সিলেটটুডে ডেস্ক

১২ মে, ২০২২ ১৩:১৮

ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনা: ৪৪৩ জনের মৃত্যু

পবিত্র ঈদুল ফিতরে ঈদযাত্রায় সড়ক, রেল ও নৌ-পথে সম্মিলিতভাবে ৪০২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৪৪৩ জন নিহত ও ৮৬৮ জন আহত হয়েছেন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। শুধু সড়ক ও মহাসড়কেই ৩৭২টি দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত এবং ৮৪৪ জন আহত হয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (১২ মে) সকালে নগরীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই তথ্য তুলে ধরেন।

সংগঠনটির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল প্রতি বছরের মতো এবারও প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি বছর ঈদকেন্দ্রিক সড়ক দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় সংগঠনটি ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রী হয়রানির বিষয়টি দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করে আসছে।

এবারের ঈদে করোনা মু্ক্তির কারণে বেশি মানুষের যাতায়াত হয়। বিগত ২ বছর করোনা সংকটের কারণে গণপরিবহন বন্ধ-চালুর ফাঁকে প্রায় ১০ লাখ মোটরসাইকেল ও ২০ লাখ ইজিবাইক রাস্তায় নামে। ফলে এবারের ঈদযাত্রায় ২৫ লাখ মোটরসাইকেল, ৪০ লাখ ইজিবাইক বহরে থাকার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার উল্লেখযোগ্য তৎপরতার কারণে ঈদ যাত্রা খানিকটা স্বস্তিদায়ক হলেও সড়ক দুর্ঘটনা বরাবরের মতো বেড়েছে।

ঈদযাত্রা শুরুর দিন ২৬ এপ্রিল থেকে ঈদ শেষে কমস্থলে ফেরা ১০ মে পর্যন্ত বিগত ১৫ দিনে ৩৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত ও ৮৪৪ জন আহত হয়েছেন।

বিগত ২০২১ সালের ঈদুল ফিতরে যাতায়াতের সঙ্গে তুলনা করলে এবারের ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা ১৪.৫১ শতাংশ, নিহত ২২.৩৫ শতাংশ এবং আহত ২৬.৩০ শতাংশ বেড়েছে।

উল্লিখিত সময়ে রেলপথে ২৭টি ঘটনায় ২৫ জন নিহত ও ৪ জন আহত হয়েছেন। নৌ-পথে ৩টি দুর্ঘটনায় ২ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, বরাবরের মতো এবারও দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। এবারের ঈদে ১৬৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৪৫ জন নিহত, ১১০ জন আহত হয়েছে। যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৪৪.০৮ শতাংশ, নিহতের ৩৪.৮৫ শতাংশ এবং আহতের ১৩.০৩ শতাংশ প্রায়।

এই সময় সড়কে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ২০৯ জন চালক, ২৪ জন পরিবহন শ্রমিক, ৮৮ জন পথচারী, ৬২ জন নারী, ৩৫ জন শিশু, ৩৩ জন শিক্ষার্থী, ২ জন সাংবাদিক, ৮ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ২ জন শিক্ষক, ৬ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ২ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও একজন চিকিৎসকের পরিচয় মিলেছে।

এর মধ্যে নিহত হয়েছে ২ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা, একজন পুলিশ সদস্য, ২ জন ডিজিএফআই সদস্য, একজন সেনাবাহিনীর সদস্য, ২ জন নৌবাহিনীর সদস্য, ৩৫ জন নারী, একজন চিকিৎসক, ২৫ জন শিশু, ২৫ জন শিক্ষার্থী, ২ জন শিক্ষক, ১২৫ জন চালক, ১২ জন পরিবহন শ্রমিক, ৬০ জন পথচারী, ৫ জন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের সদস্যরা বহুল প্রচারিত ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় দৈনিক, আঞ্চলিক দৈনিক ও অনলাইন দৈনিক এ প্রকাশিত সংবাদ মনিটরিং করে এ প্রতিবেদন তৈরি করে।

সংঘটিত দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট যানবাহনের ৩৮.৭৫ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১৫.৪৯ শতাংশ ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ডভ্যান-লরি, ৮.৪৫ শতাংশ কার-মাইক্রো-জিপ, ৫.২৩ শতাংশ নছিমন-করিমন-ট্রাক্টর-লেগুনা-মাহিন্দ্রা, ৮.৮৫ শতাংশ অটোরিকশা, ৫.৪৩ শতাংশ ব্যাটারি রিকশা-ইজিবাইক-ভ্যান-সাইকেল, ও ১৭.৯০ শতাংশ বাস এসব দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল।

সংগঠিত দুর্ঘটনার ২০.৯৬ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৪২.৪৭ শতাংশ পথচারীকে গাড়ি চাপা দেয়ার ঘটনা, ১৫.৩২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনায়, ১৯.৮৯ শতাংশ অন্যান্য অজ্ঞাত কারণে, ১.০৭ শতাংশ ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষ ও ০.২৬ শতাংশ চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট সংঘটিত দুর্ঘটনার ৩৩.৮৭ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৪৪.৩৫ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ১৩.৪৪ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়। এছাড়াও সারাদেশে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ৪.৮৩ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ২.৪১ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে সংঘটিত হয়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার এই চিত্রকে একটি প্রতীকী চিত্র বলা চলে। প্রকৃতপক্ষে দেশে বর্তমানে মোটরসাইকেল ও ইজিবাইক ক্যানসারের মতো বেড়ে যাওয়ার কারণে পঙ্গু হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ পঙ্গু রোগী ভর্তি হলেও ঈদের এইসময়ে ২০০ থেকে ২৫০ জন হারে প্রতিদিন রোগী ভর্তি হয়েছে। যার ৬০ শতাংশ মোটরসাইকেল, ২৫ শতাংশ ইজিবাইক দুর্ঘটনায় শিকার হয়েছে বলে জানা গেছে।

তিনি আরও বলেন, সড়ক, রেল ও নৌ পথের উন্নয়নে সরকার কয়েক লাখ কোটি টাকার প্রকল্প প্রায় এক যুগ ধরে বাস্তবায়ন করে আসছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা, মেগা প্রকল্পের কারণে এসব প্রকল্প এখনো চালু না হওয়ায় অন্যদিকে গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন না হওয়ায়, ভোগান্তি ও যানজট থেকে বাঁচতে মানুষ বিকল্প হিসেবে এসব ছোট পরিবহনের ব্যবহার অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা কল্পনার চেয়েও বেশি গতিতে বাড়ছে।

তিনি মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকের আমদানি বন্ধের পাশাপাশি গণপরিবহনকে বিকশিত করার দাবি জানান।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, প্রতি বছর ৫ লাখ মোটরসাইকেল বিপণন করে সরকারের ৫ হাজার কোটি টাকা আয় হলেও দুর্ঘটনায় ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এই বাহনটি কখনো গণপরিবহনের বিকল্প হতে পারে না।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত