১৫ নভেম্বর, ২০১৫ ০০:৩৯
সাজু ও আলেয়া। দু'জনের বয়সই ১৮ কি ১৯ হবে। কবি সুকান্তের ভাষায় 'দুঃসহ র্স্পধায় মাথা তোলবার ঝুঁকি' নেওয়ার বয়স। কিন্তু সমাজ যাদের মাথা দমিয়ে রাখে তারা মাথা তোলবার ঝুঁকি নেয় কী করে। সমাজের চোখে তাদের পরিচিতি যে হিজড়া হিসেবে!
ক্ষোভের সঙ্গেই তারা বলেন, ‘আমাদের দেখে অনেকেই ঘৃণা করে। বাসা ভাড়া নিতে গেলে মালিক তাড়িয়ে দেয়। দোকানে গেলে দোকান মালিক আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে। হোটেলে গিয়ে খেতে বসলে হোটেলের লোকজন কটু কথা বলে। ডাক্তারের কাছে গেলে এটেনডেন্স তাড়িয়ে দেয়। কেউ চাকরীও দেয় না। তাহলে আমরা কোথায় যাব? বাঁচবো কিভাবে?
কোথায় যাবেন তাঁরা? এই প্রশ্ন হিজড়া সম্প্রদায়ের আরো অনেকের। যাদের তৃতীয় লিঙ্গ বা শিখন্ডিও বলে থাকেন অনেকে।
বাবলী ও ময়না নামে হিজড়া জনগোষ্ঠির আরো দু’জন জানান, মা-বাবার কাছ থেকে কিছুটা ভালবাসা পেলেও আত্মীয় স্বজন কিংবা ভাই বোনদের কাছে লাঞ্ছিত হতে হয় তাদের। এ কারনে নিজের বাড়ি ঘর ছেড়ে তারা আজ যাযাবরের মতো ঘুরে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে অপরাধ কর্মকান্ডেও জড়িয়ে পড়ছে।
সিলেট নগরীর দক্ষিন সুরমার কুইন্স টাওয়ারে সিলেট হিজড়া কল্যাণ সংস্থার কার্যলয়। শুক্রবার সেখানে গিয়েই কথা হয় তৃতীয় লিঙ্গের এই মানুষদের সাথে। নিজেদের দুঃখের কথা, ক্ষোভের কথা, শারিরীক কিছু সীমাবদ্ধতার জন্য সমাজে অচ্ছুত হয়ে পড়ার কথা এবং ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টার কথা জানান তাঁরা।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের জরিপমতে, বাংলাদেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। আর সিলেট হিজড়া কল্যাণ সংস্থার তথ্য মতে, সিলেট বিভাগে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ৭’শ। এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে বলে দাবি করেছেন সংগঠনের সভানেত্রী সুন্দরী হিজড়া।
উইকিপিডিয়া মতে, ক্রোমোজোমের ত্রুটির কারণে জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, যাদের জন্মপরবর্তী লিঙ্গ নির্ধারণে জটিলতা দেখা দেয়, তাদের হিজড়া বলা হয়। হিজড়া শব্দের অপর অর্থ হচ্ছে ‘ট্রান্সজেন্ডার’, ট্রান্সজেন্ডার বলতে এমন এক লৈঙ্গিক অবস্থাকে বুঝায় যা দৈহিক বা জেনিটিক কারণে মেয়ে বা ছেলে কোন শ্রেণীতে পড়ে না।
সাগরিকা, রনি, ও শ্রাবন্তী নামের এই জনগোষ্ঠির তিনজন বলেন, আমরা এই সমাজের মানুষ, আমরাও কারো স্বজন। আমাদেরও মা-বাবা ভাই বোন রয়েছে। আমরা সমাজে তাদেরকে নিয়ে বাঁচতে চাই। কিন্তু আমাদের সে সুযোগ দেওয়া হয় না।
তারা বলেন, আমাদের কারনে আমাদের মা-বাবাকে কোন প্রকার কটু বাক্য যেন না বলা হয়। সমাজের বোঝা হয়ে নয়- সমাজের কল্যাণেই আমরা কাজ করতে চাই।
সিলেট হিজড়া কল্যাণ সংস্থার সভানেত্রী সুন্দরী বলেন, হিজড়া সম্পদায়ের অনেকেই রয়েছেন অভিজাত পরিবারের। কিন্তু তাঁর লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে জটিলতা থাকায় প্রথম নির্যাতনের শিকার পরিবার থেকেই শুরু হয়। পরিবার থেকে লাঞ্ছনা সইতে না পেরে অনেকেই যুক্ত হচ্ছে নানা অপরাধে।
তিনি জানান, সিলেটে দিনদিন হিজড়াদের সংখ্যা বেড়েই চলছে। হিজড়া সম্প্রদায়কে সমাজের মূল জনগোষ্ঠির সাথে সম্পৃক্ত করা না হলে এরা বাধ্য হয়েই অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়বে।
তবে সম্প্রতি হিজড়া জনগোষ্ঠিকে সমাজের মূলস্রোরােতে অর্ন্তভূক্ত করা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তর সুত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ হিজড়া জনগোষ্ঠীকে 'লিঙ্গ' যথা 'হিজড়া' হিসেবে চিহ্নিত করে এ-সংক্রান্ত নীতিমালা ২০১৩ সালে অনুমোদন দেওয়া হয়। এরফলে তথ্য সংগ্রহের সময় ব্যক্তির লিঙ্গ পরিচয় হিসেবে 'নারী' ও 'পুরুষের' পাশাপাশি 'হিজড়া' হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এরমাধ্যমে সরকারি নথিপত্র ও পাসপোর্টে তাদের লিঙ্গ পরিচয় 'হিজড়া' হিসেবেই ধরা হয়েছে।
সিলেট সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, হিজড়া সম্প্রদায়রের উন্নয়নে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কয়েক বছর ধরে পাইলট প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ওই প্রকল্পের আওতায় সিলেটে এ পর্যন্ত দেড়শ’ জন হিজড়াকে বিভিন্নভাবে প্রশিক্ষন দেওয়া হয়েছে।
সিলেট হিজড়া কল্যাণ সংস্থা সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সাল থেকে সরকারীভাবে হিজড়াদের সামাজিক বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করা হয়। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে তাদেরকে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য সেলাই মেশিন, কম্পিউটার প্রশিক্ষন দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত তার দেড়শ জন হিজড়া বিভিন্ন মেয়াদে মৌলিক প্রশিক্ষন গ্রহণ করেছেন।
হিজড়া জনগোষ্টির জীবনমান উন্নয়ন কমসূচির আওতায় তাদেরকে এ প্রশিক্ষন দেওয়া হয় বলে জানান সংস্থার সভানেত্রী সুন্দরী। তিনি বলেন, ওই প্রশিক্ষণ পেয়ে অনেকেই এখন নতুন করে জীবন শুরু করেছে। সৎভাবে আয় করছে। কেউ কেউ নিজ বাড়িতে সেলাইর কাজ করছে।
যারা এখনো প্রশিক্ষণ নিতে পারেনি তাদেরকেও প্রশিক্ষনের আওতায় আনার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান তিনি। তিনি জানান, হিজড়াদের যদি প্রশিক্ষিত করা যায় তবে তারাও সমাজের বোঝা নয়, সম্পদ হয়ে ওঠবে। তবে হিজড়াদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে বলেও অভিমত তাঁর।
সভানেত্রী জানান, তাদের জরিপমতে সিলেটে ৪’শ, সুনামগঞ্জে ১৫০, মৌলভীবাজারে ১’শ এবং হবিগঞ্জে দেড়শ’ হিজড়া রয়েছে। তাদেরকে মূল স্রোরােতে আনতে সরকারীভাবে জরিপ চালানোর দাবি জানান এ নেত্রী।
সিলেট সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ক্রোমোজম বা হরমোন ত্রুটি অথবা মানসিক কারণে কারও লিঙ্গ পরিচয় নির্ধারণে জটিলতা দেখা দিলে বা দৈহিক লিঙ্গ পরিচয়ের সঙ্গে আচরণগত মিল না থাকলে তাদের চিহ্নিত করা হয় হিজড়া হিসেবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে।
তিনি বলেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময়ে হিজড়াদের জন্য বিভিন্ন সরকারি সুবিধা দেওয়ার পদক্ষেপ নিলেও তথ্য না থাকায় সে সুবিধাও তাদের কাছে পৌঁছায় না।
আপনার মন্তব্য