নিউজ ডেস্ক

০১ মার্চ, ২০১৫ ০২:৫৫

অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ড: খুনিরা অনুসরণ করছিল প্রথম থেকেই

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে গল্পের ছলে চায়ের দোকানে নিয়ে যায়। ওই চায়ের দোকানেই অপেক্ষা করছিল কিলিং মিশনের মূল সদস্যরা।

বিজ্ঞান লেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়ের খুনিরা মেলায় প্রবেশের পর থেকেই অনুসরণ করছিল তাঁকে এবং ঘটনার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত তাঁর আশেপাশেই ছিল ঘাতক চক্রের সন্দেহভাজন দুই সদস্য। ঘটনাস্থল টিএসসির অদূরে বসানো সিসিটিভিতে ধারণকৃত ছবি থেকে পাওয়া গেছে এমন দৃশ্য।

তবে ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত থেকেই সন্দেহভাজন দু’জনকে ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়নি। সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজটি সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে র‍্যাব ও ডিবি (গোয়েন্দা পুলিশ)।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে গল্পের ছলে চায়ের দোকানে নিয়ে যায়। ওই চায়ের দোকানেই অপেক্ষা করছিল কিলিং মিশনের মূল সদস্যরা। তদন্ত সূত্রে আরও জানা গেছে, বিকালে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে কয়েক দফায় একটি মোবাইল ফোন থেকে কল আসে অভিজিৎ রায়ের ফোনে। ঘটনার পর থেকে ওই মোবাইল ফোনটিও বন্ধ পাচ্ছেন গোয়েন্দারা। এ থেকে গোয়েন্দাদের ধারণা, বন্ধুবেশেই ঘাতকরা অভিজিৎকে অনুসরণ করছিল। কিলিং মিশন শেষে তারা পালিয়ে যায়। অভিজিৎ রায়ের মোবাইল ফোনের কললিস্টও সংগ্রহের চেষ্টা করছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো।

বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বইমেলা থেকে ফেরার পথে অভিজিৎ রায় ও তাঁর স্ত্রী বন্যা জঙ্গিগোষ্ঠীর আক্রমণের শিকার হন। তাঁর মাথা ও পিঠে চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছে সন্ত্রাসীরা। হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত ডাক্তারেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থলেই অভিজিৎ রায়ের মাথার মগজ পড়ে থাকতে দেখা যায়, স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে বন্যা হারান তাঁর হাতের আঙুল। মারাত্মক আহত বন্যাকে ঢামেক থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্যে স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

এদিকে মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রগতিশীল লেখক ড. অভিজিৎ রায়কে নৃশংসভাবে হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ। শুক্রবার নিয়মিত ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জেন সাকি অভিজিতের হত্যাকাণ্ডকে ‘কাপুরুষতা ও ভয়ংকর বর্বরতা’ বলেও আখ্যা দেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ চাইলে এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দিতে প্রস্তুত।

এ প্রসঙ্গে মহানগর পুলিশের কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া জানান- তদন্তে সহায়তার জন্য কাউকে আহ্বান জানানো হয়নি। তবে যেহেতু অভিজিৎ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, সে হিসেবে তারা যদি তদন্তে আগ্রহী হয় তবে ডিএমপি স্বাগত জানাবে। মহানগর পুলিশের রমনা জোনের সহকারী কমিশনার শিবলী নোমান জানান, ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে অভিজিৎ হত্যার ঘটনায় তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা অবহিত করা হয়েছে।

এদিকে শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো এফবিআই অভিজিতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিবার চাইলে তার হত্যার বিষয়ে তদন্ত করতে প্রস্তুত আছে। অভিজিতের বাবা তাদের বলেছেন তিনি সুষ্ঠু তদন্ত চান। বিকালে মার্কিন দূতাবাসের একটি প্রতিনিধি দলও তাদের বাসায় যান। অভিজিৎ হত্যা মামলাটির তদন্ত ভার শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাংলাদেশে লেখক-সাংবাদিক আক্রান্ত হলেও সেসব ঘটনার বিচার না হওয়াই অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডের পথ করে দিয়েছে বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বাংলাদেশে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নাম আলোচনায় আসে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যার পর। ওই হত্যাকাণ্ডে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্যরা জড়িত ছিল। ওই ঘটনায় গ্রেফতার হন নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ফয়সাল বিন নাঈম ওরফে দীপ, মাকসুদুল হাসান ওরফে অনিক, এহসান রেজা ওরফে রুম্মান, নাঈম সিকদার ওরফে ইরাদ ও নাফিস ইমতিয়াজ। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে ও আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে ধর্মের অবমাননা করে ব্লগে লেখালেখির কারণে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কথিত বড় ভাই রেদোয়ানুল আল আজাদ ওরফে রানার পরিকল্পনায় ও নেতৃত্বে তারা রাজীবকে হত্যা করেন বলে স্বীকার করেন।

ব্লগার রাজীব হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে গোয়েন্দারা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসীম উদ্দিন রাহমানীকে ২০১৩ সালের আগস্টে গ্রেফতার করে। তাকে বরগুনা থেকে ৩১ জন অনুসারীসহ গ্রেফতার করা হয়। তিনি প্রথম ২০০৪ সালে রাজধানীর হাজারীবাগে রিসার্চ সেন্টার ফর ইউনিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আরসিইউডি) নামে একটি এনজিও’র অফিসের আড়ালে জঙ্গি তৎপরতা শুরু করেন। ওই সময় জসীম উদ্দিনের কাছ থেকে তাদের পরবর্তী টার্গেটের অন্তত ৩০ জনের একটি তালিকা তখন উদ্ধার করে গোয়েন্দারা। ওই তালিকায় এক নম্বরে নাম ছিল অভিজিতের।

এদিকে জসীম উদ্দিন গ্রেফতার হওয়ার পর ফারাবি শফিউর রহমান আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের দয়িত্ব নেন। ২০১৪ সালের মার্চে এই ফারাবী অনলাইনে বই বিক্রির প্রতিষ্ঠান রকমারি ডটকমকে অভিজিৎ রায়ের বই না বিক্রি করার হুমকি দেয়। একই সঙ্গে তাদের ওয়েবসাইট থেকে অভিজিৎ রায়ের বই তুলে নেয়ার জন্য বলে। হুমকির মুখে প্রতিষ্ঠানটি ওই সময় তাদের ওয়েবসাইট থেকে অভিজিৎ রায়ের বই তুলে নিতে বাধ্য হয়। ফারাবী ফেসবুক পোস্টেও বেশ কয়েকদফা অভিজিৎ রায়কে হত্যার হুমকি দেন।

গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ফারাবী ২০১৩ সালে গণজাগরণ আন্দোলনের কর্মী ব্লগার থাবা বাবা ওরফে আহমেদ রাজীব হায়দারের জানাজা পড়ানোয় ইমামকে হত্যার হুমকি দিয়ে প্রথম আলোচনায় আসেন। ওই ঘটনার পর পুলিশ তাকে গ্রেফতার করলেও কিছুদিনের মধ্যেই তিনি কারাগার থেকে জামিনে বের হয়ে আসেন।

খুনের ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে কোনো তথ্য নেই কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। যদিও তারা প্রথম থেকেই বলে আসছে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে তাদের ধারণা। কিন্তু নিশ্চিত করে কেউ এখনও কিছুই বলতে পারছে না। অথচ ঘটনাস্থল টিএসসি মোড়ে পুলিশি ব্যারিকেডের কয়েক গজ দূরেই বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে নৃশংসভাবে খুন হন অভিজিৎ রায়। এ ঘটনায় গুরুতর আহত স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

কারা অভিজিৎ রায়কে হত্যা করেছে এটা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা না হলেও তিনি ছিলেন মৌলবাদীদের হিটলিস্টে। এর আগে একাধিকবার অভিজিৎ রায়সহ একাধিক ব্লগারের নামে হিটলিস্ট প্রকাশিত হয়েছিল। ব্লগ ও অনলাইনের বিতর্কিত শফিউর রহমান ফারাবী একাধিকবার প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিল দেশে আসলেই তাঁকে হত্যা করা হবে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি ফারাবী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে অভিজিৎ রায় সম্পর্কে বিদ্বেষ ছড়ানোর পর কমেন্টে লিখেন- “অভিজিৎ রায় আমেরিকা থাকে। তাই তাকে এখন হত্যা করা সম্ভব না। তবে সে যখন দেশে আসবে তখন তাকে হত্যা করা হবে"।


