সিলেটটুডে ডেস্ক

০৬ এপ্রিল, ২০১৫ ১৬:২১

সোহাগপুরের ‘বিধবাপল্লীতে’ স্বস্তি

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় শেরপুরের নলিতাবাড়ি উপজেলার সোহাগপুরে ১২০ পুরুষকে হত্যা করে তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা মোহাম্মদ কামারুজ্জামান ও তার দল।
একসাথে এত পুরুষের হত্যার পর থেকে সেই গ্রাম হয়ে যায় একেবারে পুরুষশূন্য। তখন থেকেই ওই গ্রামের নাম  বিধবাপল্লী।  

যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায়ের খবরে  সোহাগপুরের বিধবাপল্লীর বিধবা জবেদা বেওয়া বলেন- ‘কামারুজ্জামানরে সরকার তাড়াতাড়ি ফাঁসি দিয়া মারলে আমরা বিরাট খুশি অই। সে আমগর স্বামী, বাপ আর এলাকার পুরুষ মানুষগো যেমনে মারছে আল্লাহ তার বিচার করতাছে। বারে বারে বাঁচপার লাইগা চাইলেও সে বাঁচপার পাইতো না। তার মরণই লাগবো’।

এই শহীদজায়ার স্বামীকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

ট্রাইব্যুনালে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী বিধবা হাফিজা বেওয়া (৬০) বলেন, ‘কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওনের পর থাইকা রাইতে (রাতে) ঠিকমতো ঘুমাইবার পাইতাম না। গত বছর যহন ফাঁসির রায় অয়, তহন আমরা বিরাট খুশি অইছিলাম। কিন্তু বারে বারে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করনের পর থাইকা মনের মধ্যে সারাদিন দুশ্চিন্তা কাম করতো। এহন ফাঁসির রায় বহাল থাহুনে হেই ডরডা কাইটা গেছে।

সোহাগপুরে গণহত্যায় হাফিজার স্বামী ইব্রাহীমসহ পরিবারের সাত সদস্যকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। হাফিজা খাতুনের বাড়ি সোহাগপুর গ্রামের বেনুপাড়ায়, যা এখন বিধবাপল্লী নামে পরিচিত।

একাত্তরের ২৫ জুলাই আলবদর, রাজাকার ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল সেখানে। বেনুপাড়ার বসবাসরত  পুরুষের সবাইকে হত্যা করে পাড়াটিকে পরিণত করা হয়েছিল বিধবাপল্লীতে।
 
সেদিন যারা বিধবা হয়েছিলেন তাদের মধ্যে হাফিজাসহ ৩১ জন বেঁচে আছেন।

কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগের মধ্যে অন্যতম অভিযোগ হলো সোহাগপুরে হত্যাযজ্ঞ ও ধর্ষণ। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গত ২০১৩ সালের ৯ মে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। এ রায়ের বিরুদ্ধে কামারুজ্জামানের পক্ষ থেকে ওই বছরের ৬ জুন আপিল করা হলে সেই আপিলের রায়েও মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।

পরে গত ৫ মার্চ আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিভিউ আবেদন করা হয়। সোমবার সকালে সেই রিভিউ আবেদনও খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ।

এই খবরের পরই সোহাগপুর গ্রামে  একাত্তরে স্বামী-ছেলেহারা নারীদের চোখে দেখা যায় আনন্দ অশ্রু। তাদের স্বজন ও গ্রামবাসী এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত তা কার্যকর করার দাবি জানান।একাত্তরে স্বামীহারা করফুলি বেওয়াও সাক্ষ্য দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনালে। তিনি  বলেন, সাক্ষ্য দেওয়ার পর থাইকা রাতে ঘরের চালে কারা যানি (যেন) ডেল মারতো। কেউ কেউ ডর (ভয়) দেহাইতো। সরকার বইদলা (পরিবর্তন) গেলে নাহি, আমগর উল্ডা বিচার করবো। এর লাইগা সারা বেলা বিরাট ভয়ে ভয়ে থাকতাম। ফাঁসির রায় বহাল থাহুনে আমাগর মনে স্বস্তি ফিইরা আইছে।

আরেক শহীদজায়া হাছেন বানু বলেন, তেতাল্লিশ বছর ধইরা আল্লাহর কাছে একটাই প্রার্থনা করছি- যারা আমাগর স্বামী-সন্তানগো মারছে, নারীগর উপরে যারা অত্যাচার করছে, তাগর বিচার যেন অয়। মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল থাহায় প্রমাণ অইলো যে, ৩০ দিন চুরের একদিন গেরস্তের। রাজাকার কামারুজ্জামান বারে বারে বাঁচনের লাইগা চেষ্টা করলেও আল্লাহ তো একজন আছেন, তিনি আমাগরে খুনির বিচার দেহাইয়া কবরে নিবের লাইগা এহনো বাঁচাইয়া রাখছেন। অহন তাড়াতাড়ি কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর দেইখা মরবার চাই।

শহীদ পরিবারের সন্তান ও বিধবাপল্লী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক জালাল উদ্দিন বলেন, ট্রাইব্যুনালে আমি, হাফিজা বেওয়া, করফুলি বেওয়া ও হাছেন বানু দেহা (প্রত্যক্ষদর্শী) সাক্ষ্য দিছি। কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে আমার বাবাসহ ১২০ জন গ্রামবাসীকে নির্বিচারে হত্যা করা হইছে। তার ফাঁসির রায় বহাল থাহুনে বিধবাপল্লীর নারীসহ শহীদ পরিবারের লোকজন আনন্দিত। শহীদ পরিবারগুলোতে স্বস্তি ফিইরা আইছে। আমি বিরাট খুশি অইছি।

নালিতাবাড়ী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার শাহাবউদ্দিন জানান, কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল থাকায় এলাকার বিধবা ও মুক্তিযোদ্ধারা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাই। সেই সঙ্গে এই রাজাকারের ফাঁসি দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানাচ্ছি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত