১৩ জুলাই, ২০২১ ০০:৫১
মোটরসাইকেল আটকের পর ফেসবুকে লাইভ করে ভাইরাল হওয়া কথিত সাংবাদিক মো. ফয়ছল কাদিরের বিরুদ্ধে রোববার রাতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করে পুলিশ।
তবে ওইদিনই পুলিশের কাছ থেকে নিজের মোটরসাইকেলটি ছাড়িয়ে নিয়েছেন সাংবাদিক পরিচয়দানকারী এই ব্যক্তি। কাগজপত্র না থাকায় গত ৯ জুলাই যেটি সিলেটের সুরমা গেট থেকে আটক করে থানায় নিয়ে এসেছিল পুলিশ।
রোববার রাতে 'পিকে টিভি' নামক ফেসবুক পেজ থেকে করা আরেকটি লাইভে নিজেই মোটরসাইকেল ছাড়িয়ে আনার তথ্য জানান ফয়ছল।
ওই লাইভে তিনি বলেন, 'প্রশাসনের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক। সিলেট মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার ফয়সল মাহমুদ ভাই সসম্মানে আমার মোটর সাইকেলটি ফিরিয়ে দিয়েছেন'।
তবে মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বে থাকা উপ কমিশনার (ডিসি) ফয়সল মাহমুদের দাবি, মো. ফয়ছল কাদির নামের সাংবাদিক পরিচয় দানকারী ওই ব্যক্তিকে তিনি চেনেন না।
ফয়ছাল কাদির আটক মোটর সাইকেল নিয়ে গেছেন জানিয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (ট্রাফিক) জ্যোতির্ময় সরকার বলেন, নির্ধারিত জরিমানার টাকা জমা দিয়ে তিনি রোববার মোটরসাইকেলটি নিয়ে গেছেন।
জ্যোতির্ময় বলেন, আইন অমান্যের দায়ে পুলিশ প্রতিদিন এরকম অনেক গাড়ি আটক করে। মামলা দেয়। এরপর জরিমানার টাকা পরিশোধ করে মালিক এসে গাড়ি নিয়ে যান। এছাড়া আমরা তো তাকে চিনিও না। ফলে তার মোটর সাইকেল আলাদা করে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়।
এরপর রোববার রাতে সিলেট নগরের শাহপরান থানায় ফয়ছল কাদিরের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন সিলেট মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সার্জেন্ট মো. নুরুল আফসার ভূঁইয়া। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ফয়সাল কাদির 'পৃথিবীর কণ্ঠ (পিকে) টিভি' নামে ফেসবুক ভিত্তিক একটি পেজ পরিচালনা করেন। ফেসবুকে নিজেকে পিকে টিভির সম্পাদক ও মাতৃজগত নামের একটি পত্রিকা সিলেট ব্যুরো প্রধান হিসেবে দাবি করেছেন ফয়ছল।
কাগজপত্র বিহীন মোটরসাইকেল আটকের পর ফেসবুকে এই লাইভ করা প্রসঙ্গে ফয়ছল কাদির সোমবার একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি ভুল একখান করিলাইছি, আপনারা পারলে আমারে বাঁচাউক্কা (বাঁচান)!’
ওই লাইভ ভিডিওটি নিজের ফেসবুক পেজ থেকে অপসারণ করে ফেলেছেন বলেও জানান।
তবে তা ইতোমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ায় নিজে বিব্রত বলেও জানান ফয়ছল।
পুলিশের সাথে আলাপকালে জানা যায়, লকডাউন চলাকালে গত ৯ জুলাই বিকেলে সিলেট-তামাবিল সড়কের সুরমা গেট এলাকায় তিন আরোহী নিয়ে চলা একটি মোটরসাইকেল আটক করে পুলিশ। ফয়ছল কাদির এই মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিলেন। এসময় তার মাথায় হেলমেট ছিলো না। আটকের পর তিনি মোটর সাইকেলের কাগজপত্র এবং নিজের ড্রাইভিং লাইসেন্সও দেখাতে পারিনি।
ওইদিন ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করা এক পুলিশ সদস্য বলেন, মোটরসাইকেল আটকের পর ফয়ছল কাদির নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে পুলিশের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং মোটর সাইকেল ছাড়িয়ে নিতে চান। এতে ব্যর্থ হয়ে তিনি ফেসবুকে লাইভ করা শুরু করেন।
ওই লাইভে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে ফয়ছলকে বলতে শোনা যায়- ‘আমি বুঝি আপনি কতটুকু ক্ষমতাসীন প্রশাসন, ...আমি কমিশনার সাহেবকে, ডিসি সাহেবকে ফোন দিচ্ছি। আমি দুঃখিত বলেছি, তারপরও এই রকম আচরণ করেন, ...এইটা আমাদের এলাকা, আমি একজন সাংবাদিক, ...একজন সংবাদকর্মীর সাথে যদি আপনারা এই আচরণ করেন, তাহলে সাধারণ মানুষের সাথে কী আচরণ করবেন। ...আমি প্রশাসন ও সাংবাদিক আনতেছি...।’
ফেসবুকে ভাইরাল ওই লাইভে দেখা যায়, মোটরসাইকেল আটকের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে তার সঙ্গে কেন এমন আচরণ করা হলো, বারবার তা দায়িত্বরত পুলিশের কাছে জানতে চাইছেন ফয়ছল কাদির। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং সাংবাদিকদের ফোন করে তিনি ঘটনাটি জানাচ্ছেন বলেও লাইভে বলতে শোনা যায়।
মোটরসাইকেলটি আটকের সময় সুরমা গেটে চেকপোস্টের দায়িত্বে ছিলেন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সার্জেন্ট নুরুল আফসার ভূঁইয়া। ফয়ছলের লাইভের মাঝেই তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনার গাড়িতে তিনজন তুলছেন কেন? গাড়ির কাগজ কই? ড্রাইভিং লাইসেন্স কই?’
এসব প্রশ্নের জবাবে ফয়ছল বলেন, ‘আমার গাড়ির সেল রিসিট আছে। আমি অসুস্থ। একটি জরুরি নিউজের খবর পেয়ে তাড়াহুড়া করে বের হয়েছি। তাই এটি সঙ্গে আনতে পারিনি। একটু সময় দিলে নিয়ে আসব।’
সার্জেন্ট নুরুল লাইভ ক্যামেরার সামনে এসে একাধিকবার বলেন, ‘সাংবাদিক বলে কি সবকিছু মাফ?’
জবাবে ফয়ছল বলেন, ‘আপনার গাড়ির কাগজ কই? পুলিশেরও হেলমেট থাকে না। আমি সত্যি বলেছি। তারপরও আমার গাড়ি রেকার করছেন কেন। সিলেটের মানুষ খুব ভালো। এই মাটি খুব ভালো। তাই সিলেটের মানুষ এত আদর করে সোহাগ করে। আর আপনি আইনের ক্ষমতা দেখাচ্ছেন। গাড়ি চলতেছে। গাড়ি চলার সুবিধা দিয়ে সাধারণ সংবাদকর্মীর সঙ্গে এমন আচরণ করছেন।’
ফেসবুক লাইভের কমেন্টেই অনেকে ফয়ছল কাদিরের আচরণের নিন্দা করেছেন। সংবাদকর্মী পরিচয় দিয়ে অবৈধ সুবিধা আদায়ের চেষ্টা, ক্ষমতা প্রদর্শনের নিন্দা করেন মন্তব্যকারীরা। একই সঙ্গে প্রশংসিত হয় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যের আচরণ।
এ ঘটনা নিয়ে আলোচনার মধ্যেই রোববার রাতে ফয়ছলের নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন সার্জেন্ট নুরুল। এজাহারে ফয়সালের বিরুদ্ধে ফেসবুকে মিথ্যা তথ্য সরাসরি প্রচার করে অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।
মোটরসাইকেল আটকানোর পর ফেসবুকের ওই লাইভে ফয়ছল কাদিরকে মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার (ট্রাফিক) ফয়সল মাহমুদের নাম একাধিকবার নিতে শোনা যায়। লাইভে ফয়সাল কাদির দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা আমার মোটরসাইকেলে হাত দেবেন না। আমি ডিসি সাহেবকে ফোন দিচ্ছি। তিনি এখানে আসবেন। তারপর দেখব।’
এ প্রসঙ্গে সোমবার সিলেট মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার (ট্রাফিক) ফয়সল মাহমুদ বলেন, ‘এই লোককে (ফয়ছল কাদির) আমি চিনি না। অনেকেই তো আমাকে কল দেয়। সব কল রিসিভ করাও হয় না। ওই দিন তার সঙ্গে আমার কোনো আলাপ হয়নি। এর আগে কোনোদিন হয়েছে বলেও মনে করতে পারছি না।’
আপনার মন্তব্য