২৩ এপ্রিল, ২০২৬ ০৮:৫৩
আওয়ামী লীগের বড় সমর্থনভিত্তি থাকায় দলটিকে স্থায়ীভাবে রাজনীতি থেকে বাইরে রাখা বাস্তবসম্মত নয়, এতে অস্থিরতা ও সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের (আইসিজি) প্রতিবেদনে এমনটিই বলা হয়েছে।
ক্রাইসিস গ্রুপ বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ‘বাংলাদেশের নতুন সরকার কাজে নেমে পড়েছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ একটি অলাভজনক বৈশ্বিক বেসরকারি নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এর সদর দপ্তর বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে।
প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব, ভবিষ্যৎ ও সরকারের করণীয় নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে জটিল রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর একটি হলো আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ। আগে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলার রায় না হওয়া পর্যন্ত দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। এসব বিচার প্রক্রিয়া শেষ হলে বিএনপি সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে নিষেধাজ্ঞা বাড়ানো হবে কি না।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা প্রলোভনের বিষয় হতে পারে। কারণ আওয়ামী লীগই বিএনপির সবচেয়ে বড় বিরোধী দল। তা ছাড়া হাসিনা সরকারের সময় তাদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, সে কারণে বিএনপির অনেক নেতার মধ্যে গভীর ক্ষোভও রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের বড় সমর্থনভিত্তি থাকায় দলটিকে স্থায়ীভাবে রাজনীতি থেকে বাইরে রাখা বাস্তবসম্মত নয়, এতে অস্থিরতা ও সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।’
ক্রাইসিস গ্রুপ বলেছে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় আসতে পারে। শেখ হাসিনা এখনো দলের নেতৃত্বে থাকলে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরতে দেওয়া কঠিন হবে। কারণ তাঁর বিরুদ্ধে জনরোষের মাত্রা অনেক বেশি এবং তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দণ্ডাদেশ রয়েছে। আপাতত তিনি নেতৃত্ব ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা ও দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী থাকার কারলে আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনার বিকল্প নেতৃত্ব মেনে নেওয়া অনেক কর্মীর জন্য কঠিন হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পলাতক এক আওয়ামী লীগ কর্মী ক্রাইসিস গ্রুপকে বলেন, ‘অনেক সমর্থক শেখ হাসিনা ছাড়া আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে কল্পনাই করতে পারেন না। সময় লাগবে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগে নেতৃত্ব পরিবর্তন হলে বিএনপি সরকারের পক্ষে আওয়ামী লীগের বৈধতা ফিরিয়ে দেওয়া সহজ হবে। শেখ হাসিনার উত্তরসূরি যদি তাঁর পরিবারেরই কেউ হন, যেমন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, যাঁকে দীর্ঘদিন ধরেই সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হচ্ছে, তাহলে সমর্থকদের জন্য বিষয়টি গ্রহণ করা আরো সহজ হতে পারে।
ক্রাইসিস গ্রুপ বলেছে, শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, দলকে অতীতের জন্য দায় স্বীকার করতেও হবে। এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ তাদের কর্মকাণ্ড বিশেষ করে বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী বল প্রয়োগ বা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে কোনো দায় স্বীকার করেনি। বরং তারা সমঝোতার পরিবর্তে এক ধরনের কঠোর ও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। ফলে তাঁর এবং দলের অন্য নেতাদের ওপর ভারতের প্রভাব রয়েছে। অন্ততপক্ষে নয়াদিল্লির উচিত তাদের প্রভাব ব্যবহার করে নিশ্চিত করা যে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতারা এমন কোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডে জড়াবেন না, যা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে পারে। আর এর বিনিময়ে তাঁরা ভারতে অবস্থান চালিয়ে যেতে পারবেন।
ক্রাইসিস গ্রুপ বলেছে, বিএনপি সরকারের উচিত আওয়ামী লীগ সদস্য ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো পর্যালোচনা করা। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অনেককে ভিত্তিহীন অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বিচার শুরুর আগেই দীর্ঘ সময়, কিছু ক্ষেত্রে ১৮ মাসেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে রাখা হয়েছে। কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে আরো হাজার হাজার সাধারণ কর্মীকেও আটক করা হয়েছে বা পুলিশি অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উচিত পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করা এবং যাদের আগে কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই বা জননিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়, তাদের জামিন দেওয়া। একই সঙ্গে বিএনপিকে নিশ্চিত করতে হবে যেন প্রকৃত বিচারিক দাবি পূরণ হয়, কিন্তু বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা মেটানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করা হয়। এ ক্ষেত্রে বিএনপিকে তাদের ডানপন্থী, মূলত ইসলামপন্থী গোষ্ঠী এবং নিজেদের দলের ভেতরের কিছু অংশের চাপের মুখেও দৃঢ় থাকতে হবে, যারা আওয়ামী লীগকে পুনরায় রাজনীতিতে ফিরে আসতে বাধা দিতে চায়।
আপনার মন্তব্য