১৩ অক্টোবর, ২০২০ ০১:৫৩
গত রোববার (১১ অক্টোবর) ভোরে সিলেট নগরের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে মারা যান আখালিয়া এলাকার যুবক রায়হান আহমদ (৩৩)। পরিবারের পক্ষ থেকে প্রথম থেকেই অভিযোগ করা হচ্ছে, পুলিশের নির্যাতনে রায়হান মারা গেছেন। রায়হানের পরিবারকে পুলিশ ফাঁড়ি থেকে ফোন দিয়ে টাকা দাবি করা হয়েছিলো বলেও অভিযোগ তাদের।
এ ঘটনায় রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি বাদী হয়ে রোববার রাতেই সিলেট কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ আনা হলেও কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি।
এদিকে, রায়হান হত্যার ঘটনায় সিলেট মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠনের পর বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূইয়াসহ ৪ জনকে সাময়িক বরখাস্থ ও ৩ জনকে প্রত্যাহার করা হয়। দায়িত্বে অবহেলার কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এদিকে, প্রশ্ন ওঠেছে হত্যার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সত্ত্বেও কেনো অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। কেনো তাদের মামলার আসামি করা হচ্ছে না এই প্রশ্নও ওঠেছে।
এরআগে গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজারের টেকনাফে গুলি করে হত্যা করা হয় সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদকে। এ ঘটনায় সিনহার বোনের দায়ের করা করা মামলায় ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, পরিদর্শক লিয়াকত আলী, এসআই নন্দদুলাল রক্ষিতসহ ৯ পুলিশকে আসামি করা হয়। তাদের গ্রেপ্তার করে রিমান্ডেও নেওয়া হয়। তবে রায়হান হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকেই গ্রেপ্তার করা হয়নি।
এ ব্যাপারে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদউল্লাহ শহিদুল ইসলাম শাহীন সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরকে বলেন, সাময়িক বরখাস্ত বা প্রত্যাহার কোনো শাস্তি নয়। কিছুদিন পরই আবার তাদের অন্যত্র পদায়ন করা হবে। এই পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এসেছে তা খুবই গুরুতর। তাদের এই মামলায় আসামি করে দ্রুত গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন। না হলে তদন্ত কার্যক্রমই বাধাগ্রস্থ হবে।
বিজ্ঞাপন
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (গণমাধ্যম) জ্যোতির্ময় সরকার জানিয়েছেন, রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সিলেট মহানগর পুলিশ। মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (উত্তর) শাহরীয়ার আল মামুনকে প্রধান করে গঠিত এই কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- কতোয়ালি থানার সহকারি কমিশনার নির্মল চক্রবর্তী ও বিমানবন্দর থানার সহকারী কমিশনার প্রবাস কুমার সিংহ।
তিনি জানান, এই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই বন্দরবাজার ফাঁড়ির ৪ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত ও ৩ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা চার পুলিশ সদস্য হচ্ছেন- বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন, কনস্টেবল হারুনুর রশিদ, তৌহিদ মিয়া ও টিটু চন্দ্র দাস।
প্রত্যাহারকৃত তিন পুলিশ সদস্য হচ্ছেন- এএসআই আশেক এলাহী, এএসআই কুতুব আলী ও কনস্টেবল সজিব হোসেন।
অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের ব্যাপারে সিলেট মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরকে বলেন, এই ঘটনায় হেফাজতে মৃত্যু আইনে কতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। মামলা তদন্তের দায়িত্বে রয়েছেন কতোয়ালি থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) বাতেন। তদন্তে পুলিশের কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের মামলার আসামি করে গ্রেপ্তার করা হবে।
প্রসঙ্গত, রোববার ভোরে রায়হান আহমদ (৩৩) নামে সিলেট নগরের আখালিয়ার এক যুবক নিহত হন। পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ছিনতাইয়ের দায়ে নগরের কাষ্টঘর এলাকায় গণপিটুনিতে নিহত হন রায়হান। এদিকে রায়হানের পরিবারের অভিযোগ পুলিশের নির্যাতনে খুন হয়েছেন রায়হান। তিনি নগরের আখালিয়া এলাকার নেহারিপাড়ার মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে।
রোববার ভোরে সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ি থেকে ফোন করা হয়েছিলো রায়হান আহমদ (৩৩)-এর মা সালমা বেগমকে। ফোন ধরেছিলেন চাচা ও সৎ বাবা হাবিবুল্লাহ চৌধুরী। রায়হান নিজেই ফোনে কথা বলেন। আর্তনাদ করে টাকা নিয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে আসার জন্য চাচাকে অনুরোধ করেছিলেন রায়হান। ফোন পেয়েই বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে যান হাবিবুল্লাহ চৌধুরী।
হাবিবুল্লাহ চৌধুরীর অভিযোগ, ফাঁড়িতে গেলে তার কাছে ১০ হাজার টাকা দাবি করেন এক পুলিশ সদস্য। কিছুক্ষণ পর আরেক পুলিশ সদস্য বলেন, রায়হান অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এরপর ওসমানী হাসপাতালে গিয়ে রায়হানের লাশ দেখতে পান তিনি।
সে রাতে এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া ফাঁড়িতে উপস্থিত ছিলেন বলে শনাক্ত করেছেন হাবিবুল্লাহ চৌধুরী। সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রায়হানের বাড়িতে যান সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এসময় এসআই আকবকর হোসেন ভূঁইয়ার ছবি দেখে তাকে শনাক্ত করেন হাবিবুল্লাহ।
তিনি বলেন, সকালে ফাঁড়িতে যাওয়ার পর এক পুলিশ সদস্য আমার কাছে ১০ হাজার টাকা চান। এসময় পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন এসআই আকবর। তখন তিনি সাদা পোষাকে ছিলেন ও মুখে মাস্ক পড়া ছিলো। তিনি আমাকে বলেন- রায়হান অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাকে ওসমানী হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আমাদের পুলিশ সদস্যরাও সেখানে আছে। আপনি হাসপাতালে চলে যান।
এদিকে এ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছেন সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী।
আপনার মন্তব্য