সনেট দেব চৌধুরী, শ্রীমঙ্গল

০১ মে, ২০১৫ ০৯:১৯

চা বাগানের 'পাত্তিওয়ালি'- না আদিবাসী না বাঙালি !

খালি পায়ে বিশাল চা বাগানের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চয়ের পাতা তুলে তারা। চা বাগানের ভাষায় যাদের পরিচয় পাত্তিওয়ালি। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়েও তাদের নেই কোন চাকুরী কৌটা ।

সুপর্না ব্যানাজী শ্রীমঙ্গল খেজুরীছড়া চা বাগানের এক পাত্তিওয়ালির মেয়ে। সৌভাগ্যক্রমে সে হাইস্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজ হয়ে আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্রী। পড়াশুনা করছে সিলেট এমসি কলেজে।

তার মতো সৌভাগ্যবান সুরভি কর্মকার, দিপালী কর্মকার, প্রভা ব্যানাজী, মুক্তি মালাকার। কেউ পড়াশুনা করছে শহরের বালিকা বিদ্যালয়ে, কেউ বা সরকারী কলেজে। তবে তাদের সংখ্যা হাতে গোনা। অপরদিকে, বিন্তিয়া ব্যানার্জী, শিখা কর্মকার, রাখি নুনিয়ার মতো হাজারো তরুনী মেয়েদের সকাল থেকে বিকেল কাটে খোলা আকাশের নীচে। খালি পায়ে বিশাল চা বাগানের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চয়ের পাতা তুলে। চা বাগানের ভাষায় যাদের পরিচয় 'পাত্তিওয়ালি'।

তারা নিজ দেশে থেকেও পরবাসী। অথচ এসব পাত্তিওয়ালি পরিবারের পুরুষ সদস্যরা মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্ত্র হাতে পাক হানাদার বাহিনীদের সাথে মোকাবেলা করে অর্জন করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা খেতাব। অথচ স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর আজও দারিদ্রতার সাথে যুদ্ধ করতে হচ্ছে তাদের।

নিজ দেশে আজও তারা পরাধীন। মহান মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব গাঁথার স্বীকৃতি স্বরুপ চাকুরিতে তাদের সন্তানদের কৌটা বহাল থাকলেও চা শ্রমিকরা বঞ্চিত সেই কৌটা থেকে। এমন কী দেশে ৪৬টি জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে চাকুরীতে আদিবাসী কৌটা থাকলেও তা নেই চা শ্রমিকদের। তারা না  আদিবাসী; না বাঙ্গালী। কিন্তু তারা এদেশের সর্ববৃহৎ আদিবাসী।

 প্রায় ৭ লাখ চা শ্রমিকদের মধ্যে কর্মজীবি প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার। এদের মধ্যে ৯৭ হাজার চা শ্রমিক দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে যার অধিকাংশই নারী শ্রমিক। অথচ নিরক্ষর পিতা মাতার ঘরে জন্ম নেয়া এসব পাত্তিওয়ালিদের শতকরা পাঁচ ভাগের ভাগ্যে জুটে না প্রাথমিক শিক্ষা।

কথায় আছে মা যদি শিক্ষিত হয় তাহলে কন্যারা শিখতে পারে অনেক কিছু। কিন্তু হাতে গোনা যে ক’জন পাত্তিওয়ালি আজ শিক্ষিত হয়েছে তাদের অতীত থেকে বর্তমানের গল্পে নেই কোন সুখকর মূহুর্ত। ভোরের আলো ফুটতেই কাঁচা মাটির আট ফুট প্রশস্ত ঘর থেকে বের হয় তারা। কখনো নিজেরা আবারও কখনো একই ঘরে হাসঁ, মোরগ আর গরু, ভেড়ার সাথে বসবাস।

কী অদ্ভূত কী বিস্ময়কর জীবন। কিন্তু সেই জীবনকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে গ্রহন করে সুপর্না ব্যানাজী, দিপালী কর্মকার, প্রভা ব্যানাজী, মুক্তি মালাকার, বিন্তিয়া ব্যানার্জী কিংবা শিখা কর্মকারের মতো হাজার হাজার পাত্তিওয়ালিদের পিতা, মাতারা এখনো চান তাদের পুত্র কিংবা কন্যা সন্তানরা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হোক। দেশের গুরুত্বপূর্ণ কাজে অগ্রনী ভূমিকা পালন করুক। কারন সব কিছুর পরেও তারা এদেশের স্বীকৃত নাগরিক।

