২০ জুন, ২০১৬ ১৮:৪৬
সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে তৈরি করা হয় শত শত ভুয়া ও জাল বিল-ভাউচার। জাল করা হয় দাখিলকারী বিভিন্ন বিভাগের সিল ও স্বাক্ষর। অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিল-স্বাক্ষর জাল করে এসব বিল-ভাউচার অনুমোদনও করিয়ে নেয়া হয়। বৈধ বিল-ভাউচার পরিবর্তনও করা হয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে। এ পন্থায় আত্মসাৎ করা হয়েছে বেসরকারি প্রাইম ব্যাংকের প্রায় ৪ কোটি টাকা।
এর মূল সুবিধাভোগী ব্যাংকের দুই ফ্যাসিলিটি স্টাফ মো. সালমান এফ রহমান ওরফে বাবু ও মো. জুলফিকার আলী ওরফে জুয়েল। মাত্র ৫ হাজার টাকা বেতনের কর্মচারী হলেও ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ করে দুজনই এখন কোটিপতি।
সালমান এফ রহমানের বাড়ি ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার কোন্দারদিয়া গ্রামে। বাবার নাম মো. আলতাফ হোসেন। আর জুলফিকার আলীর বাড়ি মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর উপজেলার মুন্সীকান্দি কাটাখালী গ্রামে। তার বাবার নাম মো. আলী জিন্নাহ। দুজনই এনকেএন সিকিউরিটি অ্যান্ড এমপ্লয়িজ সার্ভিসেস লিমিটেডের কর্মচারী। টাকা আত্মসাতের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর থেকেই তারা পলাতক। যদিও প্রাইম ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে রাজধানীর মতিঝিল থানায় একটি মামলা করেছে। মামলাটি তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় প্রাইম ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ফিন্যান্সিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিপার্টমেন্টের (এফএডি) সিনিয়র নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফজলুর রহমান পাটোয়ারি বাদী হয়ে গত বছরের ৯ মার্চ মামলাটি দায়ের করেন। সালমান এফ রহমান ওরফে বাবু ও জুলফিকার আলী ওরফে জুয়েল ছাড়াও মামলায় আসামি করা হয়েছে এফএডি বিভাগের সাবেক ক্যাশিয়ার-কাম ক্যাশ প্রদানকারী কর্মকর্তা শাহজাহান আলী সরকার ও অথরাইজ কর্মকর্তা মীর মো. সাইফুল ইসলামকেও।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়সহ বিভিন্ন্ন বিভাগের দৈনন্দিন খুচরা খরচাদি যথা— যাতায়াত ভাড়া, আপ্যায়ন খরচ, স্টেশনারি, লন্ড্রি, ক্লিনিক বিল এবং সংবাদপত্র ক্রয় বাবদ বিলসহ সংশ্লিষ্ট ব্যয় মেটানোর জন্য প্রধান কার্যালয়ের এফএডি থেকে নগদ টাকা উত্তোলনের বিধান রয়েছে। এটি ব্যাংকের ‘পেটি ক্যাশ’ নামে পরিচিত। কিন্তু খুচরা খরচাদি হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেয় প্রাইম ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। বিভাগীয় তদন্তে দেখা যায়, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, বৈধ ভাউচার পরিবর্তন ও কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর জাল করে ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। বিল-ভাউচার আনা-নেয়া ও জমা দেয়ার কাজে নিয়োজিত ফ্যাসিলিটি স্টাফ সালমান এফ রহমান ওরফে বাবু ও জুলফিকার আলী ওরফে জুয়েল ব্যাংকের এফএডি বিভাগের শাহজাহান আলী সরকার এবং মীর মো. সাইফুল ইসলামের সহায়তায় ২০০৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এ পদ্ধতিতে ৩ কোটি ৯২ লাখ ১৯ হাজার ১৪ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ব্যাংকের অনুসন্ধানে এ দুই কর্মচারীর নামে-বেনামে বিপুল সম্পদেরও খোঁজ পাওয়া যায়। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর পরই সালমান এফ রহমান ওরফে বাবু ও জুলফিকার আলী ওরফে বাবু গা ঢাকা দেন। আর ব্যাংক কর্মকর্তা শাহজাহান আলী সরকার ও মীর মো. সাইফুল ইসলামকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
মামলার এজাহারে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, আসামিদের ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে টাকা আত্মসাতের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। জালিয়াতির বিষয়টি জানার পর ব্যাংকের পক্ষ থেকে পুঙ্খানুপঙ্খভাবে অনুসন্ধান করা হয়েছে। জালিয়াতির দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ ও নিরীক্ষণের মাধ্যমে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এ ব্যাপারে সালমান এফ রহমান ওরফে বাবুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
জানতে চাইলে প্রাইম ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের এফএডি বিভাগের সিনিয়র নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদুল ইসলাম আরমান বলেন, ব্যাংকের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় দায়ের করা মামলার বাদী ফজলুর রহমান পাটোয়ারী অন্যত্র চলে যাওয়ায় তিনি সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন। ব্যাংক থেকে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ব্যাংকের দুই কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এছাড়া দুজন ফ্যাসিলিটি স্টাফ এখনো পলাতক রয়েছেন। এ ব্যাপারে মানবসম্পদ বিভাগ থেকে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেয়া হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী সংস্থা দুদকের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে প্রাইম ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে কর্মচারী-কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
সূত্র : বণিক বার্তা
আপনার মন্তব্য