এর আগেও একাধিকবার এবং পরেও সে অভিজিৎ রায় সহ মুক্তচিন্তার সব লেখকদের হত্যার হুমকি দিয়েছিল এবং বর্তমানেও সে ধারা অব্যাহত আছে। ব্লগার থাবা বাবা’র হত্যার পর কোন ইমাম থাবা বাবা’র জানাজার নামাজ পড়ালে তাঁকেও হত্যা করা হবে বলে হুমকি দিয়েছিল।

অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডের ওপর ফেসবুকে প্রতিক্রিয়াশীলচক্রের অনেককেই উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা যায়। তার মধ্যে আছে আবু সুমাইয়া মুনতাসির বিল্লাহ। হত্যাকাণ্ডের পরের দিন সে তার স্ট্যাটাসে এই হত্যাকাণ্ডকে ‘জায়েজ’ করতে লিখে- তোমরা যারা অভিজিত রায়ের মৃত্যুর ব্যাপারে নিচের প্রশ্নটি করে থাকোঃ এভাবে মেরে ফেলা কি ইসলামে জায়েয? উত্তরঃ মৃত্যুই তার সাজা, তবে তা বাস্তবায়ন করবে সরকার। কেউ বিচ্ছিন্ন ভাবে করলে সেটা ফিতনা হবে একথাই সত্য। আবারও একই প্রশ্ন মনে উদিত হয়? তাহলে আপনি একবারও কি মুক্তমনা ব্লগের নাম জীবনে শুনেন নাই? কই, কখনোতো দেখিনি যে একটা স্টাটাস দিয়ে হলেও ঐ ব্লগের কুত্সিত লিখাগুলির প্রতিবাদ করতে!! তখন যদি তার প্রতিবাদ মনে মনে করে থাকেন, এখনও ঐ প্রাণীটার মৃত্যুতে ক্ষোভ বা প্রতিক্রিয়া মনে মনেই রাখেন।
বটম লাইনঃ ফিতনা হোক আর যাই হোক, সাজা কায়েম হয়ে গেছে; আল্লহু আকবর।
পুনশ্চঃ এটাকে রাজ্নীতিকরন করা হইলে ইসলামের ক্ষতি হবে না? শুধু যে বা যারা মারসে তারাই ফিতনা করে থাকে; আর বাংলাদেশে কোন ফিতনা হয় না? এটাতো ফিতনার সাগরের একটা কাঠের টুকরার মত কেবল।


অনুসন্ধানে জানা যায়, আবু সুমাইয়া চট্টগ্রামের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা করে লন্ডনে গিয়েছিলেন মাস্টার্স করতে। সেখান থেকে ফিরে আমেরিকান একটি সফটওয়্যার কোম্পানীতে কাজ করেন তিনি এবং তার বাবা জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত।

ঘটনাস্থল টিএসসি মোড় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনবহুল স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। শাহবাগ থানা থেকেও টিএসসি মোড়ের দূরত্ব খুব বেশি নয়। এরপরও খুনিরা প্রকাশ্যে খুন করল কীভাবে, আর খুন করে পালিয়েই গেল কীভাবে- এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়াও ঘটনাস্তলের অদূরে দাঁড়ানো ছিল পুলিশের টহল ভ্যান। 

এর আগে ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদকে বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর একইভাবে আঘাত করা হয়েছিল। এর পর তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। একইভাবে ব্লগার রাজীবকে ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি রাজধানীর পল্লবীতে নিজ বাসার সামনে হত্যা করা হয়েছিল। দুটি ঘটনায়ই জঙ্গিরা জড়িত বলে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।

বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এ দম্পতি গত ১৬ ফেব্রুয়ারি দেশে আসেন। কয়েক দিনের মধ্যে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার কথা ছিল। অভিজিৎ রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষক ও সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদবিরোধী মঞ্চের সমন্বয়ক অধ্যাপক অজয় রায়ের বড় ছেলে। ওই হত্যাকাণ্ডের পরপরই অজ্ঞাত মোবাইল ফোন নম্বর থেকে অজয় রায়কে হুমকি দেয়া হয়। এছাড়া অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শনিবার সকালে অজ্ঞাত স্থান থেকে অজয় রায়কে হুমকি দেওয়া হয়।

 

 

 

 

আপনার মন্তব্য

আলোচিত