ডেস্ক রিপোর্ট

২৫ ফেব্রুয়ারি , ২০১৫ ০২:২৩

পিলখানা ট্রাজেডির ৬বছর: হত্যামামলা আপীল শুনানিতে

২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর আদালতের এক রায়ে তৎকালীন ডিএডি তৌহিদসহ ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৬২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়

আতঙ্কের ৩৬ ঘন্টায় বিপথগামি বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) সদস্যদের হাতে পিলখানায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি। পিলখানায় সংঘটিত বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) বিদ্রোহের ছয় বছর পূর্ণ হলো।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলা রায় ঘোষণা হয় ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর। রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে করা আসামিপক্ষের আপীল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শুরু হয়েছে গত ১৮ জানুয়ারি। 

২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকার তৎকালীন তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান তৎকালীন ডিএডি তৌহিদসহ ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই মামলায় বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা তোরাব আলীসহ ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৬২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে খালাস পাওয়া ২৭৭ জনের মধ্যে ৬৯ জন আসামির সাজা চেয়ে ফৌজদারি আপিল ও ডেথ রেফারেন্স দায়ের করে রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে দণ্ডপ্রাপ্ত ৪১০ জন আসামির সাজা বাতিল চেয়ে রায়ের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আপিল দায়ের করেন তাদের আইনজীবীরা।

গত ১৮ জানুয়ারি হাইকোর্টে উক্ত ফৌজদারী আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শুরু হয়। তবে গত দুই বছর একই অবস্থানে রয়েছে একই ঘটনায় দায়ের করা বিষ্ফোরক মামলার বিচার। বিষ্ফোরক মামলায় এ পর্যন্ত ২৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। তবে বাদীর সাক্ষ্য এখনও শুরু হয়নি। আগামি ১২ মার্চ সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে। বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পুলিশের পরিদর্শক নবজ্যোতি খীসা প্রথমে লালবাগ থানায় এবং পরে নিউমার্কেট থানায় এ মামলা দায়ের করেন।

মামলা দায়েরের পর দুই হাজার একশ’ ৮৭ জনকে গ্রেফতার করে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নেওয়া হয়। রিমান্ড শেষে ৫২১ আসামি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরবর্তীতে ১২৫ জন আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেন। ঘটনাটি তদন্ত করে ২০১০ সালের ১২ জুলাই হত্যা মামলায় ও ২৭ জুলাই বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা মামলায় পাঁচশ’ ৩৬ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি’র বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দ।

বিডিআর বিদ্রোহের পর ২০১০ সালের ১২ জুলাই বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ আইন-এর খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। ওই বছরেরই ৮ ডিসেম্বর ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিল-২০১০’ জাতীয় সংসদে পাস হয়। ২৬ ডিসেম্বর এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশের পর বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) হয়ে যায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

নারকীয়তার ৩৬ ঘন্টা

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা ২৭ মিনিটে তদানীন্তন বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) সদর দফতর পিলখানা। দরবার হলে চলমান বার্ষিক দরবারে হঠাৎ বিডিআরের বিপথগামী কিছু সদস্য তাদের দাবি-দাওয়া আদায়ের নামে ঢুকে পড়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। একপর্যায়ে বিদ্রোহীদের একজন বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের বুকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করার পরপরই অন্য বিদ্রোহীরা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে দরবার হলে আগত সেনা কর্মকর্তাদের ওপর। এরপর তারা নারকীয় হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। বিদ্রোহীদের ভয়ঙ্কর সব আগ্নেয়াস্ত্রের বুলেটের নির্মম আঘাতে নিথর হয়ে পড়ে জাতির মেধাবী সন্তানদের দেহ।

প্রায় ৩৬ ঘণ্টা ধরে নারকীয়ভাবে ৫৭ জন মেধাবী সেনা কর্মকর্তা, দু’জন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী, ৯ জন বিডিআর সদস্য ও পাঁচজন বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। পুরো পিলখানায় যেন রক্তস্রোত বয়ে যায়। কেবল হত্যাযজ্ঞেই থামেনি ঘাতকরা। বিদ্রোহী জওয়ানরা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করে তাদের পরিবারকেও জিম্মি করে ফেলে।

সরকারের তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণ
বিদ্রোহের মধ্যে বিভিন্ন গুজব, আশঙ্কা ও চাপের মুখেও ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও সাহসের চরম পরীক্ষায় পড়তে হতে হয় নবনির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে। কিন্তু তিনি এমন ভয়ঙ্কর অবস্থার মধ্যেও বিচক্ষণ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশকে অনিবার্য গৃহযুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন নেপথ্যের কুশীলবদের সব ষড়যন্ত্র।

ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বিদ্রোহীদের দমনে সেনা অভিযান ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে- এমন আশঙ্কায় শেখ হাসিনার সরকার রাজনৈতিকভাবে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রধানমন্ত্রী তখন সকল সামরিক অফিসার, গোয়েন্দা সংস্থা ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বিদ্রোহ দমনে আলোচনার পাশাপাশি দলের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণ করানোর চেষ্টা চালান।

সরকারের তরফ থেকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রী-এমপিকে পাঠিয়ে বিদ্রোহীদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে তাদের আত্মসমর্পণের চেষ্টা চালানো হয়। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও নিজেও বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন।

এরপরও বিদ্রোহীরা তাদের অনড় অবস্থান থেকে সরে না আসলে ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, আপনারা অস্ত্র জমা দিয়ে ব্যারাকে ফিরে যান। অন্যথায় আমি দেশবাসীর স্বার্থে যে কোনো পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবো। আমাকে কঠোর হতে বাধ্য করবেন না। প্রধানমন্ত্রীর এ হুঁশিয়ারিতে বিদ্রোহীদের মনোবল ভেঙে পড়ে। অনেক জল্পনা-কল্পনার পর শেষ পর্যন্ত বিনা রক্তপাতেই বিডিআর বিদ্রোহের নামে এ হত্যাযজ্ঞ দমন করে সরকার।

 

 

 

 

 

 

আপনার মন্তব্য

আলোচিত