বদরুল আলম

০১ মে, ২০১৫ ১৪:১৬

পোশাক শিল্প : আয়ে শীর্ষে মজুরিতে নিম্নে দুর্ঘটনায় প্রথম

গ্রাম থেকে শহরযাত্রা। এর পর ঠিকানা খোঁজার সংগ্রামে কারখানা থেকে কারখানায় ঘোরা। কোনো একটিতে ঠাঁই মিললেই সুই-সুতার সঙ্গে নিবিড় সখ্য গড়ে তোলা। নামের সঙ্গে সেঁটে যাওয়া পোশাক শ্রমিক। সংখ্যায় যারা আজ প্রায় ৪৫ লাখ; তাদের শ্রমেই স্ফীত দেশের পোশাক খাত। রফতানি আয়ের নিরিখে চীনের পরই যার অবস্থান।

দেশের রফতানি আয়ের প্রধান খাতটিই আবার নিরাপত্তাহীনতায় সবার উপরে। বিশ্বে শিল্প দুর্ঘটনায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরিতেও রয়েছে নিচের সারিতে। বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন মজুরি পান বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকরা।

১৯৯৩ সালে পোশাক কারখানায় কোয়ালিটি ইনচার্জ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন রিতা আক্তার। মজুরি ছিল ৭০০ টাকা। এ মজুরিও মাঝে মধ্যে হয়ে গেছে অনিয়মিত। সময়ের সঙ্গে মজুরি বাড়লেও তা জীবনমানে খুব বেশি পরিবর্তন আনতে পারেনি।

রিতা আক্তারের ভাষায়, আগে বেশির ভাগ মালিকই সময়মতো মজুরি পরিশোধে গড়িমসি করতেন। নজরদারি বেড়ে যাওয়ায় এখন এ অবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। তবে সার্ভিস বেনিফিট বা শ্রমিকের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণে মালিকদের অবহেলা এখনো রয়েই গেছে।

বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিকদের কম মজুরির চিত্র উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রতিবেদনে। সংস্থাটি বলছে, শ্রমিকপ্রতি মাসে ৬৮ ডলার মজুরি পরিশোধ করেই পোশাক তৈরি করে নিতে পারছেন মালিকরা। পোশাক প্রস্তুতকারক শীর্ষ ২৫টি দেশের মধ্যে এটা দ্বিতীয় সর্বনিম্ন মজুরি। ন্যূনতম মজুরিতে বাংলাদেশের উপরে রয়েছে পাকিস্তান, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ভারত, মেক্সিকো, মিসর, তিউনিসিয়া ও এল সালভাদর। বাংলাদেশের নিচে রয়েছে কেবল শ্রীলংকা। দেশটির একজন পোশাক শ্রমিক মাসে মজুরি পান ৬৬ ডলার।

আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিকদের এ মজুরিকে মানসম্পন্ন বলে মনে করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মিকাইল শিপার। তিনি বলেন, প্রতি বছর এ মজুরি পর্যালোচনার বাধ্যবাধকতা যেমন রয়েছে, তেমনি পাঁচ বছর অন্তর পুনর্নির্ধারণও করা হবে।

শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরিতে নিচের সারিতে অবস্থান করলেও রফতানি আয়ে দেশের পোশাক খাত রয়েছে প্রথম সারিতেই। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) হিসাব বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাক রফতানির ৮৯ শতাংশই দখল করে আছে ১৫টি দেশ। এর মধ্যে চীনের হিস্যা এ বাজারে ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ। একক দেশ হিসেবে এর পরই রয়েছে বাংলাদেশ। গত অর্থবছরও ২৫ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছে বাংলাদেশ। ২০২১ সালের মধ্যে চীনকে টপকে রফতানি ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার কথা বলছে সরকার ও মালিকপক্ষ।

তবে শ্রমনিরাপত্তা নিশ্চিত না করে ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় কীভাবে সম্ভব, সে প্রশ্ন তুলছেন শ্রমিক প্রতিনিধিরা। বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল বলেন, তাজরীন ও রানা প্লাজা দুর্ঘটনা কর্মপরিবেশে নিরাপত্তাহীনতার সবচেয়ে বড় নজির। ওই ঘটনার পর বড় ধরনের ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে দেশের পোশাক খাত। বিদেশী ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ পাওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। এ অবস্থার উত্তরণ না ঘটলে ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।

তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর। পরের বছর ২৪ এপ্রিল ঘটে রানা প্লাজা দুর্ঘটনা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ১০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারানো রানা প্লাজা বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ভয়াবহ ১০ শিল্প দুর্ঘটনার মধ্যে আছে তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডও।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক খাতের মধ্যে পোশাক শিল্পে হতাহতের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। ২০১৩ সালে এ খাতে নিহত হন ১ হাজার ১৭০ জন। আহত হন আরো ১ হাজার ৭৪৮ জন। এর মধ্যে শুধু রানা প্লাজা দুর্ঘটনায়ই মারা যান ১ হাজার ১০০-এরও বেশি শ্রমিক। ২০১২ সালে শুধু তাজরীন অগ্নিকাণ্ডে মারা যান ১১২ জন পোশাক শ্রমিক।

রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর শুরু হয় পোশাক কারখানায় মূল্যায়ন কার্যক্রম। ইউরোপীয় ক্রেতা  জোট অ্যাকর্ড ও উত্তর আমেরিকার অ্যালায়েন্স এরই মধ্যে দুই হাজারের বেশি কারখানার প্রাথমিক পরিদর্শন শেষ করেছে। অ্যাকর্ডের তালিকাভুক্ত ১ হাজার ১০৬ কারখানায় ৮০ হাজার নিরাপত্তা সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে। অগ্নি, ভবনের স্থাপত্য ও বৈদ্যুতিক সমস্যা এর অন্যতম।

এসব সমস্যার মধ্যেই নতুন করে দেখা দিয়েছে ভূমিকম্প ঝুঁকি। সম্প্রতি টানা তিনদিনের ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে দেশ। আতঙ্ক ছড়ায় পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে। হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে আহতও হন অনেকে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনা ছিল শ্রম অধিকারের দীর্ঘ অবহেলারই বহিঃপ্রকাশ। ভবনধসের ঘটনাটি কর্মপরিবেশ সম্পর্কে বাংলাদেশকে বড় ধরনের শিক্ষা দিয়েছে। ওই শিক্ষা থেকেই পোশাক খাতের পাশাপাশি সার্বিক কর্মপরিবেশ উন্নয়নে এখন মনোযোগ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

পোশাক শিল্পে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন গরিব অ্যান্ড গরিবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল আহসান বলেন, একটি অগ্নিকাণ্ড ব্যবসাকে জটিল পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দেয়। সেই অবস্থা থেকে এখনো উত্তরণ সম্ভব হয়নি।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত