নিজস্ব প্রতিবেদক

৩১ মার্চ, ২০১৫ ১৮:৪৩

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক : ক্রিকেটের তিক্ততায় বাড়ছে চাপ

বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী ভারত। দুই প্রতিবেশী দেশের জনগণেরই রয়েছে ক্রিকেট নিয়ে উন্মাদনা। সম্প্রতি বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচ নিয়ে দুই দেশের জনগণের আবেগ ভর করতে বসেছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে। মাঠের খেলায় ভেনু পরিবর্তন এবং প্রশ্নবিদ্ধ আম্পায়ারিং নিয়ে প্রথমেই শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিতর্ক।

ম্যাচে ভারতের জয়ের পেছনে বিতর্কিত আম্পায়ারিংয়ের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয় বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায় থেকে। বিষয়টি চাউর করে প্রকাশ করে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম। চাপা এ উত্তেজনা স্তিমিত হওয়ার আগেই বিশ্বকাপের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানকে ঘিরে আইসিসির প্রথাভঙ্গ যেন সেই আগুনে বাড়তি ঘৃতাহুতি দিয়েছে।

অতীতে সবসময় আইসিসি সভাপতি টুর্নামেন্ট চ্যাম্পিয়নের হাতে ট্রফি তুলে দিলেও এবার তাকে এড়িয়ে পুরস্কার তুলে দিয়েছেন আইসিসি চেয়ারম্যান। সব মিলিয়ে ক্রিকেটকে ঘিরে আবেগ চাপ সৃষ্টি করছে বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক মিথস্ক্রিয়ায়।

বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আম্পায়ারের বিতর্কিত সিদ্ধান্তকে ঘিরে খেলা শেষের আগেই বাংলাদেশের জনমানসে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ পক্ষপাতমূলক আম্পায়ারিংয়ের শিকার বলে মন্তব্য করেন আইসিসি সভাপতি এবং বাংলাদেশের পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বাজে আম্পায়ারিংয়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়ে বলেন, আইসিসির উচিত বিষয়টি তদন্ত করে দেখা। আইসিসির আসন্ন বৈঠকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার কথাও বলেন তিনি।

আইসিসি সভাপতির সুরেই যোগ দিয়েছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থার সংবিধান অনুযায়ী আইসিসির সভাপতির পদ চিফ এক্সিকিউটিভের চেয়ে বড় হওয়া সত্ত্বেও সভাপতির এ বক্তব্যের সমালোচনা করে তাকে সতর্ক করে দেন আইসিসির চিফ এক্সিকিউটিভ ডেভ রিচার্ডসন।

এ পুরো বিষয়টি আইসিসি চেয়ারম্যান ও ভারতীয় নাগরিক নারায়ণস্বামী শ্রীনিবাসনের নেতৃত্বে ঘটেছে বলে মনে করেন ক্রিকেটবোদ্ধারা। এদিকে আম্পায়ারের কারণে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারত জিতেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা; যা ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো ফলাও করে ছাপিয়েছে।

সেই সঙ্গে দুই দেশের সাধারণ জনগণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাকযুদ্ধে লিপ্ত। আর নিয়ম ভঙ্গ করে সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামালের বদলে গত রোববার মেলবোর্নে ফাইনাল শেষে বিজয়ী দলের হাতে ট্রফি তুলে দিয়েছেন আইসিসি চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন। এটিকে চক্রান্ত উল্লেখ করে এর বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নামবেন বলে জানিয়েছেন আইসিসি সভাপতি মুস্তফা কামাল। ফলে খেলা নিয়ে উন্মাদনা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে কিছুটা শীতলতা সৃষ্টি করতে পারে বলে ধারণা করছেন কূটনীতিকরা।

এ বিষয়ে একাধিক সাবেক কূটনীতিক বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। মূলত এটি দুই দেশের সাধারণ জনগণের মানসের প্রতিফলন। দুই দেশের সম্পর্ক বর্তমানে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। ফলে দুই দেশের জনগণ যদি একে অন্যের প্রতি বৈরিতার মধ্যে থাকে, তবে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে দুই সরকারকেই বেগ পেতে হবে। এ সময়ে আইসিসি সভাপতি মুস্তফা কামালের সঙ্গে যে চক্রান্ত করা হয়েছে, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।

তবে বাংলাদেশ আইসিসিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার পরও পুরো বিষয়টি নিয়ে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, তা ঠিক হয়নি বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি বলেন, আইসিসির প্রেসিডেন্ট মুস্তফা কামালের ব্যক্তিগত মত থাকতেই পারে। তিনি কোনো কথা বলা মানে আইসিসি বলা। ওনার উচিত ছিল বিষয়টি তাত্ক্ষণিকভাবে সামাল দিয়ে পরবর্তীতে নির্দিষ্ট ফোরামে বিষয়টি তুলে ধরা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে বিষয়গুলো নিয়ে যে মন্তব্য করা হয়েছে এবং আইসিসি সভাপতির সঙ্গে যা করা হয়েছে, তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবগত। এর বেশি এ মুহূর্তে কিছু বলা সম্ভব নয়। কারণ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বেশ সংবেদনশীল।

দুই দেশের জনগণেরই ক্রিকেট নিয়ে উন্মাদনা রয়েছে উল্লেখ করে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ূন কবির বলেন, বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কে উভয় দেশের জনগণের চিন্তাধারার বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে। আম্পায়ারের কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশকে যথাযোগ্যভাবে তার মেধা দেখাতে দেয়া হয়নি; যার সুফল ভোগ করেছে ভারত।

আগের সমাপনী অনুষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এবারেরটার পার্থক্য রয়েছে। এতে জনগণের ধারণা হতেই পারে যে, আইসিসি চেয়ারম্যান ভারতীয় নাগরিক হওয়ায় আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার জের ধরে বাংলাদেশকে প্রক্রিয়ার বাইরে রাখতে পারেন। এ থেকে একটি ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ তৈরি হয়েছে; যা দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা প্রভাব ফেলবে। এটি না হলেই ভালো হতো।

তবে ক্রিকেট উন্মাদনা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে না বলে আশা করেছেন অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি বলেন, আশা করি বিষয়টি অত দূর গড়াবে না, যাতে দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে।

বিভিন্ন দেশের খেলা নিয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যে উন্মাদনা নতুন কিছু নয়। ভারত-পাকিস্তান বা আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল কিংবা অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের খেলা হলে দুই দেশের জনগণের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় বেশ বিরোধ দেখা যায়। তবে তা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলে না। ফলে এক্ষেত্রেও আশা করি বিষয়টি কূটনৈতিক সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

এ বিষয়ে জানতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত