০৮ অক্টোবর, ২০২০ ২১:১৩
সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলার হাওরে একের পর এক নৌ দুর্ঘটনার পর প্রশাসনের নির্দেশনা ও কঠোরতা বৃদ্ধি পেলেও নিরাপদ হয়নি নৌযান চলাচল। পূর্বের মত দাপটের সঙ্গে অদক্ষ চালক দিয়ে ফিটনেসবিহীন নৌযান এখনও চলছে নদী ও হাওরে।
জানা যায়, নৌপথে চলাচলকারী নৌযানের দুর্ঘটনা এড়াতে অভ্যন্তরীণ নৌযানসমূহকে ফিটনেস সার্টিফিকেট এবং নিবন্ধন করে তা নৌযানের প্রকাশ্য স্থানে ঝুলিয়ে রাখা, প্রতিটি নৌযানে আসন সংখ্যা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংখ্যক লাইফ জ্যাকেট যাত্রী সাধারণের হাতের নাগালের মধ্যে রাখাসহ প্রচলিত আইন ও বিধি-বিধানের নিয়ম মেনে চলার জন্য। গত ৯ সেপ্টেম্বর নেত্রকোনার ঠাকুরাকোনার যাত্রীবাহী ট্রলার বাল্কহেড নৌকার সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে গুমাই নদীতে সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর থানার ১২ জনের মৃত্যু হলে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেন। কিন্তু বাস্তবে কেউই তা মানছেন না।
এ গণবিজ্ঞপ্তির বিষয়টি না মেনে হাওরে নৌ চলাচলের ফলে যে কোনো সময় আবারও দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, যাত্রীবাহী ট্রলারের কোনোটিতেই লাইফ জ্যাকেট নেই। নেই ফিটনেস সার্টিফিকেট। চালক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কী না তাও জানার সুযোগ নেই। কোন কোন ট্রলার মালিক শুধু পর্যটকদের জন্য লাইফ জ্যাকেটের ব্যবস্থা করেন। তাও আবার অর্থের বিনিময়ে।
এদিকে তাহিরপুর থানার ঘাট থেকে-মধ্যনগর বাজার পর্যন্ত শুধু স্পিডবোট চলাচল করে। পাশাপাশি কাঠের ও লোহার তৈরি নৌযানও চলাচল করছে। স্পিডবোট মধ্যনগর পর্যন্ত চলাচল করলেও নৌকা চলাচল করে তাহিরপুর উপজেলার অভ্যন্তরে ৭টি ইউনিয়ন বিভিন্ন গ্রামে হাওর পাড়ি দিয়ে। এছাড়াও সুনামগঞ্জ, ধর্মপাশা, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে। তাহিরপুর থেকে মধ্যনগর পৌঁছাতে হলে কয়েকটি বড় হাওর পাড়ি দিতে হয়। কিন্তু নৌকা, স্পিডবোটে চড়ার সময় চালকসহ কেউই লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করেন না। জেলার তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ, জামালগঞ্জ, ঠাকুরাকোনা, কলমাকান্দাসহ বিভিন্ন এলাকায় যাত্রীবাহী ও মালবাহী নৌ চলাচল করলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
তাহিরপুর উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের বাগলী গ্রামের বাসিন্দা আমির মিয়া বলেন, বাড়িতে যেতে হলে ট্রলার ছাড়া বিকল্প কিছু নাই। ট্রলারে লাইফ জ্যাকেটের ব্যবস্থা না থাকলেও আমাদের মরি আর বাঁচি বাধ্য হয়ে যেতে হয়। এ ছাড়াও নৌরুটে বাল্কহেড নৌকা চলাচলের ফলে অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে।
ট্রলারের চালক নিজাম মিয়া জানান ট্রলারে লাইফ জ্যাকেট, ফিটনেস সার্টিফিকেট রাখার বিষয়টি তারও অজানা। যাত্রী বেশি হলে কোন উপায় থাকে না তখন অতিরিক্ত যাত্রীও পরিবহন করেন বলে জানান তিনি। এখনো অবাধে হাওরাঞ্চলে পথে বাল্কহেড নৌকা চলছে।
স্থানীয় স্পিডবোট সমিতির সভাপতি সুহেল বলেন, গরম লাগে কিংবা করোনার জীবাণু থাকতে পারে এমন ভয়ে লাইফ জ্যাকেট এড়িয়ে চলেন যাত্রীরা। এরপরও আমরা সর্বোচ্চ সর্তকতা অবলম্বন করে চলাচল করে থাকি। লাইফ জ্যাকেট আমরা সাথে রাখি সবসময়।
তাহিরপুর উপজেলা নৌযান মালিক সমিতির সভাপতি আবিকুল মিয়া বলেন, সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে কোন নৌযান উপজেলার নদী ও হাওরে চলাচল করতে চায় তাকে এই নৌরুটে নৌযান চালাতে দেওয়া হবে না। তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
তাহিরপুর উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক হাফিজ উদ্দিন পলাশ জানান, হাওরাঞ্চল পর্যটনের জন্য এক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। যদি নৌ দুর্ঘটনা প্রতিরোধ না করা যায় কিংবা তা বাড়তে থাকে তাহলে হাওর পর্যটন শিল্প বাধাগ্রস্ত হবে। বর্ষায় নৌদুর্ঘটনার খবর শুনে অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিবে।
তাহিরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বোরহান উদ্দিন বলেন, প্রতিটি ট্রলারের ফিটনেস ও দক্ষ চালক আছে কি না, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করছে কি না তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সবার নিজ নিজ উদ্যোগে নৌ দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এগিয়ে আসলে এর প্রতিকার পাওয়া সম্ভব হবে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সৈয়দ আমজাদ হোসেন বলেন, নৌ দুর্ঘটনা এড়াতে নৌযানের ফিটনেস ও দক্ষ চালক নিশ্চিত করতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নৌপথে আর যেন দুর্ঘটনা না ঘটে, সে জন্য শূন্য সহনশীল নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের নির্দেশিত গণবিজ্ঞপ্তিটি ওয়েবপোর্টাল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারসহ মাইকিং করা হয়েছে।
আপনার মন্তব্য