আমীর হামজা, হবিগঞ্জ

০৯ জুলাই, ২০২১ ০১:০৪

করোনা সংক্রমণ বাড়ছে, চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই

হবিগঞ্জ

জ্বর ও ডায়রিয়া আক্রান্ত স্ত্রী ফারহানাকে নিয়ে গত মঙ্গলবার রাতে লাখাই থেকে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে আসেন পারভেজ হাসান। প্রথমে জরুরী বিভাগে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ফরাহানাকে নারী ওয়ার্ডে ভর্তি করেন। পরে করোনার উপসর্গ সন্দহে ২৫০ শয্যা সদর আধুনিক হাসপাতালের নতুন ভবনের ৬ তলায় একটি ওয়ার্ডে স্থানান্তর করেন চিকিৎসক।

বুধবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফারহানা আক্তারের করোনা টেস্টের নমুনা সংগ্রহ করেন।
 
বৃহস্পতিবার পারভেজ হাসান বলেন, হাসপাতালে আসছি গত মঙ্গলবার রাতে। এখন পর্যন্ত কোন চিকিৎসক আসেননি। বুধবার সকালে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ি স্যালাইন ও ওষুধ নিয়ে আসি। স্যালাইন লাগানোর জন্য নার্সদের বারবার ডাকলেও কেউ সারা দেন না। পরে একজন আসেন দুপুরে।
 
তিনি বলেন, শুধু এই স্যালাইন দেওয়া ছাড়া আমার স্ত্রীকে আর কোন কোন ওষুধ দেওয়া হয়নি। কোনো চিকিৎসা করা হয়নি। বুধবার কয়েকবার নিচতলায় নার্সদের কাছে গেলে তারা আসেননি।

কথা বলতে বলতে পারভেজ বলেন, টাকার অভাবে সরকারি হাসপাতালে এসেছি, কিন্ত এখানে এসে দেখছি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের মানুষই মনে করেন না।

৮ তলা বিশিষ্ট ২৫০ শয্যা হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালের নতুন ভবনের ৬ তলায় বৃহস্পতিবার গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কেউ নেই সেখানে। একটি ইউনিটের করোনা আক্রান্ত ৭ জন রোগীকে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। আর পাশের একটি ইউনিটে করোনা উপসর্গ সন্দহে কয়েকজন রোগীকে ভর্তি রাখা হয়েছে।

উপসর্গ সন্দহে নিয়ে ভর্তি হওয়া এক রোগীর স্বজন রহিমা খাতুন ঘুরছেন আক্রান্ত রোগীদের ওয়ার্ডের বারান্দায়। কথা হলে রহিমা বলেন, রোগীর জন্য খাবার নিয়ে এসেছি। এখানে যে করোনা আক্রন্তদের ওয়ার্ড এটা আমি জানি না। গেইট খোলা তাই ভাবলাম একটু ঘুরে আসি। এ ছাড়া হাসপাতালেরও কেউ নেই যে আমারা জানবো এটা করোনা আক্রন্ত রোগীদের ওয়ার্ড।   

সদর উপজেলার ধুুলিয়াখাল এলাকা থেকে জ্বর সর্দি নিয়ে মানিক মিয়া নামের এক রোগী আসেন হাসপাতালে। তার সাথে ছোট ভাইয়ের স্ত্রী লিজা আক্তারসহ দুইজন আসেন।

কথা হলে লিজা বলেন, ডাক্তার বলছে করোনা উপসর্গ আছে তাই নতুন ভবনের ৬ তলায় ভর্তি হতে। বুধবার ভাইকে নিয়ে আসার পর শুধু একজন নার্স একবার এসে দেখে গেছেন। এরপর কেউ আসেন নি।
 
লিজা আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যদি আমাদের চিকিৎসা না দেয়া হয় তাহলে কেন সরকার এত লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে হাসপাতাল তৈরি করে?

বুধবার দুুপুরে সদর হাসপাতালে জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে মারা যান লাখাই থেকে আসা মোজাফফর আলম। তার সাথে আসা স্বজন সেতু আহমেদ বলেন, দুপুর ১২টার দিকে আমরা হাসপাতালে আসি। উনার প্রচুর শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। অক্সিজেনের জন্য হাসপাতালের নার্সদের অনেক বার বলেছি কিন্তু তারা করোনা আক্রন্ত ভেবে রোগীর ধারেকাছেও আসেন নি। ডাক্তার একটি প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দিয়ে বলেন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে। এ্যম্বুলেন্স আনতে আনতে উনার শ্বাসকষ্ট তীব্র আকার ধারণ করে। নার্সদের অক্সিজেনের কথা বলেল তারা কেউ আসেননি। শেষ পর্যন্ত আমি নিজেই ৬ তলা থেকে একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে আসি। প্রায় ১০ মিনিট অক্সিজেন দেয়ার পর মারা যান তিনি। মারা যাওয়ার পর একজন এসে উনার করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ করে গেছেন।  

হবিগঞ্জে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি মাসে ৪০ থেকে ৫৩ শতাংশে ওঠানামা করছে সংক্রমণের হার। সেই সঙ্গে বেড়েছে মৃত্যু। অথচ হবিগঞ্জে এখনো র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট ও আইসোলেশনের ব্যবস্থা ছাড়া করোনা চিকিৎসার আর কোনো ব্যবস্থা নেই। যে কারণে গুরুতর অসুস্থ হলে ঢাকা বা সিলেটে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। অন্যদের হোম আইসোলেশনই একমাত্র ভরসা।

সম্প্রতি জেলায় জ্বর, সর্দি, কাশির প্রকোপ বেড়েছে। বৃদ্ধি পেয়েছে নমুনা জমা দেওয়ার সংখ্যা। প্রতিদিনই জেলার শ শ মানুষ করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দিচ্ছেন। কিন্তু জেলায় করোনা পরীক্ষার পিসিআর ল্যাব না থাকায় নমুনা পাঠাতে হচ্ছে সিলেটে। সেখানে দিনে ৭০ থেকে ৯০টির বেশি নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে নমুনা পরীক্ষার ফল আসতেও সময় বেশি লাগছে। প্রতিদিন নষ্টও হয় অনেক নমুনা।

বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) সদর হাসপাতালে র‌্যাপিড এন্টিজেন টেস্ট হয়েছে ১৭ টি এর মধ্যে ৭ জনের করোনা পজেটিভ এসেছে। আর সর্বমোট ৮৩ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলো সিলেট পাঠানো হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হবিগঞ্জে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০ জন করোনা রোগী শনাক্ত হলেও করোনা সংক্রমণের হার উদ্বেগজনক। নমুনা পরীক্ষা বাড়াতে পারলেই জেলার করোনা পরিস্থিতির সঠিক চিত্র বোঝা যাবে।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সুত্র জানায়, বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) ১৩০ টি নমুনা পরীক্ষায় ৪৬ জনের শরিরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৩৫.৩৮ শতাংশ। এ পর্যন্ত হবিগঞ্জে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ৪৮ জন। সুস্থ ২হাজার ১১৮ জন। এছাড়াও আক্রন্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেছেন ২২জন।

জেলায় বর্তমানে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৯৩০ জন। এর মধ্যে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন মাত্র ৭ জন। বেশির ভাগ রোগী নিজ বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। যাদের অবস্থা গুরুতর, তাদের বেশির ভাগ ঢাকা ও সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, পিসিআর ল্যাব ও অক্সিজেন প্ল্যান্ট বসানোর কাজ চলছে। শিগগিরই করোনার সব চিকিৎসা জেলাতেই হবে।

চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে জানা যায়, করোনা চিকিৎসার জন্য জেলায় আলাদা কোনো হাসপাতাল নেই। করোনা সংক্রমণের প্রথমদিকে হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যার সদর আধুনিক হাসপাতালের নতুন ভবনের ষষ্ঠ তলায় ১০০ শয্যার দুটি করোনা ইউনিট খোলা হয়। এর মধ্যে বর্তমানে একটি ইউনিট (৫০ শয্যা) বন্ধ রয়েছে। জেলায় নেই কোনো আইসিইউ বেড।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর চৌধুরীর দেওয়া চারটি ভেন্টিলেটর পড়ে আছে অকেজো হয়ে। ৪০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার থাকলেও সেগুলো আজও চালু করা সম্ভব হয়নি। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টের মাধ্যমে ১৫ মিনিটে করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।

করোনাভাইরাস মহামারির প্রথম ধাপে করোনা পরীক্ষার জন্য পিসিআর ল্যাব স্থাপনের ঘোষণা দিলেও স্বাস্থ্য বিভাগের দাবি এটি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন। তবে কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানেন না স্বয়ং সিভিল সার্জনও।

এ ব্যাপারে জেলা সিভিল সার্জন ডা. কে এম মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘করোনা চিকিৎসায় সব ধরনের যন্ত্রপাতি আনার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এ ছাড়া পিসিআর ল্যাব স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। এ নিয়ে শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের আওতায় গণপূর্ত বিভাগ কাজ করছে।’

সিভিল সার্জন আরও বলেন, ‘অনেক আগেই ল্যাব আমাদের কাছে হস্তান্তর করার কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত এটা কী অবস্থায় আছে বলতে পারছি না।’

এ ব্যাপারে হবিগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তৌহিদ ইসলাম বলেন, ‘সিলেট স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় শুধু পিসিআর ল্যাব নয়, একটি বায়োমেট্রোলজি ল্যাব স্থাপনের টেন্ডার অনুমোদন হয়েছে। বর্তমানে এটির কাজ চলমান রয়েছে।’

আপনার মন্তব্য

আলোচিত