নিজস্ব প্রতিবেদক

১৯ নভেম্বর, ২০২০ ০০:২৪

একদিনের বিদ্যুৎহীনতায়ই কেন এত দুর্ভোগ?

গ্রিড লাইনে অগ্নিকাণ্ডে মঙ্গলবার সকাল থেকে বুধবার বিকাল পর্যন্ত সিলেটে বিদ্যুৎ ছিল না। ৩১ ঘণ্টার এই বিদ্যুৎহীনতার কারণে নগরজীবন রীতিমত দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বেশি সমস্যা দেখা দেয় পানি নিয়ে।

মঙ্গলবার দুপুর থেকে পানির সঙ্কট বাড়তে থাকে। বুধবার তা একেবারে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছায়। পানি সঙ্কটের কারণে অনেককে নগর ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে দেখা যায়।

এছাড়া বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল ফোন চার্জের জন্য বিপাকে পড়তে হয় নগরবাসীকে। মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক ও ইন্টানেট সেবায়ও বিপর্যয় দেখা দেয়।

প্রশ্ন উঠেছে, এক দিনের বিদ্যুতহীনতায় নগরজীবনে কেন এত বিপর্যয়? কেন পানির জন্য এমন হাহাকার?

নগরের মির্জাজাঙ্গাল এলাকার বাসিন্দা নিরঞ্জর সরকার অপু। সিলেটের একটি কলেজের বিজ্ঞানের শিক্ষক তিনি। বুধবার তার বাসায়ও পানি সঙ্কট দেখা দেয়। পাশের এক হোটেল মালিক বিনামূল্যে এলাকাবাসীর মধ্যে পানি বিতরণ করছিলেন। সেখান থেকে বালতি দিয়ে পানি নিয়ে এসে জরুরি কাজ সারেন অপুর পরিবারের সদস্যরা।

এমন পানি সঙ্কট প্রসঙ্গে অপু বলেন, ‘আমরা অনেক বেশি ভূগর্ভের পানির ওপর নির্ভরশীল। সিটি করপোরেশন থেকে যে পানি সরবরাহ করা হয় তার বেশিরভাগও মাটির নিচ থেকে গভীর নলকূপ দিয়ে তোলা হয়। ফলে বিদ্যুৎহীনতায় পানি উত্তোলন ব্যাহত হয়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ভূপৃষ্ঠের পানির উপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে হবে। সারাবিশ্বেই এখন এটা করা হচ্ছে। বন্ধ করতে হবে গভীর নলকূপ স্থাপন। এটি পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর। এতে পানির স্তর নিচে নেমে ভূগর্ভে শূন্যতা সৃষ্টি হচ্ছে।

মঙ্গলবার সকালে ১১টার দিকে সিলেটের আখালিয়ার কুমারগাঁও বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে আগুন লাগে। অগ্নিকাণ্ডে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিকল হওয়ার প্রায় ৩১ ঘণ্টা পর বুধবার সন্ধ্যর দিকে নগরের কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়েছে। এরপর থেকে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে নগরজীবনে। তবে এখনও অন্ধকারে আছে নগরের বহু এলাকা।

বিজ্ঞাপন



সিলেট নগরীতে পানি সরবরাহ করে থাকে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। সিসিক সূত্রে জানা যায়, নগরীর বাসিন্দাদের জন্য প্রতিদিন পানির চাহিদা প্রায় ৮ কোটি লিটার। এর মধ্যে বর্তমানে সিটি করপোরেশন থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৩ কোটি লিটার। ফলে প্রতিদিন পানির ঘাটতি থেকে যাচ্ছে প্রায় ৫ কোটি লিটার। এই তিন কোটি লিটারেরও অনেকটা উত্তোলন করা হয় গভীর নলকূপের মাধ্যমে।

কেবল খাবার পানি নয়, পানি সংকটের কারণে প্রাতঃকর্মসহ দৈনন্দিন নানা কর্মকাণ্ডেও বিপাকে পড়েন নগরবাসী। শিশু ও বয়স্করা পড়েন সবচেয়ে বিপাকে।

সিলেটের পরিবেশকর্মীরা বলছেন, একসময় সিলেটের পানির প্রধান উৎস ছিল প্রাকৃতিক জলাধার। পাহাড় থেকে নেমে আসা ছড়া, অসংখ্য পুকুর-দিঘী, আর নগরের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা নদী ছিল পানির প্রধান উৎস। অপরিকল্পিত নগরায়ণ আর ভূমিখেকোদের কারণে এসব ছড়া দখল হয়ে গেছে। ভরাট করে ফেলা হয়েছে বেশিরভাগ পুকুর-দিঘী, নদীও নাব্য হারিয়ে মৃতপ্রায়। ফলে এমন ভয়াবহ পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

