০৭ এপ্রিল, ২০১৫ ১৯:৫৪
এক মুক্তিযোদ্ধা দাঁড়িয়ে গেছেন ঋজু হয়ে, ঘোষণা দিয়েছেন যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের লাশ শেরপুরে ঢুকতে দেওয়া হবে না। তিনি আর কেউ নন, যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের স্ত্রীর ভাই জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ইউনিট কমান্ডার এ.এস.এম.নুরুল ইসলাম হিরু।
এর আগে তিনি কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় ঘোষিত হওয়ার পর মিষ্টি বিতরণ করেছিলেন। কামারুজ্জামানের লাশ যাতে শেরপুরের মাটিকে ফের কলঙ্কিত করতে না পারে সে জন্যে ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছিলেন।
রিভিউয়ের রায়ে কামারুজ্জামানের ফাঁসির দণ্ড বহাল থাকার পর মঙ্গলবার তিনি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছেন লাশ প্রতিহত করতে।
সোমবার (৬ এপ্রিল) জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই সরগরম হয়ে উঠে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়। দলে দলে মুক্তিযোদ্ধারা জড়ো হতে থাকেন মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে। কামারুজ্জামানের ফাঁসি বহাল থাকায় সরকারের প্রতি অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি স্মৃতিচারণ করতে থাকেন ৭১’এর সেই রক্তঝড়া দিনগুলোর কথা।
কামারুজ্জামানের লাশ দাফন করতে না দেয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না ৭১’র নরঘাতক কামারুজ্জামানের লাশ শেরপুরের পবিত্র মাটিতে দাফন হোক। কামারুজ্জামানের দাফন প্রতিহত করতে মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকেই নকলা, নালিতাবাড়িসহ শেরপুরে প্রবেশের ৪টি পথে মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নিয়েছে।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী ও ৭১’র রণাঙ্গণের অকুতোভয় নায়ক এ.এস.এম.নুরুল ইসলাম হিরু ১৯৭৩-৭৪ সালে ছাত্র ইউনিয়নের প্যানেল থেকে শেরপুর সরকারি কলেজের ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) নির্বাচিত হন। এরপর দীর্ঘ সময় ওই সংগঠনের শেরপুর আঞ্চলিক কমিটির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ৭৫’র ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাকশাল যুবলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
কয়েক বছর পর রাজনীতির পাট চুকিয়ে চাকরি জীবনে প্রবেশ করেন। শিক্ষানবীশ কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডে। প্রায় ৩৪ বছরের কর্মজীবনের ইতি টানেন জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) হিসেবে।
১৯৯১ সালের গোড়ার দিক থেকেই স্থানীয় উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নেন। এখন দায়িত্ব পালন করছেন জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ইউনিট কমান্ডার হিসেবে।
এ সব পরিচয়ের বাইরে নিজের আরেকটি পরিচয় রয়েছে হিরুর। শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামান তার আপন ভগ্নিপতি। এটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি। ৭৯ সালের দিকে পারিবারিকভাবে কামারুজ্জামানের সঙ্গে নিজের বোনের বিয়ের সময় বাধা হয়ে দাঁড়ান তিনি। কিন্তু পরিবার বিয়ের সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় নিজের ছোটবোন নুরুন্নাহার জোৎসনার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেন হিরু।
কামারুজ্জামানের সঙ্গে নিজের বোনের বিয়ের সেই ট্র্যাজিক অধ্যায় প্রসঙ্গে একটি অনলাইন নিউজপোর্টালের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি বলেন, ‘বোনের বিয়ের সময় মাকে বলেছিলাম, একদিন মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসবে। তোমার মেয়ে বিধবা হবে। মা ও দুই ভাই সেদিন আমার কথা শোনেনি। এ কারণেই তাদের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক আমি ছিন্ন করেছি। আদর্শের সঙ্গে আমি কোন সময়ই আপোস করিনি।’
যুদ্ধকালীন কামারুজ্জামানের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ প্রসঙ্গে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের এ ইউনিট কমান্ডার বলেন, কামারুজ্জামান ৭১’এ নারকীয় হত্যাযজ্ঞের প্রধান হোতা ছিলেন। আমার ৩ বন্ধু বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের নেতা গোলাম মোস্তফা, কৃতি ফুটবলার কাজল ও শেরপুর সরকারি কলেজের ছাত্র আব্দুর রশিদসহ এলাকার নিরীহ মানুষ, প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িতদের ধরে এনে হত্যাযজ্ঞ চালান কামারুজ্জামান।
নালিতাবাড়ির সোহাগপুরে ১৮৭ জন পুরুষকে সশরীরে উপস্থিত থেকে দিনে-দুপুরে নির্মমভাবে হত্যা করান কামারুজ্জামান। যাদের সেদিন হত্যা করা হয় তাদের দাফন-কাফনও করতে পারেনি এলাকাবাসী, বলেই আবেগে আপ্লুত হয়ে ওঠেন হিরু।
আপনার মন্তব্য