০২ আগস্ট, ২০২৬ ১১:০৫
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মারকে সংশ্লিষ্ট করে ঘটে যাওয়া পৃথক তিনটি ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটিগুলোর কোনোটি এখনও প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এর মধ্যে দুটি কমিটি গঠনের এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে।
তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও তদন্ত কমিটির সদস্যরা বলছেন, প্রক্রিয়াগত জটিলতাসহ নানা কারণে তদন্ত শেষ করতে সময় লাগছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সবচেয়ে পুরোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় গত বছরের ২ জানুয়ারি। পোষ্য কোটা বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনে তালা দেওয়ার ঘটনায় এ কমিটি গঠন করা হয়।
পরে একই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করার অভিযোগ ওঠে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় পৃথক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
সর্বশেষ গত ২৭ জুলাই দুই শিক্ষার্থীকে মারধর ও হয়রানির অভিযোগের ঘটনায় আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই ঘটনায় সালাউদ্দিন আম্মার ও রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসুদ বলেন, ‘অধ্যাপক এম ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত দ্বিতীয় তদন্ত কমিটিটি শুরুতে বিচার বিভাগীয় তদন্তের উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। পরে কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঘটনাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের আওতাভুক্ত নয়; এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ। এ ধরনের ঘটনায় মামলা করা প্রয়োজন। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর মামলা করার পরিকল্পনা থাকলেও প্রতিবেদনটি আর জমা দেওয়া হয়নি।’
প্রশাসন ভবনে তালা দেওয়ার ঘটনায় গঠিত প্রথম তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দীর্ঘ সময়েও জমা না দেওয়ার বিষয়ে কমিটির প্রধান অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্তের কাজ প্রায় শেষ। প্রতিবেদন প্রায় প্রস্তুত। তবে কয়েকজন সদস্য সুপারিশ করা শাস্তিগুলো আরও সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করার পরামর্শ দিয়েছেন। এ কারণে প্রতিবেদন জমা দিতে কিছুটা সময় লাগছে। আশা করছি, আগস্টের মধ্যেই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।’
অন্যদিকে, অধ্যাপক এম ফখরুল ইসলাম বলেন, তার নেতৃত্বাধীন কমিটি তদন্তের কাজ শেষ করেছে। প্রতিবেদন প্রস্তুত করার পর তাদের জানানো হয়েছিল, এটি আর সিন্ডিকেটে জমা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এরপর বিষয়টি আর এগোয়নি এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি।
সর্বশেষ ২৭ জুলাইয়ের ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটির প্রধান অধ্যাপক রেজাউল করিম বলেন, ‘কমিটির সদস্যরা ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। আমাদের নিয়োগপত্রে তদন্ত শেষ করার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হয়নি। তবে আমরা দ্রুত তদন্ত শেষ করতে চাই। কমিটির দুজন সদস্য বর্তমানে রাজশাহীর বাইরে থাকায় কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। সোমবার থেকে আবার তদন্ত শুরু হবে।’
তদন্ত কমিটিগুলোর কাজে প্রশাসনিক চাপ বা অসহযোগিতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আবদুল আলীম। তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো ধরনের চাপ বা বাধার মুখোমুখি হইনি। সর্বশেষ গঠিত কমিটির কয়েকজন সদস্য রাজশাহীর বাইরে থাকায় তারা এখনও কাজ শুরু করতে পারেননি। প্রশাসন ভবনে তালা দেওয়ার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনও শিগগিরই জমা দেওয়া হবে।’
যেভাবে আলোচনার কেন্দ্রে সালাউদ্দিন আম্মার
চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে পরিচিতি পান আম্মার। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পোষ্য কোটা’ বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় হন। কিন্তু রাকসুর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পরপরই বদলে যেতে থাকে তার আচরণ। গত ডিসেম্বরে এক ঘটনার পর তৎকালীন উপ-উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন খান আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আম্মারের উগ্র আচরণে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার বিব্রত ও ভীত।’
সম্প্রতি ‘ছাত্রলীগ’ তকমা দিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে বেধড়ক পিটিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আম্মার শিক্ষার্থী প্রতিনিধি তো দূরের কথা, সাধারণ শিক্ষার্থীর আচরণও করছেন না। লাইব্রেরিতে ঢুকে শিক্ষার্থীদের পেটানোর অপরাধে তার জেলে থাকার কথা। আমরা তার কঠোর শাস্তি চাই।’ এ বিষয়ে আম্মার কোনো অনুশোচনা প্রকাশ না করে উল্টো মন্তব্য করেন, ‘দেশের বিচারব্যবস্থা ঠিকঠাক চললে আমার মনে হয় না এই পরিস্থিতি বজায় থাকবে।’
