২২ এপ্রিল, ২০২৬ ২৩:২৬
উপজেলা পরিষদে এমপিদের বসার স্থানের নামে অফিস কক্ষ করা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই অফিস কক্ষ ' পরিদর্শন কক্ষ ' নামে অভিহিত হবে।
জাতীয় সংসদে সরকারী দল ও বিরোধী দল তুমুল উৎসাহে এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। একজন এমপিতো বসার সুযোগের সুবিধা পেয়ে সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে গাড়ী প্রদানের দাবি তুলেছেন। সরকারের অঘোষিত মুখপাত্র মন্ত্রী এ সম্পর্কে নিজেদের পূর্ব সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েও বিষয়টি বিবেচনার কথা বলেছেন। মোটের উপর এমপিরা নিজেদের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রচলিত রীতি নীতির তোয়াক্কা করছেন না। উপজেলা পরিষদে এমপিদের জন্য অফিস কক্ষ চালু কতটুকু সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা সৃস্টি করতে পারে। তা কি বিবেচনায় নিয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়? স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও শক্তিশালী করার ঘোষণা দিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি কি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে চায়। এমন প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। কারণ এর আগে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচিত জন প্রতিনিধিদের যে কোনো সময় বিনা কারণ দর্শানোর নোটিশ ব্যাতিরেকে বরখাস্থের সুযোগ রাখা হয়েছে। এভাবে একে একে অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত স্থানীয় সরকার নিয়ে বিএনপি সরকারের মনোভাবকে অস্পষ্ট ও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
উপজেলা পরিষদ নিয়ে কোনো সরকারেরই আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার প্রমাণ নেই। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থা বাতিল করে। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৮ সালে উপজেলা পরিষদ আইন করলেও নির্বাচনের ব্যবস্থা করেনি। ২০০৮ সালে তত্বাবধায়ক সরকার অধ্যাদেশ জারি করে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের আয়োজন করে। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এই অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরিত করেনি। এতে করে যে অধ্যাদেশবলে উপজেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়েছিলেন তারা আর সে অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে উপজেলা পরিষদ আইন করে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা হিসেবে অর্ন্তভূক্ত করে। এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের উপজেলা পরিষদের মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর ফলে উপজেলা পরিষদ কার্যত এমপিদের দয়া ও সরকারি কর্মকর্তাদের কর্তৃত্বে চলে যায়। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন করে কার্যত স্থানীয় সরকারের সর্বজনীন চরিত্র নষ্ট করে। ২০২৬ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে প্রতীক তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেও আইনের নির্বতনমূলক ধারাগুলো অপরিবর্তিত রাখে। উপরন্তু যে কোনো স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের বিনা নোটিশে বরখাস্ত করে প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ সরকারের হাতে রাখা হয়। এমন বাস্তবতার মধ্যে সংসদ সদস্যদের জন্য উপজেলা পরিষদে অফিস কক্ষ প্রদানের সিদ্ধান্তটি স্থানীয় সরকারের স্বাধীনতায় শুধু হস্তক্ষেপ নয় উপজেলা পরিষদে কর্মরত কর্মকর্তাদের জন্যও অস্বস্তিকর হবে। একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ইউনিটে জনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রেখে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী নিজেও একজন উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। অত্যন্ত উৎফুল্ল চিত্তে তিনি জাতীয় সংসদের মতো সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারনী স্থানে বললেন, এমপিদের জন্য উপজেলা পরিষদে অফিস চালুর বিধান না থাকায় পরিদর্শন কক্ষ নামে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাদের বসার জায়গা করে দেওয়া হচ্ছে। তিনি একই সঙ্গে জোর গলায় বলেন, এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। আপনারা ইউএনওদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
এই যে ইউএনওদের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা সংসদে দাঁড়িয়ে একজন মন্ত্রী বললেন, তার প্রভাব স্থানীয় পর্যায়ে যারা কাজ করেন তারা শুধু অনুভব করতে পারবেন। জাতীয় সরকারের সংরক্ষিত দায়িত্ব পালনে এমনিতেই স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের তটস্থ থাকতে হয়। এমপিদের অন্যায় হস্তক্ষেপ সামাল দিতে গিয়ে অনেকের গলদঘর্ম অবস্থা হয়। এখন এমপি সাহেবেরা নিজ নিজ অফিসে অবস্থান করে যখন নানা সিদ্ধান্ত দিতে থাকবেন। এমপির অনুপস্থিতিতে এমপির অফিসের কর্তৃত্ব নেওয়া দলীয় নেতাকর্মীরা যখন বিভিন্ন দপ্তরের কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবেন। তখন কেমন হতে পারে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা তা সহজেই অনুমেয়। এখন যেহেতু নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান পরিষদে নেই। তাই সমস্যার একাংশের অবস্থা আপাতত দৃশ্যমান হবে না। কিন্তু যখন উপজেলা চেয়ারম্যান, দুই ভাইস চেয়ারম্যান তাদের নির্ধারিত অফিস করবেন। এমপি সাহেব তার নির্ধারিত কার্যালয়ে অফিস করবেন। তখন উপজেলা পরিষদের চারটি অফিসে জনপ্রতিনিধিদের কর্মী, সমর্থক,দলীয় নেতাকর্মী আর সাধারণ সেবা প্রত্যাশীদের আগমনে কেমন অবস্থা হবে। সরকারের দপ্তরগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় এর কোনো প্রভাব পড়বে কিনা এসবের চুল-ছেঁড়া বিশ্লেষণ না করে এমপিদের জন্য অফিস চালু হিতে বিপরীত হতে পারে। অনেক জায়গায় সংঘাত, সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটতে পারে এই অফিসকে কেন্দ্র করে। এতে করে উপজেলা পরিষদে ন্যস্তকৃত দপ্তরগুলোর দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হতে পারে।
উপজেলা পদ্ধতির প্রতি বিএনপি সরকারের অনীহা থাকলে কিংবা সংসদ সদস্যদের নির্বাহী ক্ষমতার সঙ্গে সংযুক্ত করতে চাইলে অন্য কোনো বিকল্প ভাবা যেতে পারে। কোনো অবস্থাতেই উপজেলা পর্যায়ে বহুমুখী দ্বন্দ্ব স্থাপনের পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করা ঠিক হবে না। এতে করে সুশাসন তো দূরের কথা স্থানীয় পর্যায়ে চলমান প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ধ্বংস হয়ে যাবে। জনসন্তুষ্টির বদলে জনশৃঙ্খলা বিনষ্টের সম্ভাবনা বাড়বে। এমপিদের অনুপস্থিতিতে দালালদের দৌরাত্ম বৃদ্ধি পাবে। এমপির ঘনিষ্ঠজনদের খবরদারিত্বে উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরা কর্মস্পৃহা হারাবে।
উপজেলা পর্যায়ে এমপিদের জন্য অফিস চালু সাধারণভাবে ইতিবাচক মনে হলেও এর নেতিবাচক দিকগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা উচিত। সরকারি ও বিরোধী দল একসঙ্গে টেবিল চাপড়ে অফিস পাওয়ার খুশি উদযাপন করেছেন। কিন্তু এর মাধ্যমে উপজেলা পরিষদ কতটুকু স্বকীয়তা হারাবে তা নিয়ে কি কেউ চিন্তা করছেন? ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলে আপনারা কি ক্ষমতা কুক্ষিগতের পথে হাঁটছেন না।
সংসদ সদস্যর আইন প্রণয়ন করবেন। বিধি বিধান তৈরীতে ভূমিকা রাখবেন। তাঁরা কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে নন। তাহলে একটি মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্বাধীন ভবন ব্যবহার করলে তাদেরকেও এই মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত বিধি ব্যবস্থায় নিয়ে আসতে হবে। ছলতাতুরি করে প্রজ্ঞাপন জারি করে এটা এমপিদের চাওয়া হিসেবে চালিয়ে দেওয়া স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্যও চরম আঘাত। প্রচলিত আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন। তাছাড়া এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী,সংসদ সদস্য, বিভাগীয় কমিশনার এবং উধ্বর্তন কর্মকর্তাগণের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের পরিদর্শনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য 'পরিদর্শন কক্ষ' তৈরি করা হবে। এখানেও স্পষ্ট বলা হয়নি এটি সংশ্লিষ্ট এমপির জন্য তৈরি করা হচ্ছে। এই ব্যবস্থা কি মাননীয় সংসদ সদস্যদের জন্য সম্মানজনক। নাকি সমঝোতা ও বুঝাপড়ার সম্মতিপত্র।
উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের 'পরিদর্শন কক্ষ' স্থাপন শুধু নীতিগতভাবে ভুল সিদ্ধান্ত নয় সংবিধানের অন্তর্নিহিত কাঠামোর সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। সংবিধাবের ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উপজেলা পরিষদ একটি প্রশাসনিক ইউনিট।
উপজেলা পরিষদের যে ভবনটি, একটি উপজেলার প্রশাসনিক কেন্দ্র, সেখানে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং পরিষদের অন্যান্য সদস্য ও সরকারের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা বসেন। জাতীয় সংসদের যিনি সদস্য, তিনি বাংলাদেশের আইন বিভাগের সদস্য। কোন প্রশাসনিক ইউনিটের কর্মকাণ্ডে তার অংশগ্রহণের কোন সুযোগ নাই, এবং সেইরকম অংশগ্রন নৈতিক ও আইনগতভাবে বৈধও নয়। প্রশাসনিক ইউনিট বা নির্বাহী ক্ষমতার সঙ্গে আইন বিভাগের সংযুক্তির ফলে উপজেলা পর্যায়ে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের পাশাপাশি আইনি দ্বন্ধও দেখা দেবে।উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান,ভাইস চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে যদি একজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে একই ভবনে বসিয়ে দেন, তাইলে কি হবে? উপজেলা পরিষদ বা প্রশাসনের প্রতিটি কাজে এমপি সাহবের হস্তক্ষেপের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পদমর্যাদায় এমপিরা যেহেতু সকলের উপরে, তাঁর হস্তক্ষেপ উপেক্ষা করা উপজেলা পরিষদ বা নির্বাহী কর্মকর্তার পক্ষে খুব সহজ হবে না। এতে উপজেলার প্রশাসনের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড,রাজস্ব আহরণ ও আইন শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সকল কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ এমপি সাহেবর কাছে চলে আসবে। এমপি সাহেবরা হয়ে যাবেন তার উপজেলার নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী একেকজন রাজা।
সংস্কারের কথা বলে সরকারি দল ও বিরোধী দল যখন পরস্পরকে তুলোধুনো করছে। সংবিধানের কথা বলে সরকার যখন অনেক জরুরি পূর্ব প্রতিশ্রুত সংস্কার প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে। তখন কেন সকলে মিলে এমন বেআইনি বন্দোবস্ত ডেকে আনছেন তা বোধগম্য নয়।
স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ ও প্রশাসক নিয়োগের বিশেষ পরিস্থিতির বিধান রেখে অধ্যাদেশগুলো বর্তমান সরকার পাস করায় এমনিতেই স্থানীয় সরকার পঙ্গু হয়ে গেছে। যদিও বিএনপির ৩১ দফা এবং নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি ছিল, কখনই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অপসারণ করা হবে না। প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে না।
বিএনপি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে অধ্যাদেশগুলো পাস করায় বিরোধীদল প্রতিবাদ করলেও, আজ উপজেলা পরিষদে এমপিদের জন্য অফিস বরাদ্দের সিদ্ধান্তে ব্যাপক সমর্থন করেছে। মানে গোষ্ঠী স্বার্থে সরকারি ও বিরোধী দল এক এবং একাকার। নাকি বিএনপিকে কোনো অশুভ গোষ্ঠী তাদের আবেগী ফাঁদে ফেলে সংবিধান পরিপন্থী ছোট কিছু আদায় করে নিচ্ছে। যাতে করে পরবর্তীতে এরকম ফাঁদে বড় কিছু আদায় করা যায়। বিরোধী দলের এমপিরা অফিস পেয়ে নিজ নিজ এলাকায় যদি প্রশাসন চালাতে চায়। এমপিদের জন্য নির্ধারিত অফিসে যদি দাঙ্গা, হাঙ্গামা ঘটে। তাহলে সরকার কি পারবে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে। এর দায় তো সরকারের উপর বর্তাবে। এমন ভাবনাকি একেবারে অমূলক।
সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সংসদ সদস্যদের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এমপিদের চাহিদার প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয়গুলো বাস্তবায়ন করে। টেন্ডার প্রক্রিয়া, কেনাকাটা বা নিয়োগ, বদলি সরকারের কর্মকর্তারা করে থাকেন। এখন এমপি সাহেব যদি উপজেলা পরিষদেই বসেন, তাইলে তো তাকে এড়িয়ে কেউ কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। যেহেতু সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিচ্ছেন, তিনি যে কোন অনিয়ম দেখলে পার্লামেন্টে বিষয়টা তুলবেন সেই সুযোগতো নাই হয়ে যাচ্ছে। কেননা যেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে এমপি নিজে অংশ নিচ্ছেন, সেই সিদ্ধান্তের অনিয়ম নিয়ে তিনি অভিযোগ করবেন কিভাবে? অর্থাৎ নির্বাহী বিভাগের উপর নজরদারির যে কাজটা জাতীয় সংসদ করার কথা, সেই কাজটা আর হবে না।
তাছাড়া সংসদ সদস্য ঠিক কোন উপজেলার সদস্য নন- তিনি নির্বাচিত হন জাতীয় সংসদের তিনশ আসনের একটি আসনের বিপরীতে। অনেক আসন আছে যেখানে একাধিক উপজেলা নিয়ে গঠিত। কিছু আসন আছে বিভিন্ন উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত। কিছু কিছু আসন সিটি করপোরেশন এলাকা নিয়ে। তাহলে এসব ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের অফিস কোথায়,কোন পর্যায়ে স্থাপিত হবে। একটি উপজেলায় দুই জন সংসদ সদস্যের এলাকা পড়লে ঐ উপজেলায় দুইটি অফিস করতে হবে। আবার সংরক্ষিত আসনের নারী সাংসদের অফিসের প্রশ্নও আসতে পারে। এই যে একটি হযবরল অবস্থা তৈরী হবে। তার সুদুরপ্রসারি ফলাফল নিয়ে কি কোনো টেকসই ভাবনা আছে।
এই প্রক্রিয়ায় লাভবান হবে কারা। এমপিদের অফিস দিলে। স্টাফ দিতে হবে। স্টাফকে নিয়োগ দেবে আমলারা। স্টাফদের নিয়ন্ত্রণ করবে আমলারা। সহজ কথায় এমপিরা তখন আমলাদের খপ্পরে পড়ে যাবেন। আর এমপিদের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের কর্ম যোগাযোগ যত বৃদ্ধি পাবে আমলারা তত জনগণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবেন। আর এমপিরা যত নির্বাহী বিভাগের সাথে একসাথে কাজ করতে যাবেন, ততোই আমলাদের অবৈধ আয়ের সুযোগ বাড়বে। উপজেলার পরিষদ এমপি সাহেবদেরকে শারীরিকভাবে স্থাপন করে এই পথটা প্রশস্ত করে নেওয়া হচ্ছে কিনা তাও ভাবনায় রাখা জরুরি। প্রকৃতপক্ষে এমপি সাহেবরা উপজেলা পরিষদে বেশি সময় থাকতে পারবেন না, কিন্তু এর সুফল ভোগ করবে আমলা ও কিছু দালাল গোষ্ঠী। প্রকৃত সিদ্ধান্ত ওরাই নিবেন অথবা ওদের সম্মতিতে নেওয়া হবে। শুধু এমপির অফিসকে ব্যবহার করে এর বৈধতা দেওয়া হবে। এতে করে এমপিরা সমাদৃত হওয়ার চেয়ে সমালোচিত হওয়ায় ঝুঁকি রয়েছে। কর্মীরাও নানা বলয়ে বলয়ে বিভক্ত হয়ে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগের আশায় সিন্ডিকেট তৈরি করবে।নিকট অতীতে এমপিদের অবৈধ প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে শুধু রাজনৈতিক দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। সরকারও বিপর্যস্ত হয়েছে। এমপিতন্ত্রের আগ্রাসী রূপ কি এবার আরো প্রাতিষ্ঠানিক ও দাপ্তরিকভাবে পাকাপোক্ত হচ্ছে তা গভীর উৎকন্ঠার বিষয়। সংসদীয় রীতি নীতি যতো দুর্বল হবে, জনপ্রতিনিধিরা যতো আমলাতন্ত্রের কাছে নির্ভরশীল হবে ততই অশুভ শক্তি কর্তৃত্ববাদী হবে, গণতন্ত্র দুর্বল হবে।
সবকিছু সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য আর অর্বাচীনদের আবদারে পূরণ করলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নষ্টের পাশাপাশি রাষ্ট্রযন্ত্রও মুখ তুবড়ে পড়তে পারে। এমপিরা আইন প্রণেতা। আইন ভঙ্গকারী হিসেবে এমপিদের দাপ্তরিক স্বীকৃতি মর্যাদাজনক নয়। এমনিতেই এমপিদের নির্বাচনী এলাকায় অফিস কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ভাতা দেওয়া হয়। সরকার ইচ্ছে করে সেই নিয়ম তুলে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় এমপিদের জন্য পৃথক অফিস করে দিতে পারে। বিলাতের এমপিদের মত সপ্তাহে একদিন দুইদিন বা সেইরকম নিয়মিত সময় করে এমপি সাহেবদের সেখানে উপস্থিত থাকাও দরকার। এলাকার লোকজন অভিযোগ অনুযোগ শলা পরামর্শ এইসবের জন্যে আসবে, রাজনৈতিক মতবিনিময় করবে। সরকার এজন্য একটা বরাদ্দও দিতে পারে, একজন দুইজন স্টাফের ব্যবস্থাও করতে পারে। কিন্তু সেটা কোনো অবস্থাতেই সরকারি অফিসে করা সম্মানজনক নয়। চূড়ান্ত বিচারে এটি হবে আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার উপর আঘাত। মহান জাতীয় সংসদকে বিতর্কিত করার প্রচেষ্টা।
লেখক : সাংবাদিক ও সমাজকর্মী
আপনার মন্তব্য