০৭ মার্চ, ২০১৯ ২২:১৯
ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়ে বৃহস্পতিবার শপথ নিয়ে সংসদ অধিবেশনেও যোগ দেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর। নিজের প্রথম সংসদ বক্তৃতায় তিনি বলেন, “অপ্রিয় হলেও সত্য এই সংসদে আজ যারা আছেন তারা একই জোটের পক্ষ থেকে নির্বাচিত হয়েছে। আমিই বোধহয় একজন নীলমনি- এই জোটের বাইরে অন্য জোটের পক্ষ থেকে নির্বাচিত হয়েছি।
মৌলভীবাজার-২ আসনের এই সাংসদ বলেন, সংসদে তিনি বলেন, “এই সংসদে ৯৯ শতাংশ হচ্ছে একজোটে আর আমি অন্য জোট থেকে রাজনীতি করছি। কিন্তু জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধুর প্রশ্নে কোনো আপস নেই। বাংলাদেশ জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু এক নামে পরিচিত। এখানে অনেকে অনেক কথা বলবেন। অনেক কথা বলেছেন। আগামী দিনের ইতিহাস নির্ণয় করবে আমরা সবাই কীভাবে যাব।”
একাদশ সংসদের সদস্য হিসেবে বৃহস্পতিবার সকালে শপথ নেওয়ার পর বিকালে গণফোরাম থেকে বহিষ্কৃত হয়ে সন্ধ্যায়ই সংসদ অধিবেশনে যোগ দেন ভোটে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জয়ী এই নেতা।
১৯৯৬ সালের সংসদে নৌকা প্রতীক নিয়ে মৌলভীবাজার-২ আসনে প্রতিনিধিত্ব করা সুলতান মনসুর এবার আইনসভায় বসেছেন বিরোধী দলের আসনে দ্বিতীয় সারিতে।
সংসদে যোগ দিয়েই এক অনির্ধারিত আলোচনায় দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “আমার আজকে ওইখানে (সরকারি দল) থাকার কথা ছিল। ওই জোটের (সরকারি দলের জোট) পক্ষেই তো আমি রাজনীতি করতাম। আজ থেকে ১৮ বছর আগে এই সংসদে আসার সুযোগ হয়েছিল।
“কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস রাজনীতির ছন্দপতনের কারণে হয়ত আল্লাহ তায়ালা কোনো কারণে .. আমি গত ১৮ বছর একটি রাজনৈতিক কারাগারের মধ্যে ছিলাম। যদিও এমপি ছিলাম না বা এই সংসদে ছিলাম না।”
ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মনসুর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকও হয়েছিলেন। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর সংস্কারপন্থি তকমা পাওয়ার পর দলে অপাঙক্তেয় হয়ে পড়েন তিনি।
কিছু দিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর আওয়ামী লীগেরই এক সময়ের নেতা কামাল হোসেনের সঙ্গে যোগ দেন তিনি। একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে কামাল বিএনপিকে নিয়ে জোট গঠন করলে তাতে তিনিও সক্রিয় হন। ঐক্যফ্রন্টের হয়ে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থীও হন তিনি।
কিন্তু এই ভোটে ঐক্যফ্রন্টের হয়ে মাত্র আটজন জেতার পর ভোট ডাকাতির অভিযোগ তুলে জোটের পক্ষ থেকে সংসদে না যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলেও তাতে আপত্তি জানান সুলতান মনসুর।
দলের হুমকি উপেক্ষা করেই বৃহস্পতিবার শপথ নেন তিনি। এই কারণে বিএনপি তাকে বলেছে ‘ছলনাকারী’। ‘প্রতারক’ আখ্যায়িত করে তাকে বহিষ্কার করেছে গণফোরাম।
ওই বহিষ্কারাদেশের পরই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের বৈঠক শুরু হলে সুলতান মনসুরকে দেখা যায় অধিবেশন কক্ষে।
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে আলোচনায় দাঁড়িয়ে সুলতান মনসুর বলেন, “আজকে যাকে নিয়ে আলোচনা ১৯৬৭-৬৮ সালে স্কুলছাত্র থাকা অবস্থায় যার নামে স্লোগান দিয়ে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলাম, সেই বিশ্বাস থেকে ব্যক্তিগতভাবে বিচ্যুৎ হইনি।
“যদিও জোটগতভাবে বা রাজনৈতিকভাবে বা আমার আজকের অবস্থানে হয়ত আমাদের নেতাদের ওই জোটে নেই কিন্তু আমি রাজনৈতিকভাবে বিশ্বাসের যায়গা থেকে ৫২ বছর আগে বিশ্বাস নিয়ে রাজনীতি শুরু করেছিলাম, সেই বিশ্বাসের জায়গা থেকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অবস্থানে থেকে নির্বাচন করে এই সংসদে এসেছি।”
সুলতান মনসুর বলেন, “৭ মার্চ আমি শপথ গ্রহণ করেছি। এই ঐতিহাসিক দিনে সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। এই সংসদে আমার নেতা আছেন। সহকর্মী আছেন। আমার কর্মীও আছেন। অনেক ভাই-বোনেরা আছেন। এখান সংসদ নেত্রী আছেন, যার ঘনিষ্ঠ হয়ে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছিল।”
তিনি বলেন, “শত প্রতিকূলতার মধ্যেও নির্বাচনী এলাকার মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এসেছি। সরকার প্রধান হিসেবে সংসদ নেতাকে ধন্যবাদ জানাই অন্তত আমার নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচনে সেইভাবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। অন্য কোথাও ঘটেছে, না ঘটেছে, তা অন্যদের বিবেকের আদালতে নিজেরাই বলতে পারবেন।”
সুলতান মনসুর বলেন, “মহাজোটের বিরোধী বিএনপিসহ অন্যরা আমাকে ভোট দিয়েছে, এটা ঠিকই। কিন্তু বঙ্গবন্ধু-জাতির পিতার অনুসারী সর্বস্তরের জনগণ আমাকে ভোট দিয়ে এই সংসদে পাঠিয়েছেন।
“মহাজোটের বিরোধী অন্য জোটের একজন ব্যক্তি হয়ে স্বাধীনভাবে জনগণ ও বাংলার মানুষের কথা যেন বলতে পারি, সাদাকে সাদা, কালোকে কালো যেন বলতে পারি এবং জনগণের কথা বলে সারাজীবন রাজনীতি যেন করতে পারি, সেই সহযোগিতা পাব বলে আশা করি। সংসদ নেত্রীও সেই দিকে বিবেচনা রাখবেন বলে আশা করি।”
বিএনপির প্রতীক নিয়ে ভোটের লড়াইয়ে নামলেও মুজিব কোট পরেই প্রচার চালিয়েছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সুলতান মনসুর। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েও বলেছেন, ‘জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু’।
যে লক্ষ্যকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু দেশকে স্বাধীন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সেই পথে যাচ্ছেন মন্তব্য করে সুলতান মনসুর বলেন, “সংসদের নেত্রী জাতীয় ঐক্যের কথা বলেছেন। কাজেই সেই জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে। মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা ও বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করে বঙ্গবন্ধুর মতো জাতীয় মনোভাব নিয়ে এগিয়ে গিয়ে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করতে হবে।”
আপনার মন্তব্য