গত ২৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে আম্মারকে এক শিক্ষার্থীর দিকে বেলচা হাতে তেড়ে যেতে দেখা যায়। এ সময় তিনি ওই শিক্ষার্থীকে ‘মাটিতে পুঁতে ফেলার’ হুমকি দেন। ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা গেছে, তিনি লাঠিসোঁটা নিয়ে লাইব্রেরির পাঠকক্ষে ঢুকে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে বেধড়ক পিটাচ্ছেন। পরে জানা যায়, একটি প্রেমঘটিত বিষয় নিয়ে প্রক্টর দপ্তরে মীমাংসার বৈঠক চলছিল। সেখানে মো. আনাস নামের এক শিক্ষার্থীকে ‘ছাত্রলীগ’ আখ্যা দিয়ে প্রক্টরের সামনেই চড়-থাপ্পড় মারেন আম্মার ও রাকসুর এজিএস সালমান সাব্বির। আনাসের মুঠোফোনে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার ছবি দেখে তার ওপর এই হামলা চালানো হয়।
পরবর্তীতে আনাস ও তার সঙ্গীরা লাইব্রেরির পাঠকক্ষে আশ্রয় নিলে আম্মার এবং ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা রড, বাঁশ ও বেল্ট নিয়ে সেখানে চড়াও হন। হামলায় গুরুতর আহত হন আনাস, মাহমুদুল ও হাসিব নামের তিন শিক্ষার্থী। এমনকি তাদের রক্ষা করতে আসা সাধারণ শিক্ষার্থীরাও মারধরের শিকার হন। আহত মাহমুদুলকে হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও তাকে টানাটানি ও লাথি মারে হামলাকারীরা।
আইন হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়ে আম্মারের স্পষ্ট জবাব, ‘আমরা মার খাইনি, মার দিয়েছি। প্রশাসনের ওপর ভরসা রেখে লাভ নেই।’ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবশ্য ঘটনাটিকে অত্যন্ত নিন্দনীয় বলে উল্লেখ করেছে। সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলীম জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সালাউদ্দিন আম্মারের উগ্র আচরণ কিংবা আইন হাতে তুলে নেওয়া এবারই প্রথম নয়, এর আগেও তিনি একাধিক বিতর্কিত ঘটনা ঘটিয়েছেন। গত বছরের ডিসেম্বরে ছয়জন ডিনকে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্র লেখান এবং নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ডিন অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেন তিনি। এ ছাড়া উপাচার্যের কাছে আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষকদের তালিকা দিয়ে তাদের ধরে থানায় সোপর্দ করার হুমকিও দেন। তার বিরুদ্ধে উপ-উপাচার্য মাঈন উদ্দীনকে লাঞ্ছিত করা এবং একজন উপ-রেজিস্ট্রারের দাড়ি ধরে টানাটানির অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি অন্য একটি হলের ছাত্র সংসদের জিএসকে কলার ধরে হেনস্তা করার অভিযোগও আছে।
রাজনৈতিক কর্মসূচির ক্ষেত্রেও তিনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে স্বাগত জানিয়ে টাঙানো একটি ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে সেই ভিডিও ফেসবুকে প্রচার করেন আম্মার। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষকরা উপাচার্যের কাছে তার মানসিক চিকিৎসার দাবি পর্যন্ত তুলেছিলেন।
ব্যক্তিগত আচরণ ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও অভিযোগ কম নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) এক নারী নেত্রীর ফেসবুক পোস্টে আপত্তিকর মন্তব্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। আবার ‘জুলাই ৩৬, মুক্তির উৎসব’ কনসার্ট আয়োজনের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ৭৬ লাখ টাকা চেয়ে চিঠি পাঠান তিনি, যাকে চাঁদা দাবি হিসেবে দেখা হয়। পরবর্তীতে সেটির আর্থিক হিসাব প্রকাশ করার কথা বললেও তিনি তা দেননি।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আবদুল্লাহ আল মাসুদ নামে প্রাক্তন এক ছাত্রলীগ নেতাকে চটের বস্তায় ভরে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মাসুদের মৃতদেহ থানায় আনা হলে সেখানে আম্মারকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। যদিও আম্মারের দাবি, তিনি অন্য কাজে থানায় গিয়েছিলেন এবং এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। ২০১৪ সালে মাসুদের ওপর হামলা চালিয়ে তার এক পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত কেটে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে বলে ছাত্র শিবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এরপর থেকেই রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে তিনি পঙ্গুত্ব জীবনযাপন করছিলেন।
ছাত্রশিবির পরিচালিত তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসায় পড়াশোনা করা সালাউদ্দিন আম্মার নিজেকে ফেসবুকে ‘জীবন্ত গাজী’ বলে দাবি করেন। তার পরিবারের সদস্যরাও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জড়িত। শিবিরবান্ধব পরিবেশে বেড়ে উঠলেও সাংগঠনিকভাবে পদে ছিলেন না বলে দাবি করেন আম্মার। ক্যাম্পাসের ছাত্র নেতারা বলছেন, রাকসু নির্বাচনের সময় আম্মারের এই বিতর্কিত রাজনৈতিক পরিচয় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। এখন তিনি শিবিরের ‘প্রক্সি’ হিসেবে ক্যাম্পাসে সহিংস রাজনীতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।
গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, ‘আম্মার ক্যাম্পাসে পেশিশক্তির মহড়া দিচ্ছেন, যা অতীত সহিংস ছাত্ররাজনীতিরই ইঙ্গিত দেয়।’ ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী মারুফ অভিযোগ করেন, ‘শিবির নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে সরাসরি মাঠে না নেমে আম্মারকে দিয়ে এসব বিতর্কিত ও উগ্র কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।’
আপনার মন্তব্য