বিভিন্ন চা বাগান ঘুরে সাধারন শ্রমিক ও ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এক একটি চা বাগানে প্রাইমারী স্কুল পড়–য়া শিশুদের সংখ্যা ৩ থেকে ৪’শ কিন্তু স্কুলে যায় মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ জন। তাদের মধ্যে প্রাইমারী স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে হাই স্কুলে গিয়ে ভর্তি হয় মাত্র ৬ থেকে ৭ জন।

আর সেখান থেকে কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারে ২ থেকে ৩ জন। সে হিসাবে প্রাইমারী স্কুলগামী শিশুর সংখ্যা শতকরা ৩০ ভাগ হলেও কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তা দাড়ায় শতকরা পাঁচ ভাগ। কখনো কখনো তার চেয়েও কম। দেশের চা বাগানগুলোতে যে কয়েকটি বিদ্যালয় আছে সেগুলো বাগান কর্তৃপক্ষ চালালেও তার অবস্থা খুবই নাজুক। হাতে কলমে ৫ জন শিক্ষক থাকলেও বাস্তবে থাকেন ১জন। কখনও কখনও এই একজন শিক্ষক ক্লাস বাদ দিয়ে বাগানের অফিস খাতা তদারকি করেন।

চা বাগানগুলোতে নারী শ্রমিকদের অবস্থা আরো করুন। প্রতি নিয়ত কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাবে নারী শ্রমিকরা আক্রান্ত হচ্ছে। চা গাছ আর পাতার সংস্পর্শে এসব নারী শ্রমিকদের দুই হাত ও তলপেট চুলকায়। গত ত্রিশ বছর ধরে চা পাতা তোলার কাজ করা নারী শ্রমিকরা জানান, ক্ষতিকর কীটনাশকের প্রভাবে তাদের শরীর ফুলে যায়। ক্ষত হয় হাত ও তলপেটে।

যার ফলে ৮৫ ভাগ নারী চা শ্রমিক টিনিয়াসিস নামে চর্ম রোগে আক্রান্ত। এসব কাজের জন্য দেয়া হয়না কোন প্রশিক্ষন। রোদে পুড়ে, বৃষ্ঠিতে ভিজে, খালি পায়ে, জোঁক, মশা, সাপের কামড় খেয়ে দৈনিক ৬ থেকে ৮ ঘন্টা এসব নারী শ্রমিকদের কাজ করতে হয়। রক্ত শূন্যতায় ও অপুষ্ঠিতে ভূগছে বাগানের ৯০ শতাংশ নারী শ্রমিক। শিশুদের ক্ষেত্রে পুষ্ঠিহীনতার শিকার ৯২ শতাংশ।

চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সেবা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা প্রদানের জন্য চা বাগানের সাতটি ভ্যালীতে সাতটি শ্রম কল্যান কেন্দ্র থাকলেও তাদের সেবা পর্যাপ্ত নয় এমন অভিযোগ চা শ্রমিক নেতাদের।

নারী শিক্ষার অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী চা শ্রমিক নেতা পংকজ কন্দের অভিযোগের শেষ নেই। তার কথা- আমরা কোথায় আছি, না আদিবাসী না বাঙ্গালী। আমরা নিজ দেশে পরবাসী। শিক্ষা ক্ষেত্রে সমান অধিকার ও সুযোগ বলা হয় সভা, সেমিনারে।

বাস্তবে চা শ্রমিক নারীদের শিক্ষার হার নিুমূখী। এর প্রধান কারন অর্থাভাব, যোগাযোগ ও সুযোগ সুবিধা। তার ভাষায় অন্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য যদি সরকারের কৌটা নির্ধারন করা থাকে তবে আমাদের জনগোষ্ঠীর জন্য কৌটা ভিত্তি নেই। দেশের অর্থনীতিতে চা শ্রমিক নারী যে ভূমিকা পালন করছে তা গার্মেন্টেস শিল্পের সাথে জড়িতদের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। কিন্তু আমাদের সেই মা বোনদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করলে চা শিল্পে নারী শ্রমিকরা আরো অগ্রনী ভূমিকা পালন করতে পারবে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত