নিজস্ব প্রতিবেদক

০৪ জুন, ২০২১ ০০:৫১

করোনাকালে বিশাল বাজেট বাস্তবায়ন হবে তো?

মহামারির বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে অর্থনীতির ক্ষত সারানোর পাশাপাশি মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষার চ্যালেঞ্জ সামনে নিয়ে নতুন অর্থবছরের জন্য ছয় লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

বৃহস্পতিবার (৩ জুন) বিকেলে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। তার আগে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর ওই প্রস্তাবে সই করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

এই বাজেট প্রকাশের পর সিলেটে রাজনৈতিক, সামাজিক ব্যক্তিবর্গ মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

সরকার দলের প্রতিনিধিরা বলছেন, এই দুর্যোগময় সময়েও সময় উপযোগী হয়েছে এবারের বাজেট। অন্যদিকে অন্য রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিনিধিরা বলছেন গতানুগতিক বাজেট। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, গণমানুষের জীবন জীবিকা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নের দিকে লক্ষ্য রেখে এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন বড় অঙ্কের এই বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয়।

২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে সিলেট মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী বলেন, এবারে বাজেটও গতানুগতিক বাজেট। গতানুগতিক এই বাজেট মানুষের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না। কারণ এই সরকারের কোনো জবাবদিহিতা নেই। যে সংসদে এই বাজেট দেওয়া হয় সেই সংসদে এই বাজেটের ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য ভিন্ন মতাদর্শের কোনো মানুষ নাই। তারপরও বিশাল বাজেট দেওয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। তবে প্রতিবছর বাজেটের আকার বড় হলেও বৈষম্য দূর হচ্ছে না। দেশের জনগনের জন্য বাজেট বলা হলেও সাধারণ জনগণের কাজে আসবে না এই বাজেট। এই করোনাকালে গত ২ বছর ধরে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ নতুন করে দ্ররিদ্রসীমার গিয়েছে। এর আগের যারা দ্ররিদ্রসীমার নিচে ছিলেন তারতো আর আছেনই। এইযে বড় একটা অংশ দ্ররিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছে তাদের জন্য বাজেটে সুস্পষ্ট কোনো কিছু নাই।

তিনি বলেন, বাজেটে প্রণোদনার নামে যা কিছু আছে তাকে প্রণোদনা বলা যায় না। প্রণোদনার যে টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে সেটা খুবই অপ্রতুল। বরং অতীতে যেভাবে বড় বড় প্রকল্পে বিশাল অঙ্কে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবার তার ব্যতিক্রম হয়নি। দেশের এই মুহূর্তে রুপপুর পারমানিবক কেন্দ্রের মত মেগা প্রকল্পগুলোতে বরাদ্ধ বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য, কৃষি ও শিক্ষাখাতে বরাদ্দ অপ্রতুল। প্রতিবছরই শুধু নামে মাত্র বাজেট দেওয়া হয়। কারণ বিগত বছরগুলোতেও বাজেট বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ ছিল না। এবারও বাজেটের আহোরিত টাকাগুলো কোন খাত থেকে আসবে এর সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেট শাখার সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অন্যাবারের মত এবারও গতানুগতিক বাজেট দেওয়া হয়েছে। বিশাল বাজেট দিয়ে আমাদের স্বপ্ন দেখানো হয় কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবায়িত হয় না। এত বড় বাজেট দেওয়া হয়েছে ঠিকই কিন্তু এটাতো বাস্তবায়ন করতে পারবে না। কারণ অন্যের কাছে টাকা রেখে বা ঋণের খাত দেখিয়ে যে বাজেট দেওয়া হয় সেগুলোতো বাস্তবায়িত হয় না। আমার মনে হয় অন্যান্য বারের মত এবারও ব্যতিক্রম হবে না। বাজেটে যে রাজস্ব আয়ে কথা বলা হয়েছে সেটাতো এই করোনাকালে সম্ভব হবে না। আমি মনে করি শুধু কাগজে কলমে বাজেট না দিয়ে বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট দেওয়া প্রয়োজন। তবে সরকার যদি এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারে তাহলেতো আমরা পরের বছর বাহবা দেব। তবে এই বাজেট কোনোভাবেই বাস্তবায়নযোগ্য বলে মনে হয় না। সরকারের উচিত ছিল এই মুখে মুখে বাজেট না দিয়ে এই করোনাকালকে মাথায় রেখে বাজেট দেওয়া। কারণ এই করোনকাল কতদিন চলবে সেটা কেউ জানে না।

তিনি বলেন, উন্নয়নমূলক কাজ হচ্ছে না বলে বাজারে টাকার প্রবাহ নেই। যার ফলে আড়াইকোটি মানুষ দ্ররিদ্রসীমার নিচে চলে গেছে। তারপরও আমরা আশা করবো এই বাজেটের মাধ্যমে যেন জনগণের আশা আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটে।

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বাজেট যতটুকু দেখেছি আমার মনে হয়েছে এই করোনাকালের জন্য সমপোযোগী। সারা বিশ্ব যেখানে এই মহামারি আক্রান্ত সেখানে এই সময়ে আমার দেশের কোনো মানুষ না খেয়ে মারা যায়নি। তাই এই দিক বিবেচনা করলে বলা যায় আমাদের নেত্রী অনেক চিন্তা ভাবনা করে বাজেট দিয়েছেন। যেখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন সে জায়গায় বাড়ানো হয়েছে, যেখাতে বরাদ্দ কমানোর প্রয়োজন সে খাতে কমানো হয়েছে। তাই আমি মনে করি এই সময়ের উপযোগী হয়েছে এবারের বাজেট। বাজেট দিলও পরে অনেক কাটসাট হয়। বাজেট পরবর্তী কোনো জায়গায় ঘাটতি থাকলে নেত্রী অবশ্যই প্রয়োজন অনুযায়ী সংযোজন বিয়োজন করবেন। আমার মনে হয় এই দুর্যোগময় সময়েও একটি ভাল বাজেট হয়েছে।

ঘোষিত ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার এই প্রস্তাবিত বাজেটকে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় একটি প্রবৃদ্ধি, উৎপাদনশীল, ব্যবসা বান্ধব, আভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ, ব্যবস্থাপনা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, সুসংহত এবং বাস্তবায়নযোগ্য সময় উপযোগী বাজেট বলে মন্তব্য করেছেন সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি (এসএমসিসিআই) এর  সভাপতি আফজাল রশীদ চৌধুরী।

সিলেট চেম্বারের সভাপতি আবু তাহের মো. শোয়েব বলেন, চলমান করোনাকালীন পরিস্থিতিতে গণমানুষের জীবন জীবিকা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নের দিকে লক্ষ্য রেখে জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করে সরকার বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৬ লক্ষ ৩ হাজার ৬শত ৮১ কোটি টাকা যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়ন্ত্রিত কর থেকে আয় হবে ৩ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে আগামী অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লক্ষ ৩৭ হাজার ৭৮ কোটি টাকা।

তিনি বলেন, গত বছর করোনার প্রকোপে ব্যবসা বাণিজ্যে প্রচুর ক্ষতি সাধিত হওয়ায় সরকার আগামী বাজেটে ব্যবসায়ীদেরকে বিশেষ সুবিধা প্রদান করেছেন যার মধ্যে শিল্পের কাঁচামাল বা উপকরণ আমদানির ক্ষেত্রে অগ্রিম কর ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ নির্ধারণ, কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানিতে অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার, ভ্যাট অনাদায়ের জরিমানা দ্বিগুণ থেকে কমিয়ে ভ্যাটের সমপরিমাণ করা, পণ্য পরিবেশক ও ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ন্যূনতম কর হার কমানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের বার্ষিক টার্নওভারে ৭০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত কর অব্যাহতি সুবিধা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এসব সময়োপযোগী সুবিধা প্রদানের ফলে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীগণ উপকৃত হবেন।

আপনার মন্তব্য

আলোচিত