নিউজ ডেস্ক

২৭ মার্চ, ২০১৫ ১৪:৪৪

যে কারণে ফারসীমের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলো

২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের চাপাতির আঘাতে খুন হন লেখক, গবেষক, ব্লগার ড. অভিজিৎ রায়।

ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী

লেখক, গবেষক, ব্লগার ড. অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেকট্রিকেল এ্যান্ড ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীকে গোয়েন্দা কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এমনকি ঢাকা ছাড়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে পুলিশ।

গোয়েন্দা পুলিশের সূত্র মতে, জিজ্ঞাসাবাদে ব্যাপক গরমিল থাকার কারণে তাঁর ওপর এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশ এখনও নিশ্চিত না ফারসীম মোহাম্মদী এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত কীনা কিন্তু তাঁকে সন্দেহের বাইরেও রাখছে না তারা।

নিহত অভিজিৎ রায়ের বাবা ড. অধ্যাপক অজয় রায়ের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে বুয়েটের শিক্ষক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীকে ডিবি পুলিশ মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) বেলা তিনটা থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাতের বেলায় ছেড়ে দেয়।

জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ডিবির একজন কর্মকর্তা জানান, বুয়েটের ইলেকট্রিকেল এ্যান্ড ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীকে অভিজিত হত্যাকাণ্ডের মামলার বিষয়ে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টাব্যাপী জিজ্ঞাসাবাদ করেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তিনি জিজ্ঞাসাবাদের জবাবে বলেছেন, বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত বিষয়ে অভিজিতের সঙ্গে আলাপ করেছেন। তাঁর কাছে ১০ মিনিটের মতো ছিলেন অভিজিৎ রায় ও তাঁর স্ত্রী। অথচ অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী বন্যা আহমেদ বলেছিলেন তারা অভিজিতের বই নিয়েই বেশি আলোচনা করেছিলেন।

ফারসীম বলেছেন- অভিজিৎকে ফেসবুকের মাধ্যমে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তার দেওয়া তথ্যের সঙ্গে অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের সময়ে তার সঙ্গে থাকা গুরুতর আহত স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা তার শ্বশুর অধ্যাপক অজয় রায়কে যে তথ্য দিয়েছেন তার সঙ্গে ব্যাপক গরমিল পেয়েছে ডিবি পুলিশ।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৯টার দিকে বইমেলা থেকে ফেরার পথে টিএসসির সামনে দুর্বৃত্তরা চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে বিজ্ঞানমনষ্ক লেখক অভিজিত রায় ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে। তারপর হাসপাতালে নেয়ার পর অভিজিতের মৃত্যু ঘটে এবং স্ত্রী বন্যা দুই দিন বাংলাদেশে চিকিৎসা শেষে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।

বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অভিজিত দম্পতি। বন্যা যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে ও পরে তার শ্বশুর অধ্যাপক অজয় রায়কে অভিজিত ও তার ওপর হামলার ঘটনার রাতের অনেক ঘটনা বর্ণনা করে তথ্য দিয়েছেন। এই মামলার তদন্ত কাজ গোয়েন্দা পুলিশের পাশাপাশি করছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশান (এফবিআই)।

গোয়েন্দা পুলিশ সূত্র জানায়, বন্যা তার শ্বশুর অজয় রায়কে যে তথ্য দিয়েছেন তাতে দেখা যাচ্ছে, অভিজিৎ ও তার স্ত্রী বন্যা অনেক আগে থেকেই চিনতেন বুয়েট অধ্যাপক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীকে। ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী অভিজিৎকে বই মেলায় আসার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ‘টেলিফোনে’।

শুদ্ধস্বরের পরে বইমেলার একটি উন্মুক্ত স্থানে বসে আলোচনা করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমন্ত্রণ গ্রহণ করে সেখানে যান অভিজিৎ। ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী বলেছেন, বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বন্যা তার শ্বশুর অজয় রায়কে যে তথ্য দিয়েছেন তাতে বলা হয়েছে, অভিজিতের বই নিয়ে আলোচনা হবে।

