০৩ মে, ২০২৬ ২১:০২
হাওরের সমস্যার টেকসই সমাধানের দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজ ও পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠকরা। এসময় হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় ১৫ দফা দাবি জানান তারা।
রোববার সকালে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি জানানো হয়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা এবং নাগরিক উদ্যোগের যৌথ আয়োজনে “হাওর অঞ্চলে চলমান বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ফসলহানি, দুর্যোগ পরিস্থিতি এবং হাওরবাসীর দাবি” শীর্ষক এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
বাপা’র সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা।
বাপা'র কোষাধ্যক্ষ আমিনুর রসুল এর সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন এএলআরডি-এর নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহর নঈম ওয়ারা, সুনামগঞ্জ সমিতি ঢাকার সাবেক সভাপতি ডাঃ ওমর খৈয়াম, হাওর অঞ্চলবাসী ঢাকা এর সমন্বয়ক ড. হালিমদাদ খান ও রুহিন হোসেন প্রিন্স।
লিখিত বক্তব্যে কাসমির রেজা বলেন, “হাওর অঞ্চলের কৃষকরা এখন চরম মানবিক সংকটে রয়েছেন। চলতি বোরো মৌসুমে মার্চের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত টানা তিন দফা বৃষ্টিপাত এবং ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণে অন্তত ৭৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া শিলাবৃষ্টিতে আরও প্রায় ৮০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অব্যাহত বৃষ্টিপাত ও বন্যা কৃষকদের আরও বড় ক্ষতির সম্মুখীন করতে পারে। এখন পর্যন্ত হাওরের যেসব জমির জমির ধান কাটা হয়েছে সেসব ধান বৃষ্টির কারণে শুকানো যাচ্ছে না। অনেক ধান পচে গেছে। পানির তোড়ে মাড়াই করা ধান খলা থেকে ধুয়ে চলে যাচ্ছে। এসব ধান নিয়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছেন হাওরের কৃষক।
শামসুল হুদা বলেন, ফসলহানির কারণে কৃষকদের জীবিকা, ঋণ পরিশোধ, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যাহত হবে । হাওরের এই সংকট শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়; এটি একটি জাতীয় সংকট। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। গবাদিপশুর খাদ্য সংকটও দেখা দিচ্ছে। এতে কৃষকরা কম দামে গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন। "
বক্তারা বলেন, দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ হাওর অঞ্চল থেকে আসে। ফলে হাওরের ফসলহানি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে।
গওহর নঈম ওয়ারা বলেন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নে সতর্ক থাকতে হবে। এটি যেন পক্ষপাতদুষ্ট না হয়। এই ফসলহানির ফলে বাল্যবিবাহ সহ বিভিন্ন সামাজিক সংকট দেখা দিবে তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। বর্গাচাষি মূলতঃ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের সহায়তা প্রদান করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, এবারের সংকট কেবল প্রাকৃতিক নয়; এটি একটি নীতিগত, পরিকল্পনাগত ও ব্যবস্থাপনাগত সংকট। নদীর নাব্যতা হ্রাস, অপরিকল্পিত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ, ফসলরক্ষা বাঁধে বিলম্ব এবং অনিয়ম-দুর্নীতি পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান বের করতে হবে।
ডাঃ ওমর খৈয়াম হাওরের ভিন্ন ভূপ্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে হাওরের জন্য স্বতন্ত্র উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি করেন।
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, হাওর রক্ষা বাঁধের নামে বছর বছর শত কোটি টাকা লোপাট হয়। এই অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করার না গেলে হাওর কে বাঁচানো যাবে না। হাওরের বাস্তুতন্ত্র বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ১৫ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। উত্থাপিত দাবি সমূহের মধ্যে ছিল ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বছরব্যাপী পরিবার প্রতি ৩০ কেজি চাল ও এক হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান, নদী-খাল ও বিল খননের মাধ্যমে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা, অপরিকল্পিত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করা, ফসলরক্ষা বাঁধে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ, জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর স্লুইসগেট নির্মাণ, হাওরের কৃষকদের কাছ থেকে চাল নয় অন্তত ১০ লক্ষ টন ধান সরাসরি ক্রয়, সুদমুক্ত ঋণ ও ঋণের পুনঃতফশিল, কমিউনিটি মাড়াই কেন্দ্র ও ড্রায়ার স্থাপন, বজ্রপাত প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা, জলমহালের লিজ বাতিল করা, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জলবায়ু তহবিল থেকে হাওর অঞ্চলে বরাদ্দ বৃদ্ধি। সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন পরিবেশবাদী, নাগরিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
আপনার মন্তব্য