১৬ মার্চ, ২০১৫ ২১:৩৭
বইমেলার সময়ে সার্বক্ষণিক পুলিশী নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে ড. অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের ব্যর্থতাকে বড় করে দেখছেন আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। এ ঘটনায় আইজিপির পদত্যাগ করা উচিত ছিল বলে অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।
হত্যাকাণ্ডের সময় পুলিশের ভূমিকায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের ক্ষোভের পর এবার আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের বক্তব্যেও একই সুর ফুটে উঠেছে।
তার মতে, অভিজিৎ হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে ব্যর্থতার জন্য পুলিশ মহাপরিদর্শকের সেদিনই পদত্যাগ করা উচিৎ ছিল।
সোমবার (১৬ মার্চ) ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত সভায় বিচারপতি খায়রুল হক পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করে বক্তব্য দেওয়ার সময় আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও উপস্থিত ছিলেন।
রাজধানীর ধানমণ্ডির ডাব্লিওভিএ মিলনায়তনে ‘অভিজিৎ হত্যা ও চলমান সন্ত্রাস, সরকার ও নাগরিক সমাজের করণীয়’ শীর্ষক এই সভায় অভিজিতের বাবা অধ্যাপক অজয় রায়ও ছিলেন।
তিনি বলেন, “আমরা সাধারণ ও অসহায় মানুষ। আমরা আগুনে পুড়ছি। আমরা বিচারালয়ের প্রতি আস্থা হারিয়ে না ফেলি।”
বিচারপতি খায়রুল হক বলেন, “আপনাকে (পুলিশ) কেন এফবিআইকে ডেকে নিয়ে আসতে হবে? এফবিআই যে গ্রামার মেনে তদন্ত করে আপনাদেরও তো একই গ্রামার মেনে তদন্ত করার কথা। একই প্রশিক্ষণ, একই প্রক্রিয়া, তাদের আসার প্রয়োজন হয় কেন?
“তাদের কি উচিত ছিল না, পুলিশের গাড়ি ব্যবহার করে সঙ্গে সঙ্গে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া। তাদের কি উচিত ছিল না, বন্যা আহমেদকে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। বিদেশে পুলিশকে পুলিশ বলে না, বলে ‘ল’। বলে ল ইজ কামিং।”
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলার বাইরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মোড়ে খুন হন অভিজিৎ। মুক্তমনা ব্লগ সাইটের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ যুক্তরাষ্ট্রে থাকতেন। ধর্মীয় উগ্রবাদীদের হুমকির মুখে ছিলেন তিনি।
অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটিকে ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে নেওয়ার কথা বলে বিচারপতি খায়রুল হক বলেন, “তাহলে দেখেন, কতগুলো ব্যর্থতা আমার দেখতে পাচ্ছি। নির্বিকারভাবে মীর মদনের মতো, মীর জাফরের মতো দাঁড়িয়ে (পুলিশ) আছে।
“একজন সাংবাদিক জীবন তাড়াতাড়ি একটি স্কুটারে নিয়ে গেছেন। পুলিশের গাড়িগুলো কী করছিল? এর জন্য কোনো আইনের প্রয়োজন নেই। এটা একটা নর্ম, সংস্কৃতি। মানুষের প্রতি মানুষের ব্যবহার। তার জন্য কৈফিয়তটা কী হল? দেখেন, মানুষ যখন মারা যায়, তখন মৃত্যু যন্ত্রণায় কী পরিমাণ চিৎকার করতে পারে! তারপরও আমাদের আইন চুপ করে দাড়িয়ে, নিঃস্তব্ধ!”
“যিনি প্রধান (পুলিশ প্রধান), তার গাড়িতে দেখলাম তিনটা স্টার লাগানো। স্টার আমাদেরকে কোনো সহযোগিতা করে না। আমার মাথায় ঘিলু যেন রাস্তায় না পড়ে থাকে। আমার কাছে স্টারের দামটা এ রকম। তার উচিত ছিল সেদিনই পদত্যাগ করা। ওই সংস্কৃতি আমাদের দেশে নাই। ওইটা আমরা আশাও করি না।”
ছেলেকে নিয়ে এই আলোচনায় প্রগতিশীল সব আন্দোলনে সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক অজয় রায় বলেন, “আমরা সন্ত্রাসের সংস্কৃতি নির্মাণ হতে দেখেছি। এ থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের দরকার ধর্ম নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।”
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, কোনো অন্যায়কারী বিচার ব্যতীত যেতে পারে না। বাংলাদেশের কেউ মনে করতে পারবে না যে, সে আইনের উর্ধ্বে। সেই বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলব।
সভায় সূচনা বক্তব্যে ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির সরকারের কাছে দুটি দাবি তুলে ধরেন।
অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ ও অভিজিৎ রায়কে যে স্থানে হত্যা করা হয়েছে, তার সংলগ্ন চত্বরটাকে হুমায়ুন আজাদ-অভিজিৎ মোড় নামকরণের দাবি জানান তিনি।
অন্য দাবিটি হচ্ছে টিএসসি থেকে বুয়েট পর্যন্ত সড়ক হুমায়ুন আজাদ-অভিজিৎ সড়ক হিসেবে নামকরণ করার।
ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা সৈয়দ আমিরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অভিজিৎ-বন্যাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য সাংবাদিক জীবনকে নগদ ৩০ হাজার টাকা, প্রশংসাপত্র, বই ও ফুল দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। তার হাতে পুরস্কার তুলে দেন শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী।
আপনার মন্তব্য