০৭ মে, ২০২৬ ১২:২৪
পুলিশের মালিকানাধীন কমিউনিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগ দেওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছেন ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কিমিয়া সাদাত। তিনি ব্যাংকটির এমডি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ১৪ মে থেকে তাকে এমডি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের কথা ছিল। এর আগে ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি।
বুধবার ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন বলে জানা গেছে।
এদিকে, এই পদে পদ্মা ব্যাংকের ডিএমডি ইমতিয়াজ উদ্দিনকে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে। সামাজিক মাধ্যমে এই তথ্য জানিয়েছেন আল-জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন শায়ের। তিনি জানান, ইমতিয়াজ উদ্দিন বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের শ্যালক।
জানা যায়, ১৪ মে থেকে কিমিয়া সাদাতকে পূর্ণাঙ্গ এমডি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ। নানা প্রক্রিয়া শেষে যার অনুমোদন দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকও। তবে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব গ্রহণের আগেই ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নিকটাত্মীয়ের নিয়োগ নিশ্চিত করতে এমডি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ও বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্বে থাকা কিমিয়া সাদাতকে সরে যেতে বলা হয়। এ কারণে এমডির দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগ করেন।
ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া পদত্যাগপত্রে তিনি লিখেছেন, কমিউনিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) পদ থেকে আমার পদত্যাগপত্র দাখিল করছি, যা এই পত্রের তারিখ হতে প্রযোজ্য তিন মাসের নির্ধারিত নোটিস সময়সীমা পূর্ণ হওয়ার পর কার্যকর হবে। এই সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত কারণে নেওয়া হয়েছে। নোটিস সময়কালে একটি সুষ্ঠু ও শৃঙ্খলাপূর্ণ দায়িত্ব হস্তান্তর নিশ্চিত করতে আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকব এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্ব হস্তান্তরের ক্ষেত্রে পূর্ণ সহযোগিতা করব।
পদত্যাগ প্রসঙ্গে কিমিয়া সাদাত গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এক সপ্তাহ পর পুরো দায়িত্ব নিয়ে কাজ শুরুর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময়ে পদত্যাগ করায় নিজের কাছে খারাপ লাগছে।’
কমিউনিটি ব্যাংকের এমডি পদে এই টানাপড়েন নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন শায়ের ফেসবুকে লিখেছেন: বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার নাসির উদ্দিন তার শ্যালক এবং পদ্মা ব্যাংকের ডিএমডি ইমতিয়াজ উদ্দিনকে পুলিশের মালিকানাধীন কমিউনিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য জোরালো তদবির চালিয়ে যাচ্ছিলেন গত কয়েকদিন ধরেই। এ উদ্দেশ্যে তিনি সরকারের বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলে তার শ্যালকের সিভিও পাঠিয়েছিলেন। কমিউনিটি ব্যাংকের নতুন এমডি হিসেবে ইতোমধ্যে কিমিয়া সাদাতকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও সেই নিয়োগের অনুমোদন দিয়েছিল, মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তিনি চলতি দায়িত্ব হিসেবে তা পালনও করেছিলেন। তবে আজ সেই প্রভাবশালী মহলের চাপে কিমিয়া সাদাতকে জোরপূর্বক পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়, এই ঘটনায় ভীত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন দেশের শীর্ষ ব্যাংকাররা।
তিনি আরও লেখেন: বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে এধরনের চিত্র আমাদের কাছে বেশ পরিচিত — তবে যারা পূর্বের ওই ধারায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদের এই চেষ্টা দুঃস্বপ্ন হিসেবেই ধরা দেয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। একদিকে সরকার প্রধান বলছেন সবার আগে বাংলাদেশ, আর অন্যদিকে কতিপয় প্রভাবশালী এমনসব কাণ্ড কারখানা করছেন যা দেখে মনে হচ্ছে সবার আগে শ্যালক — পুত্র, কন্যা, জায়া।
কিমিয়া সাদাত ২০২৫ সালের এপ্রিলে কমিউনিটি ব্যাংকের নেতৃত্বে আসেন। এর পর থেকেই ব্যাংকটি উন্নতি করতে শুরু করেছিল। কিমিয়া সাদাতের মেয়াদে (এপ্রিল ২০২৫-ডিসেম্বর ২০২৫) ব্যাংকটির নিট মুনাফা ৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালে নিট মুনাফা ছিল ৭০ কোটি টাকা। ব্যাংকটি গত বছর শেষে শেয়ারধারীদের ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে, যা নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া কিমিয়া সাদাতের দায়িত্ব পালনের মেয়াদে ব্যাংকটির আমানত ৩২ শতাংশ বা ১ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৩৮ কোটি টাকায়। এ ছাড়া গত বছর ঋণ ৩৬৪ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬১১ কোটি টাকা। ব্যাংকটি খেলাপি ঋণে আদায়েও সাফল্য দেখিয়েছে। ২০২৪ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ৩ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ, গত বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৮৯ শতাংশে।
এদিকে কিমিয়া সাদাতের এই পদত্যাগের ঘটনায় ব্যাংক খাতে আবারও নানা আলোচনা–সমালোচনা শুরু হয়েছে।
এ বিষয়ে ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন গণমাধ্যমকে বলেন, একজন পেশাদার ব্যাংকারকে দুর্নীতি ইত্যাদি প্রমাণিত অভিযোগ ছাড়া পদত্যাগ করানোর সুযোগ নেই। তার পদত্যাগের পেছনের পুরো গল্প আমি জানি না। তাই আমি আশা করি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এমডি হিসেবে অনুমোদন পাওয়া এই ব্যাংকারের পদত্যাগে কোনো অনিয়ম এবং জোর-চাপ ইত্যাদির ঘটনা ঘটেনি। সেটা ঘটলে ব্যাপারটা হবে অতীব দুঃখজনক। ব্যাংকার পাড়ায় তা আবার ভীতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি করবে, যা ইন্ডাস্ট্রির জন্য ভালো কথা নয়।
এ বিষয়ে পদ্মা ব্যাংকের বর্তমান ডিএমডি ইমতিয়াজ উদ্দিনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আপনার মন্তব্য