জানা যায়, সিলেটে সাগরদিঘী পাড়, লালদিঘীর পাড়, রামের দিঘীর পাড়সহ অন্তত ২০/২৫টি এলাকা রয়েছে দিঘীর নামে। কিন্তু এলাকার দিঘীগুলো এখন নেই। ভরাট হয়ে গেছে অনেক আগেই। গত তিন দশকে ভরাট হয়ে গেছে নগরীর অর্ধশতাধিক দিঘী।

সিলেট নগরীর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গেছে ছোট বড় প্রায় ২৫টি প্রাকৃতিক খাল। যা ছড়া নামে পরিচিত। পাহাড় বা টিলার পাদদেশ থেকে উৎপত্তি হয়ে ছড়াগুলো গিয়ে মিশেছে সুরমা নদীতে। এইসব ছড়া ছিল নগরবাসীর পানির প্রধানতম উৎস। এখন অনেক স্থানে এসব ছড়ার অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না।

বিজ্ঞাপন



সিসিক সূত্রে জানা যায়, নগরীর ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ১৩টি বড় ছড়ার দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৩ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন ধরেই এসব ছড়ার দুপাশ দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এই ছড়াগুলো উদ্ধারে এ পর্যন্ত তিনটি প্রকল্পে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৬৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)।

সর্বশেষ ২০১৬ সালে ছড়া-খাল দখলমুক্ত করতে ২৩৬ কোটি ৪০ লাখ টাকার বৃহৎ একটি প্রকল্প নেয়া হয়। তবে এসব বৃহৎ প্রকল্পের পরও ছড়া দখলমুক্ত করা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ছড়া-খাল দখলদারদের একটি তালিকা করা হয় ২০১৬ সালে। এতে ২৬৮ জনকে দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, নগরের সব জলাধার একে একে ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। প্রভাবশালীদের পাশাপাশি অনেক সময় সরকারি প্রতিষ্ঠানও জলাশয় ভরাট করছে। এই জলাধারগুলো থাকলে নগরীতে এমন পানির সঙ্কট দেখা দিত না।

তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনকে ডিপ-টিউবওয়েলে বদলে নদীর পানি পরিশোধন করে নগরবাসীর মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে। বৃষ্টিবহুল সিলেটে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণেরও উদ্যোগ নিতে হবে। নতুবা বিদ্যুতের কোনো বিপর্যয় দেখা দিলেই পানির এমন হাহাকার তৈরি হবে। এছাড়া পরিবেশও বিপর্যস্ত হবে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমান বলেন, ‘নগরের জলাধারগুলো সংরক্ষণে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করছি। এছাড়া ছড়া উদ্ধারেও সিটি করপোরেশন কাজ করছে। তার সুফলও মিলছে। এখন নগরীতে আর আগের মতো জলাবদ্ধতা হয় না।’

তিনি বলেন, ‘নদীর পানি পরিশোধন করে খাবার উপযোগী করে তুলতে নগরীর কুশিঘাটে প্রায় ১শ ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি পানি শোধনাগার প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হয়। এ শোধনাগার প্ল্যান্ট থেকে পানি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রতিদিন ২ কোটি ৮০ লাখ লিটার। কিন্তু নদীর নাব্য সঙ্কটের কারণে এখন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এখন বাদাঘাটে চেঙ্গেরখাল নদীতে আরেকটি শোধনাগার প্লান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছি।’

পানি সঙ্কটের পাশাপাশি মঙ্গল ও বুধবার সিলেটজুড়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টানেট সেবায় বিপর্যয় দেখা দেন। এতে ভোগান্তিতে পড়েন গ্রাহকরা। আবার মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া নিয়েও বিপাকে পড়েছেন অনেকে।

মোবাইল ফোন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, হঠাৎ করে মোবাইলের ব্যাবহার বেড়ে যাওয়ায় নেটওয়ার্কের ওপর বাড়তি চাপ পড়েছে। এতে নেটওয়ার্কের কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়।

বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সোমবার কুমারগাওয়ে গ্রিড লাইনের আগুনে দুটি ট্রান্সমিটার, একটি ফিড লাইন ও একটি কন্ট্রোল প্যানেল পুরো পুড়ে গেছে।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত