নিজস্ব প্রতিবেদক

০৩ এপ্রিল, ২০১৫ ২১:২৮

খুনিদের ধরিয়ে দেওয়া ‘লাবণ্য হিজড়া’র গল্প

নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত হয় লাবণ্যের গল্প

ছবি: লাবণ্য, নিউইয়র্ক টাইমসের সৌজন্যে

লাবণ্য তাঁর নাম। নিজেকে পরিচয় দেন লাবণ্য হিজড়া বলে। তৃতীয় লিঙ্গ কিংবা শিখণ্ডী সম্প্রদায়ের অসম সাহসী এই লাবণ্যের কারণে ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিস্ট ওয়াশিকুর বাবুর দুই হত্যাকারী ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার পথে ধৃত হয়।

যে গল্প অনেকেই জানে না। এবার জানা গেল সেই গল্প। সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত জায়গায় অবস্থান করা লাবণ্য সেদিন দেখিয়েছিলেন অসম সাহসের পরিচয়। সিলেটটুডে২৪ডটকমে ঘটনার দিনই (৩০ এপ্রিল) ব্লগার ওয়াশিকুর হত্যা: খুনিদের ধরিয়ে দিলেন দুই "শিখণ্ডী"  শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এবার পরিচয় পাওয়া গেল তাঁদের। পাওয়া গেল অনেক অজানা কথা; কষ্টগাঁথা।

অসম সাহসী  লাবণ্য হিজড়ার সাহসিকতার  ঘটনা বর্ণনা করেছে নিউইয়র্ক টাইমস। শিরোনাম করেছে- A Transgender Bangladeshi Changes Perceptions After Catching Murder Suspects.

রাজধানী ঢাকার একটি গিঞ্জি এলাকায় বাস করে লাবণ্য বলেন- আমরা হিজড়া সম্প্রদায়, আমরা এই সমাজে কোন সন্ত্রাসী কার্যকলাপ হোক তা চাই না। তিনি জানান- ঘটনার দিন ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় পালিয়ে যাওয়া খুনিদের দেখে তিনি ঝাপটে ধরে ফেলেন। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে একজন পালিয়ে গেলেও বাকি দুইজনের টি-শার্ট আঁকড়ে ধরে রাখতে সক্ষম হন। ওই অবস্থায়  পুলিশ ও স্থানীয় জনতা দৌড়ে  এসে তাদের ঘিরে ফেলে। এসময় সাথে তাঁর গুরু স্বপ্না হিজড়াও ছিলেন।

এক খুনি পালিয়ে যাওয়ায় তিনি একটু ভয় পেয়েছিলেন, সে যদি তাঁর চেহারা মনে রাখে তবে প্রতিশোধ নিতে পারে।তাই তিনি ওই দিন আর প্রকাশ্যে আসতে চাননি বলে জানান। কিন্তু ওই ঘটনার পরে তিনি খেয়াল করে দেখেছেন সবাই তাকে শ্রদ্ধা করা শুরু করেছে।লাবণ্য বলেন "যদিও অনেকেই জানে না আমিই মূলত এই কাজ করেছি। এর পরেও যারা জানতে পেরেছে তাঁরা হিজড়া হিসেবে  আমাকে শ্রদ্ধা করা শুরু করেছে"।

পুলিশ ও মিডিয়ার লোকজন ৩ দিন থেকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে বৃহস্পতিবার বের করে তাঁদের ঠিকানা। পুলিশ অসম সাহসী অবদানের জন্য তাঁদের পুরস্কৃত করতে চায়।  যদিও নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁদের চেহারা জনসম্মুখে প্রচার যাতে না হয় সেজন্য সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা নেয়া হয়েছে।

প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়- পরের কয়েকদিন তিনি জানতে পারেন নিজেকে পরিচয় না দিলেও তিনি অপরাধীদের ধরিয়ে দেওয়ার মতো একটি বিশাল কাজ করেছেন এবং মানুষের প্রভূত শ্রদ্ধা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। এটা হিজড়া সম্প্রদায়ের জন্যে এক বিশাল অর্জন। নিজের দুঃসহ জীবনের কথা স্মরণ করে তিনি জানান- একটি টিনশেড বাসায় বসবাস করেন তাঁরা এবং ভিক্ষা করে চলার মত আয় করেন।

তিনি বলেন  - আমাদের নিজের কোন স্বাভাবিক জীবন নেই, কখনও কখনও নিজে নিজেকে ঘৃণা করি। কিন্তু অপরদিকে কিছু লোক আমাদের ভালোবাসে কারণ আমরা অসহায় ও বঞ্চিত। লাবণ্যের গুরু স্বপ্না হিজড়া বলেন- পুলিশ বলেছে পুরষ্কার দিবে । হ্যাঁ, আমিও আশা করতে পারি পুরষ্কারের কারণ আমরা দুই সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিয়েছি।'

বর্তমানে ২১ বছর পেরুনো লাবণ্যর বয়স যখন ৯ বছর তখন আবিষ্কৃত হয় তিনি অন্য ৮/১০ জনের মত না, তিনি এমন একটি লিঙ্গের মানুষ যার জন্য তাঁর সব আত্মিয় স্বজন তো বটেই তাঁর নিজের বাবা-মাও অস্বস্তিবোধ করে দূরে সরে যায়।

পুরুষ কিংবা নারী এই দুই লিঙ্গের বাইরে হবার কারণে তিনি পড়ে যান এক নির্মম অমানবিক অবস্থায়। কচি বয়সে সামাজের লৈঙ্গিক বৈষম্যের শিকার হয়ে  পরিবারের বাইরে চলে যেতে বাধ্য হন। সেসময় থেকেই তাঁকে আশ্রয় দেন স্বপ্না হিজড়া। এরপর  স্বপ্নার সাথেই জীবনযাপন করছেন তিনি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত