নিজস্ব প্রতিবেদক

১৭ জুলাই, ২০২১ ২২:২৪

যত্রতত্র আবর্জনার স্তূপ, দুর্গন্ধে দুর্ভোগ

বড়লেখা পৌরসভা

প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই দশকেও আধুনিকায়নের কোনো ছাপ পড়েনি মৌলভীবাজারের বড়লেখা পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়। পরিচ্ছন্ন নগর গড়ে তোলা ও শহরবাসীর নাগরিকসুবিধা দেখভালের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকারের এই প্রতিষ্ঠানটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্র এতটাই নাজুক যে শহরের যত্রতত্র জমিয়ে রাখা হয়েছে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। এতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন পৌরবাসী।

 পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালে বড়লেখা পৌরসভা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই দশক পার হলেও ময়লা-আবর্জনা ফেলার নির্ধারিত স্থান করা সম্ভব হয়নি। শুধুমাত্র শহরের সব ময়লা-আবর্জনা শহরের প্রবেশমুখে ফেলা হচ্ছে। তবে বাসা-বাড়ির ময়লা নেওয়া যাচ্ছে না। জায়গার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখনও সেই জায়গার বরাদ্দ মিলেনি।


সরেজমিনে সোমবার (১২ জুলাই) দেখা গেছে, মৌলভীবাজার-চান্দগ্রাম আঞ্চলিক সড়কের আইলাপুর এলাকায় (বড়লেখা পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ড) ময়লা-আবর্জনার স্তূপ রয়েছে। সড়কের উত্তর পাশ ঘেঁষে অন্তত ২০০ মিটার এলাকাজুড়ে বর্জ্যরে স্তূপ জমিয়ে ফেলেছে পৌর কর্তৃপক্ষ। এখানে হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বর্জ্য, পলিথিন, প¬াস্টিকের বোতল, উচ্ছিষ্ট খাবার, কার্টুন ইত্যাদি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে স্তূপাকারে রয়েছে। আইলাপুর ছাড়াও শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের ১০-১২টি স্থানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ চোখে পড়েছে। এরমধ্যে পৌরসভার কার্যালয় সংলগ্ন এলাকা, ২ নম্বর ওয়ার্ডের হাটবন্দ গ্রামের মিনা বেগমের বাসা সংলগ্ন এলাকা, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের দেওয়ান শাহ্ মার্কেটের বারান্দা, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের গণি ভবন সংলগ্ন এলাকা, পৌর শহরের দক্ষিণবাজার ব্রিজের গোড়া, দক্ষিণবাজারের মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড এলাকা, পাখিয়ালা চৌমুহনী থেকে হাসপাতাল সড়কের তিনটি স্থান ও পাখিয়ালা চৌমুহনী থেকে ডিমাই সড়কের চৌমুহনী এলাকার ভাগাড় উল্লেখযোগ্য। নিয়মিত পরিষ্কার না করায় এসব স্তূপের ময়লা পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে পরিবেশদূষণের পাশাপাশি সৌন্দর্যও বিনষ্ট হচ্ছে।

গাজিটেকা ও আইলাপুর গ্রামের বাসিন্দারা জানান, মৌলভীবাজার-চান্দগ্রাম আঞ্চলিক সড়কের আইলাপুর এলাকা (পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ড) দিয়ে প্রতিদিন হাজারো যানবাহন চলাচল করে। এ সড়ক দিয়ে বড়লেখা উপজেলার চারটি ইউনিয়ন (বর্ণি, তালিমপুর, দাসেরবাজার, নিজবাহাদুরপুর) ছাড়াও পাশের বিয়ানীবাজার উপজেলার কয়েক হাজার মানুষ পৌর শহরে যাতায়াত করেন। গত ২ বছর ধরে সড়ক ঘেঁষে ময়লা ফেলা হচ্ছে। এতে চলাচলকারী মানুষ দুর্গন্ধের দুর্ভোগে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। কাপড়ে নাক ঢেকে স্থানগুলো তাদের অতিক্রম করতে হচ্ছে। এটি প্রতিদিনের চিত্র। পাশাপাশি আশপাশের বাড়ির লোকজনও ময়লার দুর্গন্ধে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। ফেলে রাখা এসব ময়লা-আবর্জনা বৃষ্টির পানিতে গড়িয়ে খাল, কৃষি জমি ও হাওরে পড়ছে। এতে পরিবেশদূষণ হচ্ছে। এছাড়া কৃষি জমিতে কাজ করতে গিয়ে ইঞ্জেকশনের ব্যবহৃত সিরিঞ্জের সুচ পায়ে বিঁধে আহত হচ্ছেন অনেকে। ভাঙা কাঁচের টুকরোয় পা কেটেছে অনেকের।
 
আইলাপুর এলাকায় কথা হয় আব্দুল মন্নানের সাথে। তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘আমার বাড়ি এই এলাকায়। জমি ও খালের কাছে বাজারের ময়লা, ভাঙা কাঁচ, সিরিঞ্জ ফেলা হচ্ছে। গত বছর সিরিঞ্জ (ইঞ্জেকশনের ব্যবহৃত সিরিঞ্জের সুচ) পায়ে ঢুকছে। এখন জমিতে যেতে ভয় লাগে। কখন পা কেটে যায়।’

গাজিটেকা গ্রামের শ্যামল দাস বলেন, ‘ময়লার দুর্গন্ধে বাড়িত থাকা কষ্ট হয়। মেয়রকে অনেকবার বলা হয়েছে। কিন্তু তিনি আমাদের কথার কোনো গুরুত্ব দেন না।’

একই এলাকার বাসিন্দা আলা উদ্দিন বলেন, ‘রাতে পৌরসভার গাড়ি ময়লা ফেলে দ্রুত চলে যায়। অনেক বার আমরা বাধা দিয়েছি। তারা বাধা মানতে চায় না। মানুষ দুর্গন্ধে অতিষ্ট। কোনো সময় ময়লার গন্ধ কমাতে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। সেই আগুনের ধোঁয়া আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে আরও ভোগান্তির সৃষ্টি করে।’

শহরের হাটবন্দ গ্রামের মিনা বেগম বলেন, ‘আমার বাসার কাছেই যেখানে ময়লা ফেলা হচ্ছে, এটি পুকুর ছিল। ১০-১৫ বছর ধরে এখানে ময়লা ফেলা হচ্ছে। আশপাশের লোকজন প্রতিদিন ময়লা ফেলেন। ময়লায় পুকুরটি ভরাট হয়ে গেছে। গন্ধে ঘরে থাকা কষ্ট হয়। ঘরের পাশে কিছু জায়গা ছিল। এখানে ময়লা ফেলা বন্ধ করতে সবজি চাষ করেছি। গন্ধ দূর করতে মুখে কাপড় বেঁধে মাঝে মাঝে ময়লায় আগুন দেই। তবুও গন্ধ দূর হয় না।  



৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নয়ন ইসলাম বলেন, ‘আমার বাসা ঘেঁষেই ময়লা ফেলা হচ্ছে দীর্ঘদিন থেকে। পৌর কর্তৃপক্ষকে অনেকবার বলেছি। কোনো কাজ হয়নি। ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধের দুর্ভোগ কবে শেষ হবে জানিনা।’

এ ব্যাপারে বড়লেখা পৌরসভার মেয়র আবুল ইমাম মো. কামরান চৌধুরী সিলেটটুডেকে বলেন, ‘ময়লা-আবর্জনা ফেলার জন্য স্থায়ীভাবে একটি জায়গা চিহ্নিত করে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন দেওয়া হয়েছে। এই জায়গা আমাদের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য। যে কোনো শর্তে। এটা একটা প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া অন্যভাবে জায়গা ক্রয় করারও প্রস্তুতি আছে আমাদের। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত এভাবেই ময়লা ফেলা লাগবে।’  

তিনি আরো বলেন, ‘এভাবে ময়লা ফেলতে আগ্রহী নই। আমরা শহরটাকে পরিস্কার রাখতে পারছি না। বেশি ময়লা তো ওই এলাকায় ফেলা যায় না। যেগুলো না নিলে না নয় সেগুলো নেওয়া হচ্ছে। গ্রামের ময়লাগুলো নেওয়া যাচ্ছে না। এজন্য বাসিন্দাদের কাছ থেকে ময়লা-আবর্জনা পরিস্কারের কোনো ট্যাক্স নেওয়া হচ্ছে না।’

আপনার মন্তব্য

আলোচিত