সিলেটটুডে ডেস্ক

২৮ মে, ২০২৪ ১২:২৩

রেমালের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড উপকূল

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট প্রবল ঘূর্ণিঝড় রেমালের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল। ছয় জেলায় অন্তত ১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাদের বেশির ভাগই মারা গেছেন গাছচাপায় ও দেয়াল ভেঙে পড়ে।

ঝোড়ো হাওয়ায় বিধ্বস্ত হয়েছে দেড় লাখ ঘরবাড়ি, বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে গ্রামের পর গ্রাম। ভেসে গেছে মাছের ঘের। কিছু স্থানে বন্ধ হয়ে গেছে সড়ক যোগাযোগ। অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে বাঁধ ভেঙে সাগরের লোনাপানি ঢুকে পড়েছে। সুপেয় পানির উৎসগুলো তলিয়ে গেছে।

ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে ডাল ভেঙে ও গাছ উপড়ে পড়ে বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে কয়েকটি জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। বিদ্যুৎ না থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন এসব এলাকার বাসিন্দারা। কয়েক কোটি মানুষ বিদ্যুৎ–বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। তবে ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। যদিও এখনো প্রায় পৌনে তিন কোটি গ্রাহক বিদ্যুৎ–সুবিধার বাইরে আছেন। গতকাল সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা জানানো হয়েছে।

মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে না অনেক স্থানে। মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ১৫ হাজার বেজ ট্র্যান্সিভার স্টেশন (বিটিএস, যা মোবাইল টাওয়ার নামে পরিচিত) গতকাল পর্যন্ত বন্ধ ছিল। এগুলো চালু করতে তারা কাজ করছেন।

এদিকে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) জানিয়েছে, গতকাল বিকেল ৪টা পর্যন্ত ৬৪টি জেলায় ২২ হাজার ২১৮টি ওয়েবসাইট অসচল রয়েছে। অর্থাৎ দেশের মোট সাইটের প্রায় ৪৯ শতাংশই অসচল রয়েছে।

হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দিনাজ উদ্দিন বলেন, এই দ্বীপের চারপাশে বেড়িবাঁধ নেই। এতে গত দুই দিন দিনে ও রাতে দুবার করে প্লাবিত হচ্ছে সব কটি গ্রাম। কিছু কিছু জায়গায় পানি নেমে গেলেও অনেক জায়গায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল (সোমবার) রাতে ১০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হয়। পানির স্রোতে নামার বাজার থেকে মোক্তারিয়া ঘাট পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার প্রধান সড়কের অনেক অংশ ভেঙে খালে পরিণত হয়েছে। এসব অংশ দিয়ে মানুষ নৌকায় পারাপার হচ্ছে।

তিনি বলেন, নিঝুম দ্বীপের দক্ষিণ ও পূর্ব অংশে অনেকের ঘরবাড়ি জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে। এ ছাড়া প্রায় ১০০ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক জোয়ারের তোড়ে ভেঙে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। এতে মানুষ জরুরি প্রয়োজনেও বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না।

একই অবস্থা হরনী ইউনিয়নের চরগাসিয়ায়। নতুন জেগে ওঠা এই চরে ১০ বছর ধরে মানুষ বসবাস করছে। বেড়িবাঁধ না থাকায় গত রাতের জোয়ারে অনেকের ঘরবাড়ি ভেসে গেছে।

চরগাসিয়া জনতা বাজার সমাজের সভাপতি তৈমুর হোসেন জানান, জোয়ারের স্রোতের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে মানুষের নতুন তৈরি করা ঘরও ভেসে যায়। অনেকে ঘরের চালের ওপরে আশ্রয় নেয়। এই চরে প্রায় ১৭ হাজার লোকের বসবাস। রাত ১টার সময় আসা জোয়ারে নিরুপায় হয়ে অনেকে বাড়ি-ঘর ছেড়ে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে ওঠে। তবে সকাল পর্যন্ত অনেকের গবাদি পশু ভেসে যাওয়ার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে।

তৈমুর আরও জানান, সকালে জনতা বাজার এলাকার পূর্ব পাশের গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, জোয়ারের স্রোতে অনেকের ঘর ভিটা থেকে ভেসে গিয়ে জমিতে এলোমেলোভাবে পড়ে আছে। অনেক বাড়িতে শূন্য ভিটা পড়ে থাকতে দেখা যায়।

এ ছাড়া জোয়ারে ও ঢেউয়ের আঘাতে নলচিরা ইউনিয়নের বেড়িবাঁধের বাইরে ঘাট এলাকায় প্রায় ১৫টি দোকানঘর পানিতে ভেসে গেছে। নলচিরা ঘাটের দোকানের মালিক সাদ্দাম হোসেন বলেন, চোখের সামনে নিজের দোকানঘরটি ভেসে যায়। ঢেউয়ের তীব্রতার কারণে মালামাল চেষ্টা করেও রক্ষা করা যায়নি।

তার মতো আরও অনেকের দোকানঘর ভেসে গেছে। অনেকে ভেসে যাওয়া ঘরের বিভিন্ন অংশ দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেও মালামাল রক্ষা করতে পারেননি।

স্থানীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী বলেন, তাৎক্ষণিক হাতিয়ায় ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির একটি বিবরণ ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এতে প্রায় ৫০ হাজার লোককে ক্ষতিগ্রস্ত দেখানো হয়েছে। ৩ হাজার ৫০০ পরিবারের ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া প্রায় ১০০ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা ভেঙে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয় ক্ষয়ক্ষতির বিবরণে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত