সিলেটটুডে ডেস্ক

২৯ জুলাই, ২০২৬ ২০:৫০

এনসিপিকে হবিগঞ্জে ঢুকতে দেয়নি পুলিশ, কামাইছড়া তদন্ত কেন্দ্রে নিল মামলার আবেদন

মঙ্গলবারের হামলার পর বুধবার হবিগঞ্জে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ডাক দিয়েছিল এনসিপি। পাল্টা কর্মসূচির প্রেক্ষিতে হবিগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। তবে এই ১৪৪ ধারা অমান্য করে হবিগঞ্জ পৌঁছাতে চেয়েছিল এনসিপি। দলটির কেন্দ্রীয় নেতারাও ছিলেন হবিগঞ্জ অভিমুখে। তবে পুলিশের বাধায় তারা হবিগঞ্জ যেতে পারেননি।

বুধবার এনসিপি নেতাদের গাড়িবহর চার স্থানে আটকে দিয়েছে পুলিশ। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা বাগবিতণ্ডা ও অবস্থান কর্মসূচির পর রাত ৮টার দিকে অভিযোগ দায়ের করেছেন এনসিপি নেতারা। 

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি হবিগঞ্জে মামলা করে ফিরে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। এজন্যে তারা হবিগঞ্জ শহরে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন। তবে পুলিশ তাতে রাজি হয়নি। শেষমেশ এনসিপি নেতারা হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজার সড়কের কামাইছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে গিয়ে অভিযোগ দায়ের করতে সম্মত হন।

এ সময় হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) তারেক মাহমুদসহ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত রয়েছেন৷

অভিযোগ দায়েরের পর ওই পুলিশ তদন্ত ক্যাম্পের সামনে নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, হবিগঞ্জ জেলা যুবশক্তির আহ্বায়ক তন্ময় তাহের বাদী হয়ে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহ রাজিব আহমদ রিংগনসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করে শতাধিক জনের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ জমা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, গতকাল যে বর্বর হামলা হয়েছে তার প্রতিবাদ জানাতে আমরা হবিগঞ্জে সমাবেশের ডাক দিয়েছিলাম। পুলিশ আমাদের সেখানে যেতে দেয়নি। পরে মামলা করার জন্য আমাদের ৫ জন প্রতিনিধি হবিগঞ্জ যেতে চেয়েছিলেন, তাদেরও যেতে দেওয়া হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে আমরা এখন অভিযোগ দিয়েছি।

এর আগে, বুধবার (২৯ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জ সড়কের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্য এলাকায় প্রথম পুলিশি ব্যারিকেডের মুখে পড়ে এনসিপির গাড়িবহর। এ সময় গাড়ি থেকে নেমে পুলিশের সঙ্গে কথা বলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং ডা. মাহমুদা মিতুসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।

একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে এনসিপির নেতাকর্মীদের ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। এ সময় হাসনাত আব্দুল্লাহ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে পুলিশের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কিতে জড়াতে দেখা যায়। পুলিশও তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আপনি যদি পারেন আমাদের নিরাপত্তা দেবেন। আর যদি না পারেন, তাহলে আমরা নিজের দায়িত্বে চলে যাব। কোন আইনে আমাদের বাধা দিচ্ছেন?’

জবাবে পুলিশ কর্মকর্তা নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কথা উল্লেখ করলে হাসনাত বলেন, ‘নিরাপত্তার হুমকি যারা সৃষ্টি করছে, তাদের না ধরে আমাদের পথরোধ করা হচ্ছে। হবিগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি করে শ্রীমঙ্গলে রাস্তা আটকে দেওয়া বেআইনি।’

পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ‘আপনারা এই সীমানা পার হলে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে।’

পরে এনসিপির নেতাকর্মীরা পুলিশের ব্যারিকেড অতিক্রম করে হবিগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দেন।

তবে হবিগঞ্জ সীমান্তের রশিদপুর গ্যাসফিল্ড এলাকায় পৌঁছালে আবারও ট্রাক ফেলে সড়ক অবরোধ করে তাদের আটকে দেওয়া হয়। সেখানে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদের সঙ্গে নাহিদ ইসলাম ও হাসনাত আব্দুল্লাহর দীর্ঘ আলোচনা হয়। এ সময় প্রবল বৃষ্টির মধ্যে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা সড়কে বসে অবস্থান নেন। পরে তারা হবিগঞ্জে প্রবেশ করে মামলা দায়ের করে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেও পুলিশ তাতে অনুমতি দেয়নি।

এর আগে, মঙ্গলবার হবিগঞ্জে এনসিপির পদযাত্রা কর্মসূচিতে হামলার প্রতিবাদে বুধবার বিকেল ৩টায় হবিগঞ্জ টাউন হল প্রাঙ্গণে প্রতিবাদ মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয় দলটি। সমাবেশে অংশ নিতে নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, হাসনাত আব্দুল্লাহ, সারজিস আলম, আতিক মুজাহিদ এমপিসহ কেন্দ্রীয় নেতারা হবিগঞ্জে যাচ্ছিলেন।

হবিগঞ্জ জেলা এনসিপির আহ্বায়ক আবু হেনা মোস্তফা কামাল দাবি করেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা শেষে সার্কিট হাউসের উদ্দেশে যাওয়ার পথে দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের গাড়িবহরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালান। এ হামলার প্রতিবাদ এবং হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বুধবার বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, আহত নেতাকর্মীদের হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও দ্বিতীয় দফায় হামলা করা হয়। এতে সারজিস আলম, জেলা সদস্য সচিব মুবিন বারীসহ অন্তত ১৫ জন নেতাকর্মী আহত হন।

মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে পুলিশের সহায়তায় উদ্ধার হয়ে সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সারজিস আলম। তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব রাজনৈতিকভাবে না দিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। হামলায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং তিনি নিজেও পায়ে আঘাত পান। তার দাবি, অন্তত ১৫ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন এবং একজনের চোখ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অন্যদিকে, এনসিপির নেতাদের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপির বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ এনে বুধবার বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেয় হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদল ও যুবদল।

জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহ রাজিব আহমেদ রিংগন বলেন, এনসিপির নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্যের কারণেই হবিগঞ্জের ছাত্র-জনতা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এতে ছাত্রদলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. জিল্লুর রহমান বলেন, এনসিপির নেতারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিএনপি এবং দলের জাতীয় নেতাদের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। এ কারণে হবিগঞ্জের সাধারণ ছাত্র-জনতা তাদেরকে ধাওয়া করেছে৷ ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেওয়ার প্রতিবাদে ছাত্রদল বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলো৷ তবে জেলা প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করায় আমরা প্রশাসনের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলাম, সমাবেশ ও মিছিল করিনি।

এদিকে বিএনপি ও এনসিপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সংঘাত, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় বুধবার হবিগঞ্জ শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে জেলা প্রশাসন।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মঈনুল হক জানান, জেলা প্রশাসকের আদেশ অনুযায়ী ১৪৪ ধারা বলবৎ থাকায় হবিগঞ্জ শহরে কোনো রাজনৈতিক দল সভা, সমাবেশ, মিছিল, পথসভা, পিকেটিং বা এ ধরনের কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারবে না।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত