১৫ এপ্রিল, ২০১৫ ০১:৩১
মনে হচ্ছিল যেন পুরো দেশ নেমে এসেছিল রাস্তায়! বর্ণিল মানুষের রঙিন সপ্রতিভ উপস্থিতি, চিরায়ত ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মিশেলে অদ্ভুত এক রঙ, মনে হচ্ছিল সারা বছরই মানুষ অপেক্ষায় থাকে এই এক দিনের জন্যে। পহেলা বৈশাখ; বাঙালির এক সার্বজনীন এক উৎসবের নাম!
গ্রাম থেকে শহর সবখানে উৎসবের আমেজ। হালখাতার সঙ্গে মিষ্টি ত ছিলই, সে সঙ্গে ছিল নিজেদেরকে রঙিন করে তোলার অনবদ্য প্রয়াস। পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের সবখানে, সব স্তরে, সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এক করে তোলার এক অনন্য মাধ্যম।
সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বয় আর বয়সের ভেদকে অতিক্রম করে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ রুখে দেওয়ার প্রত্যয় এবং আলোর পথে চলার শপথ গ্রহণের মধ্যদিয়ে জাতি বরণ করে নিল বাংলা ১৪২২ বঙ্গাব্দকে।
উগ্র মৌলবাদী হামলার ভীতি তুচ্ছ করে তেজোদীপ্ত বাঙালি সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে রুখতেই অসাম্প্রদায়িক চেতনার গান গেয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাল। রাস্তায় বেরিয়ে আসা মানুষের চোখেমুখে প্রস্ফুটিত হচ্ছিল অসাম্প্রাদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়।
অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল অনেক বেশি। তাই লাখো মানুষের বর্ণিল ও উচ্ছ্বল উপস্থিতির কারণে বর্ষবরণের আয়োজন রূপ নেয় জনসমুদ্রে।
চির নতুনের ডাক দিয়ে আসা পহেলা বৈশাখ যেন রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে বাঙালির মনে, যার প্রকাশ ঘটেছে নারী-পুরুষের রঙিন সাজে, শিশুদের মুখে ফুটে ওঠা আনন্দের হাসি আর বর্ণিল পোশাকে। সে সঙ্গে হাতে-মুখে ছিল বাহারি বাদ্য। গত কয়েক বছরের মতো এবারও অনেকের কাছে ভুভুজেলা থাকার কারণে কেউ কেউ বিরক্ত হচ্ছিল কিন্তু অনেকেই আবার উচ্ছ্বাসে ভাসছিল ভুভুজেলার স্বরে।
ফসলি সন নামে বাংলা বর্ষ গণনা চালু হয়েছিল কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের লক্ষ্যে। এটি চালু করেছিলেন মোগল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ সালে। এখন মোগল সম্রাটরাও নেই, চৈত্র মাসের শেষ দিনে খাজনা আদায়ও হয় না; কিন্তু বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষের প্রথম দিন উদ্যাপন এখন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উৎসব। সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণের দিক দিয়ে প্রধান উৎসব এটি, সে হিসেবে সার্বজনীন।
বাংলা বর্ষবরণ উদ্যাপনের ইতিহাস অনেক পুরনো, তবে বড় উৎসব হয়ে ওঠার ইতিহাস বেশি দিনের নয়। আকবরের সময় প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সব খাজনা, মাসুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। পরদিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টান্ন খাইয়ে আপ্যায়ন করতেন।
আয়োজন করা হতো মেলাসহ বিভিন্ন উৎসবের। এক সময় কেবল চারুকলা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হতো আর এখন সব বিভাগীয় শহরে, এমনকি জেলা শহরগুলোতেও চলে এমন আয়োজন। রমনা বটমূলের বৈশাখকে স্বাগত জানিয়ে অনুষ্ঠানের মতো এখন সারাদেশেই চলে বৈশাখ বন্দনা, স্বাগত জানানোর আয়োজন।
বৈশাখের রং লাল ও সাদা- এটা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে গত এক দশকে। এখনকার বৈশাখী পোশাকে এ রঙের প্রাধান্য দেখা যায়। বুটিক হাউসগুলো বৈশাখ উপলক্ষে বিভিন্ন পোশাক তৈরি করে, বিশেষ করে শাড়ি ও পাঞ্জাবি। গত এক দশকে একটু একটু করে এসব পোশাকের বড় বাজার তৈরি হয়েছে। দেশজুড়ে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার ফ্যাশন হাউস।
বিভাগীয় ও জেলা শহরে এখন ঘটা করেই বর্ষবরণ করা হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানে ঐতিহাসিক মেলাও বসে। সম্প্রতি নানা ধরনের মেলার চল হয়েছে বিভিন্ন এলাকায়। শহুরে শ্রেণির বাইরে গ্রামেও পহেলা বৈশাখে ঘরে ভালো রান্না করা এখন বিরল ঘটনা নয়।
দেশের অন্যান্য শহরগুলোর মতো বিভাগীয় শহর সিলেটেও দিনব্যাপি বিভিন্ন আয়োজনে পালিত হয়েছে পহেলা বৈশাখ। সিলেট বিভাগের অন্যান্য জেলা-উপজেলায় একইভাবে উৎসাহ উদ্দীপনায় উদযাপিত হয়েছে দিনটি।
সিলেটের সম্মিলিত নাট্য পরিষদ, শিল্পকলা একাডেমি, শ্রুতি, আনন্দলোক, এমসি কলেজ, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও পাড়াভিত্তিক বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন পালন করেছে দিনটি।
পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের স্পন্দন হলেও এর সাথে জড়িয়ে আছে সাম্প্রতিক এক বিয়োগান্তক ঘটনা। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন রমনার বটমূলে। বৈশাখকে স্বাগত জানিয়ে যখন শুরু হলো অনুষ্ঠান তখনই হঠাৎ বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে রমনার চারপাশ।
ঘড়িতে সময় তখন সকাল আট। সেটা ছিল বোমা বিস্ফোরণের ভয়ঙ্কর শব্দ। সেই বোমায় নিহত হন ১০ জন। এমন দিন পেছনে ফেলে এসেছে বাংলাদেশ। অপরাধীদের বিচারে নিম্ন আদালত থেকে শাস্তি ঘোষিত হয়েছে, মামলা এখন আপীল বিভাগে। শুনানি শুরু হবে শিগগিরই!
পহেলা বৈশাখ বাঙালি আর বাঙালিয়ানার প্রতীক। দেশব্যাপি এই দিনটিকে উৎসাহ উদ্দীপনার মাধ্যমে পালিত হয়েছে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া দেশে অপ্রীতিকর কোন ঘটনা ঘটেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছিল সতর্ক প্রহরায় বলে স্বস্তিতে বাঙালি উদযাপন করতে পেরেছে দিনটি।
আপনার মন্তব্য