অভিজিৎ আসতে পারবে কি না সেই বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন ফারসীম মান্নান। অভিজিৎ উত্তরে বলেছিলেন, আসতে পারব। অভিজিত আসতে পারার সময়ে বলেছিলেন, আমি শুদ্ধস্বরের এখানে একটি প্রোগ্রাম করছি। এই প্রোগ্রাম শেষে তোমাদের (ফারসীম) ওখানে যাব। তারপর ফারসীমের কাছে যান অভিজিত ও তার স্ত্রী বন্যা। শুদ্ধস্বরের বেশ কয়েকটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানেও ছিলেন ফারসীম মান্নান ও অভিজিৎ রায়।

অভিজিত বই মেলায় যাওয়ার আগেই টেলিফোনে যখন কথা হয় তখন জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, ওখানে আর কে কে আসবে? ফারসীম তাঁকে (অভিজিত) বলেছিলেন আসীফ আসবে। আসীফও একজন ব্লগার ও আর্টিকেল লিখে এবং বক্তৃতা দেন। বন্যা যে তথ্য দিয়েছেন তাতে তাদের যাওয়ার কথা ছিল বিকেল ৫টায়। তখন তাদের (অভিজিত দম্পতি) বলা হয়েছিল, ৫টায় লোকজন আসবে না। তোমরা ৭টা, সাড়ে ৭টার দিকে আসো।

অভিজিৎ দম্পতি সেখানে গিয়ে দেখেন ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীসহ ওখানে বসে আছেন অপরিচিত কয়েকজন। অভিজিৎ দম্পতি তখন জিজ্ঞেস করেন আসীফ কই? নিত্য কোথায়? ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীর উত্তর ছিল, ওরা আসবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওরা আর আসেনি। তারপর সেখান থেকে ফিরে আসেন অভিজিৎ দম্পতি। ফেরার পথে খুন হন অভিজিত ও গুরুতর আহত হন তার স্ত্রী বন্যা।

অভিজিৎ রায়ের বাবা অজয় রায় সংবাদ মাধ্যমকে বলেছিলেন, সম্ভবত এটা এ্যারেঞ্জইড। তবে ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীর ভূমিকা হয়ত বা ইনোসেন্টলি (নির্দোষভাবে) হতেও পারে। তবে তার (ফারসীম) সঙ্গে কথা বলব আমি (অজয় রায়)। তারা দু’জনে কথাও বলেছিলেন। অজয় রায়ের কথা হচ্ছে, ফারসীম ইনভলবড, তা হয়ত বা নাও হতে পারে। কিন্তু সে হয়ত বা ইনোসেন্টলি কাজটা করেছে।

কিন্তু ডিবির কর্মকর্তাদের প্রশ্ন হচ্ছে, ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী অভিজিৎ মার্ডারের সঙ্গে ইনভলবড আছে কি নেই সেটা তদন্তে আসবে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার জন্য ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীই যে অভিজিৎ দম্পতিসহ আরও যাদের সেখানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, এটা দিবালোকের মতো সত্যি। তিনি কাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তা তিনিই জানেন। আর আসীফ ও নিত্যসহ অন্যরা আসলেন না কেন? অনাহুত অপরিচিত যারা উপস্থিত ছিলেন তারা কারা? আর অভিজিৎ রায়কে দেখে আগে থেকে উপস্থিত থাকা কয়েকজন বৈঠক তাদের হারিয়ে যাওয়া বই খোঁজার অজুহাত দেখিয়ে থেকে চলে গেলো আর তারা ফেরতই বা আসল না কেন?

এর উত্তর একমাত্র জানা ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীরই। এমনকি বন্যা যে তথ্য দিয়েছে তাতে বলা হয়েছে, অনাহুত অপরিচিতরা অভিজিৎকে সম্বোধন করেছিলেন ‘দা’। তাহলে তাদের (অপরিচিত) কেউ চিনিয়ে দিয়েছেন অভিজিৎকে। শুধু তাই নয়, অভিজিৎকে তারা (অপরিচিতি) বলেছেন, অভিজিৎ দা চলেন, আমরা চা খাই।

তারপরের ঘটনা হচ্ছে, এ সময় ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী ঘটনাস্থল (বইমেলা) থেকে চলে গেছেন। তারপর অভিজিৎ দম্পতিও চলে আসেন। তারপরই খুনের ঘটনা। খুন হয়ে যাওয়ার পর ফারসীম মান্নান ঘটনা জানার পর কেনই বা দেখতে হাসপাতালে গেলেন না, এমনকি এক বারের জন্যে লাশ দেখতেও না!

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, আসিফের সঙ্গে বন্যাদের কথা হয়েছে অনেক পরে। তখন বন্যাকে ও (আসীফ) বলেছে যে, আমাকে তো বলেনি। আসীফকে বলেনি, নিত্যকেও বলেনি। ফারসীম বলেছিলেন, আসীফ আমন্ত্রিত ছিলেন। কিন্তু ওরা যখন যায়, তখন আসীফ-নিত্য কেউ ছিল না।

আসীফ পরে বলেছে যে, ‘আমাকে তো নিমন্ত্রণও করা হয়নি’। মারা যাওয়ার পরে যখন আসীফকে বন্যা টেলিফোনে জিজ্ঞেস করেছিল। অভিজিৎ খুন হওয়ার পর, আসীফ ও নিত্যকে টেলিফোন করে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তাদের সেখানে আমন্ত্রণে গেলেন না কেন? আসীফ ও নিত্যর জবাব ছিল, তাদের তো আমন্ত্রণই জানানো হয়নি।

তাহলে যে ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী বলেছেন, আসীফ আসবে, নিত্য আসবে। আর অভিজিৎ যে সেখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আসীফ কই? নিত্য কোথায়? এসব প্রশ্নেরও উত্তরের মধ্যে নিহিত থাকতে পারে অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের রহস্যের জট।

এদিকে আসীফের উপস্থিত থাকা কিংবা আমন্ত্রণ পাওয়া প্রসঙ্গে ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী বলেছেন- আসীফ-নিত্যদের ফেসবুকের মাধ্যমে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অথচ ফেসবুকের ইনবক্সের মাধ্যমে আমন্ত্রণ জানালে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি যদি সে ইনবক্স দেখে থাকেন সেখানে ‘সিন’ লেখা ওঠে থাকে। যদি আসীফ মেসেজ না দেখে থাকেন তাহলে ফারসীম কীভাবে নিশ্চিত হলেন আসীফ সে আমন্ত্রণ দেখেছেন এবং উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে অভিজিৎ রায়ের পিতা শিক্ষাবিদ অজয় রায় একটি অনলাইন নিউজপোর্টালের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে যখন হত্যাকাণ্ডের দিনের এক বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলেন এর পর পরই ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী এর প্রতিক্রিয়ায় জানান সে বৈঠকে অপরিচিত কেউ ছিলেন না। হত্যাকাণ্ডের ১৫দিন পর এটাই ছিল তাঁর প্রথম কোন বক্তব্য।

এরপর ১৭ মার্চ ফারসীম মান্নান অজয় রায়ের সঙ্গে সেখা করেন এবং এরপর ফেসবুকে দেখা হওয়ার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে লিখেন তিনি তাঁর (অজয় রায়) ভুল ভাঙাতে পেরেছেন। এর একদিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক নাগরিক শোকসভায় অজয় রায় পরিষ্কারভাবে ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীকে সন্দেহ করছেন বলে জানান।

অজয় রায় আরও জানান তারা বিষয়টি গোয়েন্দা পুলিশকে জানিয়েছেন। এরপর ডিসি ডিবি মনিরুল ইসলাম প্রয়োজনে ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলার পর তাঁকে মিন্টো রোডস্থ গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে ডেকে পাঠিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং তাঁর দেওয়া তথ্যে গরমিল থাকার কারণে তদন্তকার্য সমাপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এমনকি ঢাকার বাইরে যাওয়ার ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করেন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত