বড়লেখা প্রতিনিধি

৩১ আগস্ট, ২০২০ ২০:৪৮

‘বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি, আর পারছি না’

বড়লেখা শহরে আকস্মিক পাহাড়ি ঢল

পারভেজ আহমদের (৩৫) মুদি দোকানে ঢলের পানি প্রবেশ করে মালামাল ভিজেছে। ছোট এই দোকানের আয়েই চলে তার সংসার। দোকানের ভেতর কোমর সমান পানিতে ডুবে যাওয়া জিনিসপত্র উদ্ধারের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। বেশিরভাগ জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। এনিয়ে গত কয়েক বছরে চার দফা ঢলের পানিতে তার চার লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

পারভেজ আহমদ বলেন, ‘রোববার সকাল পাঁচটা থেকে ঘরে পানি ঢুকেছে। আমার বাড়ি দূরে। খবর পেয়ে আটটায় এসে দেখি দোকানের ফ্রিজ, লবণ, চিনিসহ বিভিন্ন জিনিস নষ্ট হয়েছে। অনেক ক্ষতি হয়েছে। কেউ একবারও খোঁজ নিল না। আমি গরিব মানুষ। বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি, আর পারছি না। শহরে ড্রেনের সমস্যা আছে। বেশি বৃষ্টি হলে পানি নামতে পারে না। এর স্থায়ী সমাধান জরুরি।’ এরকম ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন অন্য ব্যবসায়ীরাও। তার দোকান মৌলভীবাজারের-বড়লেখা পৌর শহরের উত্তর চৌমুহনী এলাকায়।

শনিবার (২৯ আগস্ট) রাত ১১টা থেকে রোববার (৩০ আগস্ট) সকাল নয়টা পর্যন্ত বড়লেখা উপজেলায় ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়। এতে এইসব এলাকার ঘরবাড়ি ও দোকানে পানি ঢুকেছে। ঢলে প্রায় দুইশতাধিক দোকানের মালামাল ভিজে নষ্ট হয়েছে।

এছাড়া মৌলভীবাজার-বড়লেখা আঞ্চলিক সড়কের সাতটি স্থান তলিয়ে যাওয়ায় মানুষ দুর্ভোগে পড়েন। এর আগে আরও দুবছর বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তিন দফা শহর এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়েছে। এরপর পৌরসভার উদ্যোগে দুটি নদী খননের ফলে গত দু'বছর শহরে পানি ওঠেনি। ব্যবসায়ীরা মনে করেছিলেন তাদের দুর্ভোগ শেষ হয়েছে। কিন্তু দুর্ভোগ তাদের পিছু ছাড়েনি। দুবছর পর ফের বৃষ্টি আর ঢলে জলাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে পৌর শহরের উত্তর চৌমুহনী, কলেজ রোড, দক্ষিণবাজার, পাখিয়ালা, উপজেলা চত্বর, পানিদারসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়। এতে দুই শতাধিক দোকানে পানি উঠেছে। বাসাবাড়ি ও কলোনিতে পানি ঢুকেছে। এছাড়া মৌলভীবাজার-বড়লেখা আঞ্চলিক সড়কের কাঠালতলি, পানিদার, উপজেলা চত্বর, বড়লেখা থানা ও বড়লেখা-শাহবাজপুর সড়কের চৌমুহনী এবং কলেজ রোড এলাকায় সড়ক তলিয়ে যায়। এতে সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ ছোট যানবাহন চলাচল করতে পারেনি।

আকস্মিক এই ঢলে লোকজন ভোগান্তিতে পড়েন। লোকজন অতিরিক্ত টাকা দিয়ে ট্রাক, ট্রাক্টর ও ট্রলিতে করে নিমজ্জিত এলাকা পারাপার হয়েছেন। রবিবার বিকেল থেকে সড়কের পানি কমতে শুরু করে। রাত ৮টার মধ্যে সড়ক, দোকান ও বাসা বাড়ির পানি নেমে যায়। প্রায় ১২ ঘণ্টা স্থায়ী ছিল এই জলাবদ্ধতা। অপরদিকে এই ঢলে বিভিন্ন এলাকার পুকুর ও ফিশারির মাছ ভেসে গেছে। এতে অনেক খামারি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।

রোববার (৩০ আগস্ট) সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ব্যবসায়ীরা দোকান থেকে নষ্ট মালামাল সরাচ্ছেন। কেউ ভেজা মাল শুকিয়ে বিক্রির উপযোগী করছেন। মানুষজন ট্রাক, ট্রাক্টর ও ট্রলিতে করে সড়কের নিমজ্জিত অংশ পারাপার হচ্ছেন। আবার ঝুঁকি নিয়ে চলতে গিয়ে অনেক ছোট যানবাহন পানিতে নষ্ট হতে দেখা গেছে। জালসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে ঢলের পানিতে ভেসে আসা মাছ ধরতে দেখা গেছে অনেককে।

শহরের দক্ষিণ বাজারের নিউ তারাজ ফার্নিচারের মালিক রশিদ আহমদ সুনাম বলেন, ‘প্রায় দুই লাখ টাকার পারটেক্স বোর্ডসহ মালামাল নষ্ট হয়েছে। সকালে অন্যদিনের মতো দোকানে এসে দেখি মালামাল ভিজে গেছে।’

পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে পৌর এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়। এরপর পৌরসভা এলাকার সীমানার দুটি নদী নিখড়ি ছড়া ও ষাটমা নদী (পৌরসভা অংশে) খনন করা হয়। বেশ কিছু জায়গায় অবৈধ স্থাপনাও উচ্ছেদ করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়। এতে পরপর দুবছর বৃষ্টিতে পানি উঠেনি। কিন্তু পৌরসভার উজানে সদর ইউনিয়নের অংশে নদীগুলোর সব জায়গায় পাহাড় পর্যন্ত কোথাও দখল, কোথাও ভরাট রয়েছে। যার কারণে এবার ভারি বর্ষণ হওয়ায় নদীর পানি উপচে দ্রুত শহরের দিকে আসে। এছাড়া শহরের অভ্যন্তরে মানুষ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে রেখেছেন দীর্ঘদিন থেকে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা না করে মানুষ অপরিকল্পিত বাসাবাড়ি নির্মাণ করায় দ্রুত পানি প্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে পড়েছে। তাই ভারি বৃষ্টিতে শহরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

বড়লেখা পৌরসভার মেয়র আবুল ইমাম মো. কামরান চৌধুরী বলেন, ‘পৌরসভার উজানে সদর ইউনিয়ন অংশে নিখড়ি ও ষাটমা নদী খনন করা জরুরি। নদীগুলোর উজানে খনন করলে পানি দ্রুত নদী দিয়ে হাওরে চলে যাবে। শহরে জলাবদ্ধতা হবে না। এগুলো দখল ও ভরাটের কারণে ভারী বর্ষণ এবং ঢলের পানির ধারণ ক্ষমতা কমেছে। ফলে ওভার ফ্লো করে পানি শহরের দিকে চলে এসেছে।

এছাড়া শহরের অভ্যন্তরে পূর্ব পাশে বড়লেখা বাজার থেকে পানিদার পর্যন্ত সিঅ্যান্ডবির হাসিয়া (খাল) অবৈধ দখল করা হয়েছে দীর্ঘদিন আগে। শহরের পানি বের হওয়ার পথ নেই। এই দখল উচ্ছেদ করার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। প্রশাসনের সহযোগিতা দরকার। সিঅ্যান্ডবির হাসিয়া উদ্ধার করে খনন করলে এসব এলাকার পানি দ্রুত বের হয়ে যাবে শহর থেকে।’

আপনার মন্তব্য

আলোচিত