্ধির আশঙ্কা করা যাচ্ছে। প্রকৃত ফলাফল আমরা এ মাসেই আপনাদের অবগত কররো।

অমিক্রন ভাইরাস ডায়াগনোসিসের জন্য আরটিপিসিআর -এর মাধ্যমে ৩টি জিন- S, N2, E দেখা হয় (BBC রিসার্স)। এর মধ্যে S জিনটি ডিটেকটেড না হলে অমিক্রনের সম্ভাবনা বেশি, কিন্তু WIJO Guidlines অনুসারে জিনোম সিকোয়েন্সিং-এর মাধ্যমে অমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট কনফার্ম করতে হবে।

ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে অমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে অনেক বেশি ইনফেকশন ছড়াচ্ছে বলে প্রতিয়মান। অমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট ভাইরাসের জেনেটিক কোড এ ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে বেশি ডিলিশন মিউটেশন পাওয়া গেছে, যার বেশির ভাগ ভাইরাসটির স্পাইক প্রােটিন রয়েছে। এই স্পাইক প্রোটিনের ওপর ভিত্তি করে বেশির ভাগ ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়। স্পাইক প্রোটিনের বদলের জন্যই প্রচলিত ভ্যাকসিনেশনের পরেও অমিক্রন সংক্রমণের সম্ভাবনা থেকে যায়।

আমাদের জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের কোনো কোনো অমিক্রন আক্রান্ত রোগীর দুই ডোজ ভ্যাকসিন দেওয়া ছিল।

তৃতীয়বারের মত সংক্রমণ রোগী পাওয়া গেছে
হাসপাতালে ভর্তিরোগী থেকে সংগ্রহিত স্যাম্পলে আমার জিনোম সিকোয়েন্স করে পেয়েছি ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট। যেহেতু অমিক্রন সংক্রমণে মৃদু উপসর্গ হয়েছে, সেটা হাসপাতালে ভর্তি রোগীতে অমিক্রন না পাবার কারণ হতে পারে।

পাশাপাশি মৃদু উপসর্গের রোগীদের মধ্যে টেস্ট না করার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। তাই আমাদের প্রাপ্ত ফলাফলের চেয়েও অনেক বেশি অমিক্রন আক্রান্ত রোগী undetected অবস্থায় আছে বলে মনে করছি।

প্রত্যেক করোনা ভাইরাস ভ্যারিয়েন্ট বিপদজনক এবং তা মারাত্মক অসুস্থতা এমনকি মৃত্যুও কারণও হতে পারে। পাশাপাশি ভাইরাসের নিয়মিত মিউটেশনের আমাদের প্রচলিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ করতে পাওে তাই করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি ও টিকা গ্রহণ করতে হবে।

করোনা জেনোম সিকোয়েন্সিংয়ের গবেষণায় সুপারভাইজার হিসেবে ছিলেন বিএসএমএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শরফুদ্দিন আহমেদ। প্রধান গবেষক ছিলেন ডা. লায়লা আনজুমান বানু, অধ্যাপক, জেনেটিক্স অ্যান্ড মলিকিউলার বাইয়োলজি ও চেয়ারম্যান, এনাটমি বিভাগ, বিএসএমএমইউ।

এছাড়া গবেষণা টিমের অন্য সদস্যরা হলেন- ডা. জিন্নাত আরা ইয়াসমীন, সহযোগী অধ্যাপক, এনাটমি বিভাগ, ডা. বিষ্ণু পদ দে, সহকারী অধ্যাপক, প্যাথলজি বিভাগ, ডা. মো. মহিউদ্দিন মাসুম, সহকারী অধ্যাপক, এনাটমি বিভাগ, ডা. ইলোরা শারমিন, সহকারী অধ্যাপক, ফার্মাকোলজি বিভাগ, ডা. আবিদা সুলতানা, রেসিডেন্ট, ফেইজ- বি, এনাটমি বিভাগ, নাহিদ আজমীন, এমফিল, থিসিস, এনাটমি বিভাগ, অধ্যাপক ডা. আফজালুন নেছা, অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ভাইরালোলজি বিভাগ, সোয়েব হোসেন, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট, জেনোম রিসার্চ সেন্টার, বিএসএমএমইউ, শ্যামল চন্দ্র বিশ্বাস, ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট, জেনোম রিসার্চ সেন্টার, বিএসএমএমইউ, অমল গনপতি, ফ্ল্যাবোটমিষ্ট, ল্যাবরেটরি সার্ভিস সেন্টার, বিএসএমএমইউ।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত